সুরের আকাশে চিরসবুজ কিশোর

সুরের আকাশে চিরসবুজ কিশোর

শিক্ষা
Spread the love


কোহিনূর কর

কে জানত মধ্যপ্রদেশে বসবাসকারী এক বাঙালি পরিবারে চার ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট ভাই আভাসকুমার গঙ্গোপাধ্যায় একদিন তাঁর প্রতিভার জোরে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় গায়ক, সুরকার, অভিনেতা ও পরিচালক হিসেবে কোটি কোটি সংগীতপ্রেমীর মনে গভীর দাগ কাটবেন? বাবা কুঞ্জলাল গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন পেশায় আইনজীবী এবং মা গৌরী দেবী গৃহবধূ। ছোটবেলায় আভাসকুমারের গলা কিন্তু মোটেই সুরেলা ছিল না। শোনা যায়, একবার পায়ে আঘাত পাওয়ার পর টানা কয়েকদিন কাঁদার ফলে তাঁর গলার স্বর অদ্ভুতভাবে বদলে যায়। এরপর যেমন তাঁর গানের গলা, তেমনি তাঁর অভিনয়ে দক্ষতা। তাঁর সব শৈলীই যেন স্বতঃস্ফূর্ত।

বড়দা অশোককুমার হিন্দি ছবির জগতে নামডাক করার পর তাঁর পথ অনুসরণ করে আভাস যখন মুম্বইতে গানের জগতে পা দেন, দাদার নামের সঙ্গে মিলিয়ে নিজের নাম পালটে করে নিয়েছিলেন কিশোরকুমার। একদম প্রথমে কাজ শুরু করেছিলেন কোরাসশিল্পী হিসেবে বোম্বে টকিজে। প্রথমদিকে অনেকেই তাঁর গায়কি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু নিজের অদম্য চেষ্টায় তিনি সেই বাধাও পার হন। তারপর তিনি প্রথম হিন্দি ছবিতে গানের সুযোগ পেয়েছিলেন ১৯৪৮ সালে প্রখ্যাত সুরকার ক্ষেমচাঁদ প্রকাশের সংগীত পরিচালনায় ‘জিদ্দি’ ছবিতে। দেব আনন্দের লিপে গাওয়া ‘মরনে কী দুয়ায়েঁ কিউঁ মাঙ্গু’ গানটি দিয়ে তাঁর যে পথ চলা শুরু হয়েছিল, তা আর কখনও থামেনি।

কিশোরকুমার সংগীতের পুরোনো দিনের আর এক দিকপাল কেএল সায়গলের বড় ভক্ত ছিলেন। প্রথমদিকে তাঁর গায়কিতে সায়গলের প্রভাব স্পষ্ট ছিল। তাছাড়া রবীন্দ্রসংগীতও তিনি খুব ভালোবাসতেন। সত্যজিৎ রায়ের ‘চারুলতা’ ছবিতে তাঁর গাওয়া ‘আমি চিনি গো চিনি তোমারে’ আজও শ্রোতাদের কানে বাজে। সলিল চৌধুরী, শচীনদেব বর্মন থেকে শুরু করে রাহুলদেব বর্মনের মতো গুণী সুরকারদের সঙ্গে কাজ করে তিনি প্রচুর কালজয়ী গান উপহার দিয়েছেন। রাজেশ খান্না বা অমিতাভ বচ্চন থেকে শুরু করে পরবর্তী প্রজন্মের বহু নায়কের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিলেন তিনি। তাঁর মতো স্বতন্ত্র কণ্ঠ খুব কম শিল্পীর মধ্যেই চোখে পড়ে। সেই অর্থে দেখলে দ্বিতীয় কোনও কিশোরকুমার আর কোনওদিনই জন্মাবেন না। ১৯৫০ থেকে ১৯৭০-এর দশকে তিনি বেশ কয়েকটা হিন্দি ছবিতে সফলভাবে অভিনয়ও করেছিলেন। সেই সময়ের জনপ্রিয় ছবি যেমন ‘পড়োসন’ কিংবা ‘চলতি কা নাম গাড়ি’তে অভিনয়ের দক্ষতা প্রদর্শনের সঙ্গে সঙ্গে নিজের গাওয়া বেশ কিছু হিট গানে লিপও দিয়েছেন। ‘পড়োসন’ ছবিতে বিদ্যাপতি চরিত্রে তাঁর সেই অভিনয় আজও সমান জনপ্রিয়।

কত গান যে কিশোরকুমার দ্বৈত কণ্ঠে গেয়েছিলেন লতাজি কিংবা আশাজির সঙ্গে, যেগুলোর বেশিরভাগই প্রবল জনপ্রিয় আর আজও স্বর্ণযুগের গান হিসেবে সবার মুখে মুখে ফেরে। বিশেষ করে রাহুলদেব বর্মনের সুরে আশা ভোঁসলে এবং কিশোরকুমারের দ্বৈত গানগুলি ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। কিশোরকুমারের কাজ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁরই গান গেয়ে কত উদীয়মান শিল্পী সংগীতকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। কুমার শানু কিংবা অভিজিৎ ভট্টাচার্যের মতো শিল্পীরা তাঁর গান গেয়েই নিজেদের কেরিয়ার শুরু করেছিলেন। শুধু ভারতবর্ষ কেন, বিশ্বের বহু দেশে কিশোরকুমারের জনপ্রিয়তা আজও তুঙ্গে। ভারতীয় ডাক বিভাগ ২০১৬ সালে কিশোরকুমারকে শ্রদ্ধা জানিয়ে সম্মানিক পাঁচ টাকার ডাকটিকিট বের করেছিল।

এত বড় মাপের একজন শিল্পীর বেশ কিছু মজার গল্প অনেকেই হয়তো জানেন বা জানেন না। অবাক করার মতো বিষয় হল, কিশোরকুমার সংগীতের কোনও তালিম অর্থাৎ প্রথাগত শিক্ষা কিন্তু কখনও নেননি। অথচ সেই মানুষটি প্রায় বারোশো ছবিতে প্লে-ব্যাক গায়ক হিসেবে দাপটের সঙ্গে কাজ করেছিলেন। কিশোরকুমার ইন্ডাস্ট্রির একমাত্র শিল্পী যিনি রেকর্ডিংয়ের সময় লতাজি হাজির না হওয়ার কারণে পুরুষ ও মহিলা দুই কণ্ঠেই ‘আকে সিধি লগি দিল পে’ গানটা গেয়ে দিয়েছিলেন। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী তাঁর রেকর্ড করা গানের সংখ্যা কয়েক হাজার। বাংলা ও হিন্দি ছাড়াও মারাঠি, অসমিয়া, গুজরাটি, কন্নড়, ভোজপুরি ও ওডিয়া ভাষাতেও তিনি সাবলীলভাবে গান গেয়েছেন।

কিশোরকুমার যে খুব সুন্দর ইয়োডেলিং করতে পারতেন তা কারও অজানা নয়। পাশ্চাত্য সংগীতের এই বিশেষ কৌশলকে তিনি ভারতীয় গানে অত্যন্ত সফলভাবে প্রয়োগ করেছিলেন। শোনা যায় ইন্দোর কলেজে তাঁর পাঁচ টাকা বারো আনা ধার ছিল। সেটাকে নিয়ে হয়ে গেল তাঁর এক বিখ্যাত গান ‘পাঁচ রুপাইয়া বারা আনা’। এত গানপাগল মানুষটি ‘দূর গগন কি ছাঁও মেঁ’ (১৯৬৪) ছবির পরিচালনা ও প্রযোজনা করেছিলেন যার মধ্যে একটাও গান ছিল না। ভাবতে অবাক লাগে, তাই না?

খামখেয়ালি মানুষটির ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও অনেক মজার মজার গল্প আছে। মুম্বইয়ের বাড়ির সামনে একটা সাইনবোর্ড লাগিয়েছিলেন যাতে লেখা ছিল ‘বিওয়্যার অফ কিশোর’। শোনা যায় এক প্রযোজক কিশোরকুমারের বাড়িতে তাঁর কিছু বাকি পাওনা টাকা দিতে এসেছিলেন। টাকা দেওয়ার পর সেই প্রযোজক তাঁকে করমর্দন করতে গেলে কিশোরকুমার হাতটা টেনে মুখে নিয়ে কামড় বসিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ওই সাইনবোর্ডটা দেখেননি বুঝি? কিশোরকুমার বাইরে মজাদার মানুষ হলেও ব্যক্তিগতভাবে খুব একা থাকতে ভালোবাসতেন। তিনি এক সাক্ষাৎকারে খোলাখুলি স্বীকার করেছিলেন যে, মানুষের সঙ্গের চেয়ে প্রকৃতি তাঁর কাছে অনেক বেশি প্রিয়। তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিজের বাগানে সময় কাটাতে পছন্দ করতেন। অন্তরঙ্গ বন্ধুর মতো তাঁর বাগানের গাছগুলোর নাম রেখেছিলেন গুলবাকাওয়ালি কিংবা অমৃতাঞ্জন।

১৯৭৬ সালে ভারতবর্ষে জরুরি অবস্থা চলাকালীন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের রাজনৈতিক সমাবেশে গান করতে রাজি না হওয়ার শাস্তি হিসেবে আকাশবাণী ও দূরদর্শন কিশোরকুমারের গানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আনে। এমনকি তাঁর অভিনীত ছবিগুলিও টিভিতে দেখানো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এরকম একজন শিল্পীকে তো আর এভাবে দমিয়ে রাখা যায় না। জরুরি অবস্থা ওঠার পর তিনি স্বমহিমায় ফিরে আসেন। একজন শিল্পী হিসেবে তিনি ছিলেন একদম অন্য ধাঁচের। গানের পারিশ্রমিকের ব্যাপারে একদম ছেড়ে কথা বলতেন না। শোনা যায় কোনও এক প্রযোজক তাঁর প্রাপ্য পারিশ্রমিকের অর্ধেক দিয়ে আর অর্ধেক বাকি রাখার জন্য গান রেকর্ডিংয়ের সময় অর্ধেকটা করে থেমে গিয়েছিলেন। একবার এক ছবির শুটিংয়ের ঠিক আগে কিশোর জানতে পেরেছিলেন যে, ছবির প্রযোজক পুরো পারিশ্রমিক জমা দেননি। তিনি সেদিন মুখের একদিকে মেকআপ করে সোজা সেটে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন। পরিচালক হতচকিত হয়ে তাঁর ওই অবস্থার কারণ জিজ্ঞেস করলে কিশোর উত্তর দিয়েছিলেন, আধা পয়সা তো আধা মেকআপ। আপনারা হয়তো অনেকেই দেখেছেন, কিশোরকুমার ও রুমা গুহঠাকুরতার সন্তান আরেক সংগীতশিল্পী অমিতকুমার তাঁর বাবার অনেক স্মৃতি আর মজাদার ঘটনার কথা লাইভ অনুষ্ঠানে বলে থাকেন।

শিল্পী কিশোরকুমার ১৯৮৭ সালের ১৩ অক্টোবর মাত্র আটান্ন বছর বয়সে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মনে পড়ছে সেই ঘটনার দিন ছিল তাঁর বড়দা অশোককুমারের ছিয়াত্তরতম জন্মদিন। ভাইয়ের মৃত্যুর পর তিনি আর কখনও নিজের জন্মদিন পালন করেননি। মৃত্যুর আগের দিনও কিশোরকুমার আশাজির সঙ্গে বাপি লাহিড়ির সুরে ‘ওয়াক্ত কি আওয়াজ’ ছবির জন্য একটা গান রেকর্ড করেছিলেন, যে ছবিতে অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তী ও শ্রীদেবী অভিনয় করেছিলেন। শিল্পীর জীবন থেমে যায়, কণ্ঠ থামে না। তাঁর গাওয়া ‘তেরে বিনা জিন্দেগি সে কোই শিকওয়া তো নেহি’ বা ‘কুছ তো লোগ কহেঙ্গে’ আজও শ্রোতাদের মনে সমানভাবে দাগ কাটে। তাই ৯৭তম জন্মবার্ষিকীতেও কিশোরকুমার শুধু স্মৃতির নন, তিনি প্রতিদিনের শ্রোতারও শিল্পী।

(লেখক অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক।)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *