নাগরাকাটা: কখনও অনাবৃষ্টি আর চড়া রোদ পুড়িয়ে দিচ্ছে। কখনও টানা বৃষ্টি ভাসিয়ে দিচ্ছে হেক্টরের পর হেক্টর জমি। এমন পরিস্থিতি হচ্ছে যে বর্ষাকালেও ব্যবহার করতে হচ্ছে কৃত্রিম সেচ। জলবায়ুর আমূল পরিবর্তনে বদলে গিয়েছে উত্তরবঙ্গের চায়ের (North Bengal Tea Business) মরশুম। ফার্স্ট ফ্লাশ, সেকেন্ড ফ্লাশ, রেইন ফ্লাশ, অটাম ফ্লাশ থেকে শুরু করে বাগানে পাতা তোলা বন্ধ রাখার সময় নিয়েও ঘোর ধন্দে পরিচালকরা। ২০২৫ সাল থেকে তো টি বোর্ড শীতের শুখা মরশুমে উৎপাদনে বিরতি টানা বা ফের পাতা তোলার সিদ্ধান্ত বাগানগুলির ওপরই ছেড়ে দিয়েছে। এই পরিস্থিতির ধাক্কা এসে পড়েছে ডুয়ার্সের (Dooars) চায়ের গুণগত মানেও।
উত্তরবঙ্গ ও সংলগ্ন এলাকার আবহাওয়া যে ক্রমশ বদলাচ্ছে তা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের গত বছরের একটি তথ্যেই পরিষ্কার। বেশ কয়েক বছরের পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা গিয়েছিল গোটা দেশের মধ্যে সিকিম সহ সংলগ্ন এলাকায় সর্বনিম্ন গড় তাপমাত্রা সবচেয়ে বেড়েছে। ওই পরিমাণ ছিল ০.০৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। টি রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশন (টিআরএ) নাগরাকাটা (Nagrakata) কেন্দ্রের এক চা বিজ্ঞানী বলেন, ‘সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রাতেরবেলায় রেকর্ড করা হয়। যদি সর্বোচ্চ তাপমাত্রাও বাড়ার পাশাপাশি আর্দ্রতা কম থাকে তবে তা চা গাছের জন্য ভালো নয়। গত কয়েক বছরে কিন্তু এমন পরিবেশ তৈরি হতে দেখা গিয়েছে।’
আবহাওয়া দপ্তর জানাচ্ছে, মোট বৃষ্টিপাতের পরিমাণে খুব একটা হেরফের না হলেও একলপ্তে অনেক বেশি বৃষ্টি বা টরেনশিয়াল রেইন-এর প্রবণতা এখন অনেক বেড়ে গিয়েছে। এর ফলে জল ভূগর্ভে প্রবেশ না করে ভূপৃষ্ঠ দিয়ে প্রবল বেগে বইতে শুরু করে। পাহাড় ও লাগোয়া ডুয়ার্স-তরাইয়ের ঢেউ খেলানো চা বাগানের মাটি এতে দিনের পর দিন আলগা হচ্ছে। প্রকারান্তরে নষ্ট হচ্ছে চা গাছের জীবনীশক্তি। সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের কারণ হয়েছে চরমভাবাপন্ন আবহাওয়া। বৃষ্টি হলে প্রবল এবং খরা পরিস্থিতি শুরু হলে সেটাও একটানা। এল নিনোর প্রভাবে বৃষ্টির স্বল্পতা আবার ডেকে আনছে উল্লম্ব মেঘ তৈরি হয়ে মুহুর্মুহু বজ্রপাতের ঘটনা।
টিআরএ-র অবসরপ্রাপ্ত চা বিজ্ঞানী ডঃ সৌমেন বৈশ্য বলছেন, ‘পরিস্থিতি অনুকূলে নেই। তবে এর মোকাবিলা করতে হলে মাটির স্বাস্থ্য ঠিক রাখা, চা গাছের মধ্যে থাকা ছায়াগাছ ও বাগানের প্রান্তের পশ্চিম ধারবরাবর বাতাস প্রতিরোধী বৃক্ষ আরও বেশি করে রোপণ, সেচের ব্যবস্থা, পোকা দমনে সঠিক রাসায়নিক নির্বাচনে সতর্ক থাকতে হবে। এইসব পরিকল্পনা আগে থেকে তৈরি করে এগোনো অত্যন্ত প্রয়োজন।’
বাগানগুলির নিজস্ব কাজের ধারাতেও জোর ধাক্কা লেগেছে। যারা এই নিউ নর্মাল-এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের খোলনলচে বদলে উপযোগী হতে পারছে, টিকে থাকছে তারাই। বাকিরা ধীরে ধীরে রুগ্ন হয়ে পড়ছে। আবহাওয়ার এই চরমভাবাপন্ন চেহারায় তৈরি চায়ের গুণগত মানও ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। নিলাম মূল্য হয় একই বিন্দুতে দাঁড়িয়ে থাকছে, নয়তো কমছে।
চা মহল জানাচ্ছে, একসময় ডুয়ার্স-তরাই বা পাহাড়ে নয় মাস বৃষ্টি হত। এখন তা কমে পাঁচ মাসে দাঁড়িয়েছে। সেটাও সমভাবে বণ্টিত নয়। চলতি বছরে দেখা গিয়েছে মার্চ-এপ্রিল মাসেও বর্ষাকালের মতো ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। রোদের দেখা মেলেনি। মে-জুনের পরিস্থিতিও মোটের ওপর একই। ফলে নতুন পাতা যেমন পাওয়ার কথা তা পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে, শীতে যতটা ঠান্ডা পড়ার কথা তাও হচ্ছে না। ফলে ডিসেম্বরেও বাগানে সবুজ পাতার সমাহার। টি বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী গত বছর ডিসেম্বরে ডুয়ার্স ও তরাইয়ে উৎপাদন ছিল যথাক্রমে ১৮.৭০ ও ২০.৯৭ মিলিয়ন কিলোগ্রাম। অসময়ের ওই উৎপাদনের জন্য বাগানগুলিকে শুখা মরশুমের সংজ্ঞা বদল করতে হয়েছে।
চা মহল জানাচ্ছে, ট্র্যাডিশন অনুযায়ী জানুয়ারির কনকনে ঠান্ডা বাদ দিয়ে বছরের মোট উৎপাদনের মধ্যে ফেব্রুয়ারিতে ১ শতাংশ, মার্চে ৭ শতাংশ, এপ্রিলে ৪ শতাংশ, মে-তে ৮-৯ শতাংশ, জুনে ১০ শতাংশ, জুলাইয়ে ১১ শতাংশ, অগাস্টে ১৩ শতাংশ, সেপ্টেম্বরে ১৪ শতাংশ, অক্টোবরে ১৫ শতাংশ, নভেম্বরে ১০ শতাংশ ও ডিসেম্বরে ৬ শতাংশ মেলার কথা। এখন সবকিছু ওলট-পালট হয়ে গিয়েছে। কখন ফার্স্ট ফ্লাশ আর কখন সেকেন্ড ফ্লাশ বা রেইন বা অটাম ফ্লাশ আসছে, তা বুঝে উঠতে পারছেন না অভিজ্ঞ বাগান পরিচালকরাও। ডুয়ার্সের কূর্তি বাগানের সিনিয়ার ম্যানেজার রাজেশ রুংটা বলেন, ‘এখন আর ওই হিসেব খাটে না। নীরবে চা শিল্পে একটা বড়সড়ো পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে।’
মাল নদী চা বাগানের ম্যানেজার রাজা চক্রবর্তীর কথায়, ‘জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে চা গাছে এখন ব্যাকটিরিয়াল ব্লাইট, ফিউসেরিয়াম ডাইব্যাক, গ্রে ব্লাইট, ব্রাউন ব্লাইট, রেড রাস্টের মতো ব্যাকটিরিয়া, ছত্রাকঘটিত নানা ধরনের নিত্যনতুন রোগ দেখা দিচ্ছে। এটা আগে দেখা যেত না।’
শুধু সেট গার্ডেন বা বড় বাগান নয়, ছোট বাগানগুলোও আবহাওয়ার এই পরিবর্তনের শিকার। জলপাইগুড়ি জেলা ক্ষুদ্র চা চাষি সমিতির সম্পাদক বিজয়গোপাল চক্রবর্তী বলছেন, ‘যখন গরম দরকার তখন ঠান্ডা। আর যখন ঠান্ডা দরকার তখন গরম। বৃষ্টি হলে তা প্রবল। আর না হলে একেবারেই নেই। চাষের প্রকৃতিই পুরো বদলে গিয়েছে। প্রতিটি ফ্লাশ পিছিয়ে গিয়ে একটা আরেকটার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। এখন আর চায়ে সেই সুগন্ধও মেলে না। সব মোকাবিলা করে টিকে থাকাই দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

