- চিরদীপা বিশ্বাস
‘জন্মদিনে আইফোন গিফট পেয়ে কী যে খুশি পুঁচকে নাতিটা আমার’- সঙ্গীকে বলতে বলতে পার্কের বেঞ্চিতে এসে বসলেন এক প্রৌঢ়। এমনি সময় জনা তিন-চারেক স্কুল পড়ুয়া ‘আরে রিল দ্যাখ রিল, এইসব নভেলের সামারি তো চ্যাটজিপিটি থেকেই পেয়ে যাবি’- বলে হাসতে হাসতে সামনে দিয়ে চলে গেল। কথোপকথন শুনে দুই প্রৌঢ়ের চোখেমুখে ‘প্রজন্মটা উচ্ছন্নে গেল রে’ হাবভাবটা স্পষ্ট।
সম্প্রতি একটি সমীক্ষার তথ্য বলছে, আট থেকে তেইশ বছর বয়সিরা নাকি দেড়-দু’ঘণ্টার মধ্যে গড়ে ৩৬০–৪৮০ রিলের পাতা উলটে ফেলে। প্রতি মিনিটে ১৪৯ মিলিয়ন ইনস্টা রিল সারা দুনিয়াজুড়ে মানুষ দেখে। এই তথ্য যদিও সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতেই জানা, তাই ঠিকভুল যাচাই করার অবকাশ মেলেনি। তবে নিজের পরিপার্শ্বকে ভালো করে দেখলে গড়পড়তায় এই পরিসংখ্যানকে ভ্রান্ত ঠাওরানো যায় না। এ প্রসঙ্গে ‘ডোপামিন রাশ’-এর বিষয়টি উঠে আসে, যা আজকাল বড্ড চর্চিতও বটে। সোশ্যাল মিডিয়াও এটি রপ্ত করেই চলছে। তাইতো বড় ভিডিওর বদলে ছোট্ট ছোট্ট রিলের রমরমা। আর মিনিট কুড়ির একখানা গোটা ভিডিও ধৈর্য সহকারে দেখতে পারে না যে মাথা তার জন্য ৪০০ পাতার নভেল বাড়াবাড়ি নয় কি!
আসলে কিছু কিছু ঘটনা আমাদের মস্তিষ্কের কাছে খুশি হওয়ার (ফিল গুড) নির্দেশ দেয়, ডোপামিন নামক ওই হরমোনেরই কারিকুরি আর কী। এবার এটা কোনও প্রতিযোগিতা জয়ের মুহূর্ত হতে পারে আবার মায়ের হাতের দারুণ সুস্বাদু খাবার চেখে দেখা। কিন্তু এই দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম আজকাল আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দেয়। আমরা এখন খুশি হতে চাই, তৃপ্ত হতে চাই ভীষণ দ্রুত। প্রতি ৩০ বা ৬০ সেকেন্ড অন্তর অন্তর আমাদের ডোপামিনের স্পার্ক চাই। সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইক, কমেন্টের বন্যাও এর অন্যতম ভাগীদার।
এবার এখানে ‘প্রজন্ম রসাতলে গেল’ মনে হওয়ার কী আছে! গুড ফিল করার অধিকার তো সকলের। কেউ ডিকশনারিতে শব্দের অর্থ খুঁজে আনন্দিত হয় তো কেউ ‘হে অ্যালেক্সা হোয়াট ইজ দ্য মিনিং অফ…’ প্রশ্ন করে। আসলে ‘প্রজন্মটার মধ্যে ধৈর্য নামক কোনও বস্তুই নেই’ বলাটা ভীষণ সোজা, কিন্তু এই প্রজন্মের বাল্যকালে নিজেদের ধৈর্য শক্ত করে বেঁধে রেখে মোবাইলে কার্টুন চালিয়ে খাবার না খাইয়ে গল্প বলাটা বড্ড কঠিন, সময় অপচয় হয় যে। যে প্রজন্ম বড়ই হল গুগল, মাইক্রোসফট, সোশ্যাল মিডিয়া দেখতে দেখতে, তাদের ‘পথের পাঁচালী’ পড়তে পড়তে নিশ্চিন্দিপুরের গ্রামে হারিয়ে যাওয়ার কল্পনাশক্তি জন্মাবে কীভাবে? তারা ভাত খেতে খেতে ঠাকুরমার ঝুলির গল্প শোনেনি, শীতের দুপুরে কম্পিউটার ক্লাস বাতিল করে একটা দিনের জন্যও দিদার সঙ্গে বসে উলবোনা দেখেনি। তারা ছোট থেকে যা শিখেছে বড় হওয়ার পথে সেটাই করছে কারণ তাদের ভবিষ্যৎ সেটাই ডিমান্ড করে। সুতরাং, ডোপামিন রাশের একাল-সেকাল নিয়ে বেশি চিন্তিত না হয়ে, ধৈর্য নামক বস্তুটাকে বাড়ানোর কিছুটা পদক্ষেপ করা উচিত অঙ্কুরেই। জন্মদিনে মোবাইল বা ট্যাবলেট উপহার না দিয়ে বই উপহার দিন, কল্পনায় ভাসার পথ তৈরি করে দিন; যাতে চ্যাটজিপিটি থেকে নভেলের সারসংক্ষেপ নয় বরং নভেল পড়ে জীবনের রাস্তা চেনার নতুন উপায়ের সন্ধান মেলে।
(লেখক কোচবিহারের ভূমিকন্যা, পূর্ণিয়াতে কর্মরত)
