Balurghat | আলপনার চেনা ছন্দে রঙের মেলা, বালুরঘাটে দীপাবলিতে ট্রেন্ড রঙ্গোলি

আন্তর্জাতিক INTERNATIONAL
Spread the love


একটা সময় ছিল, দীপাবলি বা লক্ষ্মীপুজো এলেই বাড়ির মহিলারা চালের গুঁড়ো ভিজিয়ে আলপনা দেওয়ার প্রস্তুতি নিতেন। আঙুলের ছোঁয়ায় মেঝেতে ফুটে উঠত পদ্ম, লতাপাতা, ধানের ছড়া কিংবা লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ। সেই আলপনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকত সংসারের মঙ্গলকামনা, সমৃদ্ধির প্রার্থনা এবং পারিবারিক ঐতিহ্য। সেই রীতি অবশ্য হারিয়ে যাচ্ছে না। বরং তার পাশেই নতুন অতিথির মতো হাজির হয়েছে রঙ্গোলি।

পঙ্কজ মহন্ত, বালুরঘাট: বাড়ির উঠোনে চালের গুঁড়ির সাদা আলপনা, তার পাশে সাজানো প্রদীপের সারি। এই তো বাঙালির চেনা দীপাবলি! কিন্তু সেই চেনা ছবিতে গত কয়েক বছর ধরেই একটু রঙের ছোঁয়া বেশি। সাদা আলপনার পাশে লাল, হলুদ, নীল, সবুজের বাহারি নকশা। কোথাও পদ্ম ফুল, কোথাও ময়ূর, আবার কোথাও জ্যামিতিক নকশার কারুকাজ। নাম তার রঙ্গোলি। বালুরঘাটের (Balurghat) বাঙালি বাড়ির উঠোনেও ক্রমশ জায়গা করে নিচ্ছে এই রঙিন শিল্পকলা। উৎসবের সাজে নতুনত্বের খোঁজে থাকা তরুণ প্রজন্মের হাত ধরেই বাড়ছে তার কদর।

আসলে আলপনা আর রঙ্গোলির মধ্যে মিল যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। বাংলার আলপনা মূলত চালের গুঁড়ো ও জলের মিশ্রণে তৈরি সাদা নকশার শিল্প। অন্যদিকে রঙ্গোলিতে ব্যবহার হয় নানা রঙের গুঁড়ো, রঙিন চাল, ফুলের পাপড়ি কিংবা বালি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এই মেঝে সাজানোর শিল্পের আলাদা আলাদা নামও রয়েছে— মহারাষ্ট্র ও গুজরাতে রঙ্গোলি, তামিলনাডুতে কোলাম, রাজস্থানে মাণ্ডনা, বাংলায় আলপনা। অর্থাৎ নাম ও উপকরণ আলাদা হলেও উৎসবের দোরগোড়ায় শুভবার্তা পৌঁছে দেওয়ার ভাবনাটি অনেক ক্ষেত্রেই এক।

তবে বালুরঘাটে রঙ্গোলির জনপ্রিয়তা বাড়ার পিছনে শুধু উৎসবের রীতি কাজ করছে না, রয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার (Social Media) প্রভাবও। ফেসবুক কিংবা ইনস্টাগ্রামে চোখ রাখলেই দেখা যায়, কত রকমের রঙ্গোলির নকশা। কোথাও নিখুঁত জ্যামিতিক নকশা, কোথাও আবার ফুল-পাতা কিংবা দেবদেবীর অবয়ব। পছন্দের নকশা দেখে অনুপ্রাণিত হচ্ছেন অনেকে। কেউ নিজের মতো করে নতুন নকশা তৈরি করছেন, কেউ আবার সেই শিল্পকর্মের ছবি তুলে ভাগ করে নিচ্ছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। ফলে ঘর সাজানোর পাশাপাশি রঙ্গোলি হয়ে উঠছে নিজের শিল্পীসত্তা প্রকাশের একটা মাধ্যম।

কলেজপাড়ার গৃহবধূ প্রিয়াংশী কর্মকার ছোট থেকে আঁকা শিখেছেন। তাই রঙের ব্যবহার ও নকশা তৈরির প্রতি একটা আলাদা আগ্রহ রয়েছে তাঁর। মনে মনে ঠিকই করে রেখেছেন যে, এ বছর দীপাবলিতে বাড়ির ভেতর নিজেই রঙ্গোলি দেবেন। প্রিয়াংশীর কথায়, ‘ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামে অনেকেই রঙ্গোলি তৈরি করে ছবি দেন। সেগুলো দেখতে খুব ভালো লাগে। প্রচুর মানুষ প্রশংসাও করেন। আমিও সেই ছবি দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছি।’

এই নতুন আকর্ষণের সঙ্গে অবশ্য জড়িয়ে রয়েছে পুরোনো পারিবারিক অভ্যাসও। মাড়োয়ারিপট্টির বাসিন্দা বিবাহ আগরওয়ালের কাছে রঙ্গোলি কোনও নতুন সংযোজন নয়। ছোটবেলা থেকেই বাড়িতে এই রীতি দেখে বড় হয়েছেন তিনি। প্রতি বছরের মতো এবারও দীপাবলিতে রঙ্গোলি তৈরি করবেন। বিবাহ বলেন, ‘ছোট থেকেই রঙ্গোলি দেওয়ার রীতি দেখে আসছি। আমাদের পরিবারে দীপাবলির সঙ্গে এই রীতি জড়িয়ে রয়েছে। বাড়ির প্রবেশদ্বারে রঙ্গোলি তৈরি করা উৎসবেরই একটা অংশ। ছোটবেলা থেকেই বড়দের এই কাজ করতে দেখেছি। তাই সেই রীতির ব্যতিক্রম হবে না।’

বাড়ির উঠোনের এই বদলের আঁচ পড়েছে বাজারেও। তহবাজার, নিউমার্কেট সহ শহরের বিভিন্ন বাজারে রঙ্গোলির রঙের চাহিদা বাড়ছে। নকশার সঙ্গে মিলিয়ে রঙিন প্রদীপ কেনার আগ্রহও দেখা যাচ্ছে। নিউমার্কেটের বিক্রেতা অজয় কুণ্ডু বলেন, ‘বিগত কয়েক বছর ধরেই রঙ্গোলি তৈরির জন্য বিভিন্ন রঙের চাহিদা তৈরি হয়েছে শহরে। আগে মূলত অবাঙালি পরিবারগুলির মধ্যেই এই রীতি বেশি দেখা যেত। কিন্তু এখন বাঙালি মহিলারাও রঙ্গোলি তৈরির জন্য বিভিন্ন রঙের খোঁজ করছেন।’ শহরের বাজারগুলিতে এবার জমে উঠবে রঙ্গোলির রং ও ডিজাইনের ছাঁচের পসরা। ইতিমধ্যেই অনেক মহিলা বিভিন্ন রঙের চাহিদার কথা দোকানে এসে জানিয়ে গিয়েছেন। অনেকে নকশা অনুযায়ী নির্দিষ্ট রঙের খোঁজ করছেন। ফলে এবার রঙের বিক্রি ভালো হবে বলেই আশা করছেন অজয়রা।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে সাজসজ্জার উপকরণ, বদলেছে পছন্দের ধরন। তবু মেঝেতে নকশা আঁকার মূল ভাবনাটি একই রয়ে গিয়েছে— ঘরকে সাজানো, আনন্দকে ভাগ করে নেওয়া। তাই বালুরঘাটের দীপাবলিতে আলপনা আর রঙ্গোলির মধ্যে কোনও প্রতিযোগিতা নেই। বরং পাশাপাশি থেকে তারা তৈরি করছে উৎসবের এক নতুন ছবি।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *