দিনহাটা: তিনি দুটি বহুচর্চিত দুর্নীতি মামলার প্রধান আসামি। প্রাক্তন মন্ত্রী হওয়ার দরুন প্রভাবশালীও বটে। মামলা দুটি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে তদন্তকারীরা বারবার তাঁকে হেপাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। এরকম একজন আসামির আবদার মেনে তাঁকে পুলিশ সেলের বদলে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় হাসপাতালের শিশুবিভাগে রেখে বিতর্কে জড়াল পুলিশ। প্রভাবশালী সেই আসামি উদয়ন গুহ (Udayan Guha)। সোমবার ছিল দিনহাটা পুরসভার আবাস দুর্নীতি মামলার শুনানি। কিন্তু উদয়নের অসুস্থতার কারণে তা পিছিয়ে মঙ্গলবার করা হয়। সোমবার রাতেই বালুরঘাট জেল থেকে দিনহাটায় (Dinhata) নিয়ে আসা হয় প্রাক্তন মন্ত্রীকে।
পুলিশের বক্তব্য, অসুস্থতা বোধ করায় সেসময় উদয়নকে নিয়ে যাওয়া হয় দিনহাটা মহকুমা হাসপাতালে। সেখানে পুলিশ সেলেই রাখার কথা তাঁকে। সূত্রের খবর, পুলিশ সেলে থাকতে রাজি হননি প্রাক্তন মন্ত্রী। তাই আসামির আবদার মেনে শেষপর্যন্ত পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট অর্থাৎ পিকু’র শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বিভাগে বিশেষ বন্দোবস্ত করা হয় উদয়নের জন্য। সেখানেই রাত কাটান তিনি।
বিতর্কের মাঝেই এদিন পিকু থেকে বের করে সোজা উদয়নকে আদালতে তোলা হয়। সরকারি আইনজীবী সঞ্জয় বর্মন জানিয়েছেন, শুনানি শেষে বিচারক প্রাক্তন মন্ত্রীকে পাঁচদিনের পুলিশি হেপাজতের নির্দেশ দিয়েছেন। মঙ্গলবার নতুন করে আরও একটি মামলায় তাঁকে যুক্ত করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। সূত্রের খবর, বেলা গুহ দুঃস্থ মহিলা ও শিশুকল্যাণ সমিতির নামে টাকা তোলার অভিযোগ এনে দিনহাটার বাসিন্দা রণজিৎ রায় নামে এক ব্যক্তি থানায় অভিযোগ করেন। সেই মামলাতেই তাঁকে যুক্ত করা হয়। আবাস, ভুয়ো বিল্ডিং প্ল্যান পাশ, শিশুমঙ্গল সমিতি দুর্নীতি কাণ্ডের পর নতুন করে আরেকটি মামলা যুক্ত হওয়ায় উদয়নের বিপদ আরও বাড়ল বলেই মনে করছেন আইনজীবীরা।
সোমবার রাতে শিশু বিভাগের সামনে হঠাৎই রাজ্য পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের ভিড় দেখে হাসপাতালে থাকা রোগীর পরিজনরাও হকচকিয়ে যান। কিছুটা সময় যেতেই তাঁরা বুঝতে পারেন উদয়ন ভর্তি রয়েছেন শিশুদের জন্য তৈরি বিশেষ বিভাগে। মূলত গুরুতর অসুস্থ শিশুদের পিকুতে রাখা হয়। সেই বিভাগে কী করে একজন আসামিকে রাখা হল তা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কেন একজন আসামিকে পিকুতে রাখার অনুমতি দিল সেই প্রশ্ন তুলেছেন চিকিৎসকের একাংশই। তাঁরা জানিয়েছেন, শিশুদের চিকিৎসার জন্য বিশেষভাবে তৈরি ওই বিভাগে প্রবীণদের চিকিৎসার তেমন কোনও বন্দোবস্তই নেই। ফলে সত্যিই গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় উদয়নকে পিকুতে (PICU) ভর্তি করলে লাভের থেকে ক্ষতির সম্ভাবনায় বেশি। উদয়ন ঠিক কতটা অসুস্থ হয়েছিলেন এক্ষেত্রে সেই প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। যদি সত্যিই উদয়ন গুরুতর অসুস্থ হতেন তাহলে তাঁকে সিসিইউ, আইসিইউ, এইচডিইউ-এর মতন বিশেষ চিকিৎসার বন্দোবস্ত থাকা বিভাগে ভর্তি রাখতে হত। আর তার অসুস্থতা সামান্য হলে পুলিশ সেলেও চিকিত্সা হতে পারত। কোন চিকিৎসক উদয়নকে পরীক্ষানিরীক্ষা করে পিকুতে ভর্তি করেছিলেন আর কেন করেছিলেন তা স্পষ্ট করার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
বিষয়টি জানাজানি হতেই নিয়ে মুখে কুলুপ এঁটেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। দায় এড়িয়েছেন হাসপাতালের সুপার রণজিৎ মণ্ডল। তাঁর কথা, ‘কেন পিকুতে ভর্তি করা হল তা সেইসময় কর্তব্যরত চিকিৎসকই বলতে পারবেন।’ কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী সন্দীপ মণ্ডলের বক্তব্য, ‘দুর্নীতির মামলায় আসামি হওয়া সত্ত্বেও উদয়ন গুহর জন্য বিশেষ বন্দোবস্ত হচ্ছে, তা থেকেই স্পষ্ট তিনি কতটা প্রভাবশালী।’ মন্ত্রী থাকাকালীন হাসপাতালের রোগীকল্যাণ সমিতির চেয়ারম্যান ছিলেন উদয়ন। তাই তাঁকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছিল কি না তা খতিয়ে দেখার দাবিও উঠেছে। পিকুতে উদয়নের চিকিত্সা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সিপিএমের জেলা কমিটির সদস্য শুভ্রালোক দাস। তাঁর কথায়, ‘হাসপাতালের অন্য বিভাগ ছেড়ে পিকুতে কেন রাখা হল তা নিয়ে তদন্ত হওয়া উচিত।’ যদিও বিচারাধীন বলে বিষয়টি এড়িয়ে গিয়েছেন বিধায়ক অজয় রায়। পুলিশ আধিকারিকরাও এবিষয়ে কোনও কথা বলতে চাননি।

