সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্রের রেশন কার্ড, উচ্চমহলের নির্দেশে ছুটে এলেন আধিকারিক!

ব্যবসা-বাণিজ্যের /BUSINESS
Spread the love


গুমনামি বাবাই  কি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু? এই বিষয়ে কোনও নিশ্চিত ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। তবে উত্তরপ্রদেশের ফৈজাবাদে (বর্তমান অযোধ্যা) নিঃসঙ্গ জীবন কাটানো ‘গুমনামি বাবা’ বা ‘ভগবানজি’কে অনেকে নেতাজিই মনে করেন। তাহলে সত্যিটা আসলে কী? দীর্ঘ গবেষণায় অসংখ্য তথ্যপ্রমাণ খতিয়ে দেখে, গুমনামি বাবার সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের বয়ান ঘেঁটে চমকে দেওয়া উত্তর পেয়েছেন দুই লেখক ও গবেষক সৈকত নিয়োগী ও সৌম্যব্রত দাশগুপ্ত। সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটালে প্রকাশিত হচ্ছে সেই ধারাবিবরণী— ‘মহামানবের চরণতলে’।

আবার আমাদের যাত্রা শুরু হল। রামকিশোরজির ছোট ছেলে অরুণবাবু আমাদের সঙ্গী হলেন গাড়িতে। মাতাজি সরস্বতী দেবী শুক্লার পুত্র রাজকুমার তো ছিলেনই। এবারের গন্তব্য লালকুঠি। সাধু মহন্তদের স্থান। এখানে একটা বিষয় স্পষ্ট বলে রাখা প্রয়োজন, সুভাষচন্দ্র কোনও প্রথামতো সাধু ছিলেন না। সন্ন্যাসীদের মধ্যে মিশে থেকে অজ্ঞাতবাস সহজ, তাই তিনি সেই পথ বেছে নিয়েছিলেন। লালকুঠিতে একটা ঘটনার কথা শুনেছিলাম জয়শ্রী পত্রিকার সুরজিৎবাবুর কাছে। এখানে এসেছিলেন পুরনো বিপ্লবী সন্তোষ ভট্টাচার্য এবং দুলাল নন্দী। একটা রেশন কার্ডের প্রয়োজন ছিল ভগবানজির। সরস্বতী দেবী বলেছিলেন, রেশনের ব্যবস্থা হলে দুর্গতি অনেকটা লাঘব হবে। কিন্তু সন্ন্যাসীর রেশন কার্ড হবে কিভাবে?

আরও পড়ুন:

তার যে পরিচয়পত্র দেওয়া যায় না। সরস্বতী দেবীরও পরিচয়পত্র নিয়ে সমস্যা ছিল। তাই দুলালবাবু এবং সন্তোষ ভট্টাচার্য গেলেন স্থানীয় প্রশাসনিক কর্তার কাছে। “বেশ, সন্ন্যাসীকে নিয়ে আসুন! তাঁকে সামনে থেকে না দেখলে তাঁর পরিচয়পত্র, শংসাপত্র সই করব কীভাবে?” যুক্তিসঙ্গতই কথা। কিন্তু এই জটিল সমস্যার সমাধান হবে কীভাবে? নানা কথা ভাবতে ভাবতে নানারকম ব্যবস্থা চেষ্টা করতে করতে শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ মনোরথ হয়ে তাঁরা ফিরে এলেন লালকুঠিতে। সন্ন্যাসীকে কী বলবেন? বিপ্লবী আন্দোলনের সময় এত সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন এবং সমাধান সূত্র বের করেছেন সন্তোষবাবু। ১৯৪০ সালে রামগড়ে আপসহীন সংগ্রামের যে ডাক দিয়েছিলেন সুভাষচন্দ্র, সেই সম্মেলন ভেস্তে দিতে কংগ্রেসের দক্ষিণপন্থী নেতা, ব্রিটিশ পুলিশের গুপ্তচর সকলেই সক্রিয় ছিল। তার উপর মরার উপর খাড়ার ঘা-র মতো নেমেছিল প্রবল বৃষ্টি।

আরও পড়ুন:

লালকুঠির ফটক দিয়ে মুক্ত প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতেই একটা গোল মতো বসার জায়গা। অরুণবাবু এখান থেকে বিদায় নিলেন।

সবকিছু উপেক্ষা করে বিপ্লবী হরেন ঘোষের সঙ্গে ট্রেঞ্চ কেটে সেই সম্মেলনে জল নিকাশি ব্যবস্থা সম্পন্ন করে সুভাষচন্দ্রের সম্মান রক্ষা করেছিলেন সন্তোষবাবু। তিনি কিনা একটা রেশন কার্ডের ব্যবস্থা করতে পারলেন না? বিষাদগ্রস্ত মনে যখন লালকুঠিতে প্রবেশ করছেন দু’জনে, অবাক কান্ড! সেই সরকারি আধিকারিক স্বয়ং ছুটে এসেছেন লালকুঠিতে। বিশাল ফটক দিয়ে ঢুকে ডানদিকে একটা মাঠ। সেখানে বেতের চেয়ারে অন্য এক সন্ন্যাসী বসে ছিলেন। তাঁর পায়ে উপুর হয়ে প্রণাম করে আধিকারিক বলছেন, “আপনার রেশন কার্ডের প্রয়োজন? আমি বুঝতে পারিনি।” সন্তোষবাবুরা তাঁকে নিয়ে গেলেন ভগবানজির কাছে। ঘটনা কি ঘটে? এরমধ্যে উচ্চমহল থেকে আধিকারিকের কাছে নির্দেশ এসেছিল সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্রের রেশন কার্ডের ব্যবস্থা দ্রুত করতে। তিনি যে সুভাষচন্দ্র সে কথা অবশ্য বলা হয়নি।

সুভাষবাবু কোথাও প্রশাসনিক প্রভাব প্রয়োগ করতে চাইতেন না। সেই জন্যেই সন্তোষবাবুদের ব্যবস্থা করতে বলেছিলেন। এই ঘটনার কথা চিত্তরঞ্জনের গুলমোহর এভিনিউতে বসে স্বয়ং দুলালবাবুর কাছে শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল। প্রায় ১০ বছর পর সেই লালকুঠিতে এসে উপস্থিত হয়েছি আমরা! কয়েক যুগ পেরিয়ে গিয়েছে। বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যেতে যেতে সেই অশ্রুতপূর্ব ঘটনা বেঁচে রইল আলোচনায়। সেই উপাখ্যান আজ বহন করছি আমরা।

সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্রের জীবনের কোন রহস্য লুকিয়ে এই গুপ্তার ঘাটে!

লালকুঠির ফটক দিয়ে মুক্ত প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতেই একটা গোল মতো বসার জায়গা। অরুণবাবু এখান থেকে বিদায় নিলেন। এই অঞ্চলে এখন গুর্জর সমাজের সন্ন্যাসীরা রয়েছেন। গোল রকের মত বসার জায়গায় তারা সব ধর্মালোচনায় ব্যস্ত। কুণাল বসু ইতিহাসের কালচক্র ক্যামেরায় অক্ষয় করে রাখতে ‘সশস্ত্র’ হলেন। আমরা ঝাড়া হাত-পা। মনের আনন্দে ছুটে গেলাম সন্ন্যাসীর স্মৃতি সন্ধানে। উপস্থিত সন্ন্যাসীদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়ে দিলাম, ‘এখানে
সুভাষচন্দ্র ষাটের দশকে থাকতেন। এই বিষয়ে আপনারা কিছু বলতে পারেন?’ আমাদের প্রশ্ন শুনে অবাক জলপান! সন্ন্যাসীরা একে অপরের চাওয়াচাওয়ি করছেন। রাজকুমার শুক্লা বলে চললেন, “ আমরা থাকতাম বাঁদিকের ঐ কোণার দিকের একটা ঘরে। ছোটবেলায় তখন আমার দশ বছর বয়স। বিশেষ কিছু মনে নেই। তবে পরে মায়ের কাছে অনেক গল্প শুনেছি। আবছা মনে পড়েছে ঘরটা!” আমরা লক্ষ্য করলাম রাজকুমারজির চোখে জল।

ভগবানজির এখানে থাকার সময় জলের কষ্ট ছিল। দেশনেত্রী লীলা রায়ের অত্যন্ত বিশ্বাসভাজন দুলালবাবু সেই সমস্যা নিরসন ঘটিয়েছিলেন। তার পারদর্শিতা ছিল জার্মান টেকনোলজির জলের পাম্প তৈরির ক্ষেত্রে। এখানে ঘরের মধ্যেই সেই পাম্প ব্যবস্থা তিনি করেছিলেন। যার ফলে দূরে কষ্ট করে আর জল আনতে যেতে হত না। কেউ প্রশ্ন তুলতেই পারে, স্বয়ং দুলালবাবুর মুখ থেকে সেই গল্প শোনার সৌভাগ্য যাদের হয়েছিল, তাদের অন্তত কিছু প্রমাণ করার নেই | আমরা সেই গল্পগুলো নথিভূক্ত করতে বদ্ধপরিকর। ইতিহাসের প্রমাণস্বরূপ রয়েছে বিখ্যাত হস্তলিপি বিশারদ ডক্টর বংশী লাল কাপুরের বাইশ পাতার রিপোর্ট। কিন্তু জনশ্রুতির গুরুত্ব কি ইতিহাসে কম? তাহলে লালন ফকির, সক্রেটিস, প্লেটোর গল্প বলবে কে?

গুমনামি বাবা বলে আদৌ কেউ ছিল না। তাঁর অন্তর্ধানের পর মিডিয়াতে এই নাম প্রচার হয়।

সেই ঘরে ঢোকার অনুমতি নেই। সেখানে এখন গুর্জর সমাজের সন্ন্যাসীরা রয়েছেন। তাহলে কি এখান থেকে কেবলমাত্র রাজকুমারজির ভিডিও করেই ফেরত যেতে হবে? আমরা কি সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্রের ঘর দেখতে পাবো না? সেটা হতেই পারে না। দুর্বৃত্তের ছলের অভাব হয় না। আর আমাদের মতো অনুসন্ধিৎসু গবেষকদের তো কথাই নেই। কুণাল বসু বললেন, একবার শুধু ঢুকতে পারি, স্পাই ক্যামেরা তো রয়েছেই। সব সময় সব জায়গায় নিয়ম মেনে অগ্রসর হওয়া যায় না। কোথাও অগ্রসর হয়ে নিয়মকে নিজের মতো মানিয়ে নিতে হয়। রহস্য রোমাঞ্চের সন্ধানে এই থাম্বরুল আমরা অভ্যাস বশে অধিগত করেছি। বেশ কয়েকজন সন্ন্যাসীকে আমরা অনুরোধ করলাম। কিন্তু যে কোনও কারণবশত অনুমতি পাওয়া গেল না। অগত্যা?

“আমরা কলকাতা থেকে এসেছি। অযোধ্যায় সন্ন্যাসীদের জীবন নিয়ে একটা তথ্যচিত্র নির্মাণ করছি। গুর্জর সমাজের জীবন সম্পর্কে জানতে এসেছি লাল কুঠিতে।” এবার বেশ কাজ দিল। সেইমতো কিছুক্ষণ কথা বলতেই সরাসরি মহন্তের সাক্ষাৎপ্রার্থী হলাম। নানান ভনিতার পর এলাম আসল প্রশ্নে | “ ইহা পে গুমনামীবাবা বোলকে কোয়ি রহেতা থা । সব বোলতে থে, বো-হি নেতাজি থে।”

বার্লিনে জার্মান সেনানায়কদের সঙ্গে হাস্যমুখে নেতাজি।

গুমনামি বাবা বলে আদৌ কেউ ছিল না। তাঁর অন্তর্ধানের পর মিডিয়াতে এই নাম প্রচার হয়। অনুরামীরা তাঁকে ভগবানজি বলে ডাকতেন। এত কথা ওখানে বলে কোন লাভ নেই। যস্মিন দেশে যদাচার। গুমনামিবাবা নামটা এত প্রচার হয়েছে, এই নামটাই জিজ্ঞেস করা ভালো। যদি কিছু বলতে পারেন।

“হা ইহা পে রহতে থে।” মহন্ত মশাই তার পূর্বসূরীর কাছে শুনেছেন। তিনি উদ্যত হলেন আমাদের সেই স্থান দেখাতে। লালকুঠির ভিতরে প্রধান অট্টালিকার বাম দিকের ঘর। মাঝখানের অংশটার কাছে গিয়ে মহন্ত দেখালেন, সেখানেই থাকতেন সুভাষচন্দ্র। তিনি জানালেন, সুভাষবাবু নিজের জন্য একটা বিশেষ ধরনের পাম্প বসিয়েছিলেন সেই ঘরের মধ্যেই। আমরা সকলেই বাকরুদ্ধ। ক্যামেরায় সব নজরবন্দি করতে করতে আমাদের দিকে ফিরে তাকালো কুণাল বসু। কিছুক্ষণ আগেই সেই ঘটনা “আই এম বোস” চ্যানেলের জন্য সাক্ষাৎকারে ক্যামেরাবন্দি করেছিল কুনালদা। এখন সেই ঘটনাই বলে গেলেন মহন্ত। আমাদের মনে পড়ছিল দুলালবাবুর কথা। কিছুই হারিয়ে যায় না। স্মৃতির মনিকোঠায় সবই অক্ষয়।

নেতাজি অনুগামীদের মধ্যে যারা বিমান দুর্ঘটনার তত্ত্বে বিশ্বাস করেন না, রাশিয়াতে নেতাজির মৃত্যুর তত্ত্বে বিশ্বাস করেন, তারা মনে করে এই ন্যারেটিভে ঠিক নেতা সুলভ আচরণ নেই।

লালকুঠি থেকে বেরিয়ে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য সেই নির্মীয়মান মন্দির যেখান থেকে আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল। প্রচন্ড অসুস্থ রাজকুমারজিকে সেখানে রেখে আমরা জানালাম পরের দিন আমরা যাবো পুরানি বস্তি। এর পরের গন্তব্য ডাক্তার দশরথ সিং তোমার। কুণাল বসুর সঙ্গে ফোনে কথা হতে ডাক্তারবাবু জানালেন বিশেষ কারণে লখনউ গিয়েছিলেন। অযোধ্যা প্রত্যাবর্তন করছেন। কোথায় দেখা করা ঠিক হতে পারে? আমাদের আলোচনায় উঠে এলো গুপ্তার ঘাট! সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্রের রহস্য জীবনে সবচেয়ে অবহেলিত এই স্থান। সরকার মনে করে, সেখানে সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্রের স্মৃতি প্রকট হলে প্রকারান্তরে ১৯৪৫ সাল পরবর্তী অজ্ঞাত জীবনকে মান্যতা দেওয়া হবে। তাই তারা অমূল্যে এই স্থানটিকে সন্ন্যাসী স্মৃতির অন্যান্য সকল স্থানের থেকে হয়তো অধিক পরিমাণে পরিত্যাজ্য করে রেখেছে।

নেতাজি অনুগামীদের মধ্যে যাঁরা বিমান দুর্ঘটনার তত্ত্বে বিশ্বাস রাখে, তাঁরা মনে করে এই স্থানের গল্প এক বিশেষ রাজনৈতিক দলের ন্যারেটিভ। সেই বিশেষ রাজনৈতিক দল মনে করে সন্ন্যাসী সমাজতন্ত্রী ছিলেন। নেতাজি অনুগামীদের মধ্যে যারা বিমান দুর্ঘটনার তত্ত্বে বিশ্বাস করেন না, রাশিয়াতে নেতাজির মৃত্যুর তত্ত্বে বিশ্বাস করেন, তারা মনে করে এই ন্যারেটিভে ঠিক নেতা সুলভ আচরণ নেই। নেতাজি কখনও স্বাভাবিক জীবন যাপন করতেই পারেন না! যুদ্ধে পরাজয়ের পরিস্থিতি আসলে তিনি বীরের মতো আত্মত্যাগ করবেন। নেতাজিকে নেতাজি হয়ে থাকার জন্য মরতেই হবে! যাঁরা সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্রে বিশ্বাস রাখেন, তাঁদের মধ্যে একদল মনে করেন— এখানেই নেতাজির মৃত্যু হয়েছে । আবার অপর দল মনে করেন— নেতাজির মৃত্যু নেই! এত ন্যারেটিভের মধ্যে এই সহজ সত্য হারিয়ে যায়, যে দেহ তিনি স্পর্শ করেছিলেন সে দেহ ধন্য! আর নেতাজি? একই সঙ্গে জীবন্মৃত এবং মৃত্যুঞ্জয়ী!

(পরবর্তী পর্ব মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর)

আরও পড়ুন:

সর্বশেষ খবর

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *