উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: স্টকহোমের এক পড়ন্ত বিকেলে যখন নোবেল কমিটির বড় কর্তারা ফোন ঘোরালেন, তখন ফোনের ওপার থেকে ভেসে এল ঝোড়ো হাওয়ার সইসই আওয়াজ। পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল ছেড়ে তখন তিনি বহু দূরে—আইসল্যান্ডের নিসর্গ কোলে প্রকৃতির নিভৃত মগ্নতায় মগ্ন। এক মুহূর্তের জন্য যেন বিশ্বাসই করতে পারেননি খবরটা। কে জানত, শেকড়ের টান আর গ্রিক ট্র্যাজেডির আধুনিক বয়ান এভাবেই এক দিন পৌঁছে যাবে বিশ্বের সবথেকে প্রেস্টিজিয়াস সাহিত্যের মুকুটে? ২০২৬ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের (Nobel Prize) মঞ্চে এ বার সগৌরবে খোদাই হয়ে গেল বছর ৭৬-এর অ্যান কার্সনের (Anne Carson) নাম। সুইডিশ অ্যাকাডেমির ঘোষণা অনুযায়ী, ধ্রুপদী সাহিত্যের শেকড়কে সমকালীন কাব্যের সঙ্গে এমন লব্জে মিলিয়ে দেওয়ার স্পর্ধা আর কারও ছিল না। অ্যালিস মুনরো কিংবা সল বেলোর পর কানাডার মুকুটে জুড়ল আরও এক নোবেলের স্বর্ণমুকুট।
টরন্টোর কংক্রিট জঙ্গল থেকে শুরু হয়েছিল যাঁর পথচলা, আজ বার্ধক্যের ঠিক চৌকাঠের দাঁড়িয়ে সেই মানুষটাই যেন কলমের এক আঁচড়ে বদলে দিলেন সাহিত্যের গাণিতিক সমীকরণ। গ্রিক ভাষা নিয়ে যাঁদের ঘুম ভাঙত আর গ্রিক অক্ষর যাঁদের কাছে ছিল নেশার মতো, তরুণ বয়সে সেই টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের বারান্দা থেকেই প্রাচীন হেলেনিক সংস্কৃতির প্রেমে পড়েছিলেন কার্সন। ক্লাসিকস নিয়ে পিএইচডি, আমেরিকার কর্নেল থেকে শুরু করে ম্যাকগিল—একাধিক স্বনামধন্য ক্যাম্পাসে পড়ানোর সুবাদে ব্যাকরণের ভারী বর্ম গায়ে চাপাতে পারতেন অনায়াসে। কিন্তু কার্সন তো ছকে বাঁধা পণ্ডিত হওয়ার জন্য জন্ম নেননি! প্রবন্ধের কঠিন কাঠামো আর কবিতার সাবলীল লয়কে এক সুতোয় গেঁথে তিনি এমন এক জাঁদরেল স্টাইল তৈরি করলেন, যা প্রথাগত পাঠকদের রীতিমতো চমকে দেয়। স্যাম অ্যান্ডারসন তো একবার নিউ ইয়র্ক টাইমস ম্যাগাজিনে লিখেছিলেন, কবিতা পছন্দ করেন না এমন মানুষও কার্সনের জাদুকরি কলমের টানে আটকে যেতে বাধ্য!
তাঁর বিখ্যাত ‘অটোবায়োগ্রাফি অফ রেড’ কিংবা ‘দ্য বিউটি অফ দ্য হাজব্যান্ড’-এর পাতা ওলটালে মনে হয়, প্রাচীন গ্রিক মিথ যেন হঠাৎ টাইম মেশিনে চড়ে এসে হাজির হয়েছে একবিংশ শতাব্দীর ড্রইংরুমে। কোথাও ইউরিপিদিসের হেলেনের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে খোদ মেরিলিন মনরোর রূপোলি পর্দার ট্রেজডি, আবার কোথাও পারকিনসন্স রোগের সঙ্গে লড়াই করতে করতে বদলে যাওয়া হাতের লেখার কষ্টও রূপ নিচ্ছে শিল্পের। বইয়ের জ্যাকেটে নিজের ছবি বা চটজলদি পরিচিতি রাখতে না চাওয়া এই নিভৃতচারী লেখক যেন বিশ্বাস করেন কেবল আত্মায়। স্টকহোমের সাহিত্য সভা থেকে যখন জানানো হল যে তাঁর এই অনন্যসাধারণ কাজের জন্য এ বার নোবেলের প্রায় সাড়ে এগারো কোটি টাকার অর্থমূল্য অর্পণ করা হচ্ছে, তখন আইসল্যান্ডের হাওয়ায় ভাসছে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। আধুনিক গদ্য আর কবিতার চৌহদ্দি ভেঙে দিয়ে অ্যান কার্সন প্রমাণ করে দিলেন—সাহিত্যের কোনও দেওয়াল হয় না, শিল্পের আকাশ অনন্ত।

