শালকুমারহাট: পাকা রাস্তার পাশেই আলিপুরদুয়ারের (Alipurduar) শালকুমারহাট জুনিয়ার গার্লস হাইস্কুল (Salkumarhat Ladies’ Jr. Excessive Faculty)। মঙ্গলবার দুপুরের চড়া রোদে রাস্তার ধারে গাছতলায় জিরিয়ে নিচ্ছিলেন মাঝবয়সি এক ব্যক্তি। সেখানে মোটরবাইক নিয়ে এসে দাঁড়ালেন নতুনপাড়ার এক তরুণ। অবিন্যস্ত, জরাজীর্ণ স্কুলের দিকে তাকাতেই গাছতলার সেই প্রৌঢ় আক্ষেপের সুরে বলছিলেন, ‘ওখানে স্কুল আছে ঠিকই। কিন্তু এখন দেখে মনে হবে ওটা একটা পুকুর।’
বাস্তবিকই, বর্ষা শুরু হতেই এটাই যেন এই স্কুলের চেনা বাস্তব ছবি। আকাশ মেঘলা হলেই বুক দুরুদুরু কাঁপে স্কুল কর্তৃপক্ষের। সামান্য বৃষ্টি হলেই স্কুলের কোথাও হাঁটু, আবার কোথাও কোমরসমান জল জমে (Waterlogging) যায়। আর সেই নোংরা, পচা জল দিনের পর দিন থিতু হয়ে থাকে স্কুল চত্বরেই। এই নরকের পরিবেশের মধ্যেই বছরের পর বছর ধরে চলছে পঠনপাঠন। স্কুলের সীমানা প্রাচীরও ভাঙাচোরা, কোথাও আবার অর্ধসমাপ্ত। ফলে ছাত্রীদের মাঠে খেলাধুলো বা টিফিনের সময় একটু খোলা হাওয়ায় দাঁড়ানো এখন পুরোপুরি বন্ধ। বেশি বৃষ্টি হলে নোংরা জল মাড়িয়ে, জামাকাপড় ভিজিয়েই স্কুলে ঢুকতে হয় ছাত্রী ও শিক্ষিকাদের। স্কুল কর্তৃপক্ষের দাবি, এলাকায় একটি সুসংহত নিকাশিনালা তৈরি হলেই এই জলযন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। কিন্তু সেই দাবি প্রশাসনকে বারবার জানিয়েও কোনও লাভ হয়নি। তবে রাজ্যে পালাবদলের পর এবার স্থানীয় বাসিন্দারা কিছুটা আশাবাদী যে, থমকে থাকা নিকাশিনালার কাজ হয়তো এবার গতি পাবে।
স্কুলের টিআইসি কবিতা মণ্ডলের গলায় ঝরে পড়ল চরম উদ্বেগ ও অসহায়তা। তাঁর কথায়, ‘স্কুল চত্বরে জল জমার এই সমস্যা দীর্ঘদিনের। বর্ষা শুরু হলেই জল নিয়ে আমরা চরম চিন্তায় থাকি। ছাত্রীদের অত্যন্ত সতর্কভাবে নোংরা জল পেরিয়ে স্কুলে আসতে হয়। মাঠে খেলাধুলো তো বহু আগেই বন্ধ হয়ে গিয়েছে।’ স্কুলের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়ে তিনি বলেন, ‘এই জল দিনের পর দিন জমে থাকার ফলে মশা ও পোকামাকড়ের উপদ্রব মারাত্মকভাবে বাড়ছে। যে কোনও সময় বড়সড়ো রোগব্যাধি ছড়াতে পারে। একটা বড় নিকাশিনালার দাবি জানিয়ে প্রশাসনকে আমরা বারবার চিঠি দিয়েছি। সম্প্রতি বিডিও-কেও বিষয়টি পুনরায় জানানো হয়েছে।’
এদিকে, স্কুল চত্বরের এই ভয়াবহ জলমগ্ন দশা নিয়ে আলিপুরদুয়ার-১’এর বিডিও অরিজিৎ দাসকে ফোন করা হলে তিনি ফোন ধরেননি। এমনকি হোয়াটসঅ্যাপে স্কুলের জল জমার একাধিক ছবি ও মেসেজ পাঠানো হলেও তাঁর কোনও উত্তর মেলেনি। প্রশাসনের এই চরম উদাসীনতায় ক্ষোভে ফুঁসছেন অভিভাবক ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
২০১২ সালে প্রত্যন্ত এই এলাকায় মেয়েদের শিক্ষার প্রসারে স্কুলটি স্থাপিত হয়েছিল। শালকুমার-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের কিছুটা আগে পাকা রাস্তার পূর্ব ধারেই এই স্কুলের অবস্থান। পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত এখানে পড়ানো হয়। কিন্তু চরম পরিকাঠামোগত অভাব আর জলযন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে দিন-দিন এই স্কুলে ছাত্রীর সংখ্যা কমছে। স্থানীয়দের স্পষ্ট মত, স্কুলের এই বেহাল দশার জন্যই অনেক অভিভাবক তাঁদের কন্যাসন্তানদের এখানে ভর্তি করাতে চাইছেন না। স্কুল সূত্রে জানা গিয়েছে, বর্তমানে এই স্কুলে চার ক্লাসের মোট ছাত্রী সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৭০ জনে। ভারী বৃষ্টি হলে তো পড়ুয়াদের উপস্থিতি প্রায় শূন্যে ঠেকে।
স্কুলের পাশেই দেখা মিলল স্থানীয় বাসিন্দা সুদাকৃষ্ণ অধিকারীর। ক্ষোভ উগরে দিয়ে তাঁর বক্তব্য, ‘বর্ষাকালে এটা স্কুল, না মাছ চাষের পুকুর তা বোঝা মুশকিল! দিনের পর দিন পচা জল জমে থাকে। স্কুলের সীমানা প্রাচীরও অর্ধসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এভাবে একটা স্কুল চলতে পারে না। অথচ প্রশাসন সব দেখেও অন্ধ সেজে রয়েছে।’ অভিভাবক মিনতি বর্মন বলছিলেন, ‘বৃষ্টি হলেই মেয়েকে স্কুলে পাঠাতে ভয় হয়। চারদিকে জল আর পোকা। সরকার তো বদল হল, এবার অন্তত এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হোক।’
স্কুলের শিক্ষিকারা জানাচ্ছেন, এর আগে একশো দিনের কর্মসংস্থান প্রকল্পেও এই কাজ হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু অজ্ঞাত কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি। শালকুমারহাটেই বাড়ি বিজেপির আলিপুরদুয়ার ২ নম্বর মণ্ডল সভাপতি ক্ষিতীশ বর্মনের। এলাকার এই জ্বলন্ত সমস্যা নিয়ে তাঁর স্পষ্ট দাবি, ‘স্কুলের এই বেহাল দশা ও জল জমার বিষয়টি প্রশাসনের সব মহলে জানানো হয়েছে। স্থানীয় স্তরে কাজ না হলে এবার আমরা সরাসরি স্কুলশিক্ষামন্ত্রীর দ্বারস্থ হব এবং তাঁকে গোটা বিষয়টি জানাব।’

