ভারতকে দেশের শাসকদল বিজেপি গণতন্ত্রের জননী বলে থাকে। দেশের গণতান্ত্রিক চেতনা সমৃদ্ধ ও নিজেদের গণতান্ত্রিক মানসিকতা প্রমাণ করার জোরালো চেষ্টা থাকে ওই শব্দবন্ধের মধ্যে। শাসক শিবিরের পাশাপাশি বিরোধীরাও গণতন্ত্রের প্রতি প্রেম জাহিরে মরিয়া। নিজেদের সম্পর্কে গণতন্ত্রের উপাসক, গণতন্ত্রের প্রতি আস্থাশীল ইত্যাদি প্রচারে সচেষ্ট তারা। গণতন্ত্র সুরক্ষিত রাখতে নাকি শাসক, বিরোধী- সব পক্ষই সক্রিয়।
বাস্তবে অবশ্য শাসক হোক কিংবা বিরোধী- সকলের কাছে গণতন্ত্রের ধারণাটি ভোটের রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ। তাদের লক্ষ্য একটাই, যেনতেনপ্রকারে ভোটে জিতে পাঁচ বছরের জন্য সরকারি ক্ষমতা পকেটস্থ করা। রুজিরুটির জন্য প্রতিদিন আমজনতার সমস্যার সমাধানে সরকার ও বিরোধী- কোনও শিবিরই সেই অর্থে সক্রিয় নয়। তারা মানুষের দৈনন্দিনের সমস্যা আলোচনা করে, তর্কবিতর্ক করে। কিন্তু তারপর সব ভুলে যায়।
রোটি, কাপড়া, মকান নিয়ে শাসক-বিরোধীর আলোচনা কার্যত উধাও হয়ে গিয়েছে দেশ থেকে। কর্মসংস্থান, মূল্যবৃদ্ধির জাঁতাকল থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হত কি না, তা নিয়ে হয়তো সংশয় থাকত আগে। কিন্তু চিন্তাভাবনার পরিসরের অনেকটা জায়গাজুড়ে রুজিরুটির বিষয়গুলি অগ্রাধিকার পেত। কিন্তু এখন মানুষ ও রাজনীতিবিদদের আলোচনায় ঠাঁই পাচ্ছে মন্দির-মসজিদ, গীতা-কোরান, হিন্দু-মুসলিম, বন্দে মাতরম ইত্যাদি নিয়ে বিতর্কগুলি।
হুমায়ুন কবীরের মতো একজন সাধারণ জনপ্রতিনিধি প্রতিদিন সংবাদের শিরোনাম হচ্ছেন শুধুমাত্র একটি মসজিদের শিলান্যাসকে কেন্দ্র করে। প্রচারে ভেসে থাকতে তিনি প্রতিদিন কিছু না কিছু মন্তব্য করছেন। সেটাই খবর হচ্ছে। আবার গীতা পাঠের মতো একটি ব্যক্তিগত বিশ্বাস নিয়ে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে আয়োজিত আসরের লক্ষ্য যে রাজনীতির রুটি সেঁকা, সেটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে।
অথচ ব্রিগেডের ওই অনুষ্ঠানকে আর পাঁচটা সাধারণ জমায়েত ভেবে রুজিরুটির টানে একজন গরিব মানুষ চিকেন প্যাটিস বিক্রি করতে গিয়ে হেনস্তার শিকার হলেও সেদিকে নজর দেওয়ার কেউ নেই। প্রতিদিন ভারতে এরকম কোটি কোটি মানুষ নিজের ও পরিবারের গ্রাসাচ্ছদনের লড়াই লড়ছেন। তাঁদের কথা কেউ ভাবে না। গণতন্ত্রের অর্থ জনতার শাসন। কিন্তু মন্দির-মসজিদ নিয়ে এত চর্চা হচ্ছে যে, সেখানে জনতাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
মেরুকরণ ও বিভাজনের বিষবৃক্ষকে সামনে রেখে দুই ধর্মীয় সম্প্রদায়কে লড়িয়ে দিয়ে ভোটের রাজনীতিতে লাভবান হওয়ার প্রয়াস সর্বত্র দৃশ্যমান। সেই লড়াই বন্ধের উদ্যোগ কাউকে নিতে দেখা যাচ্ছে না। শাসকের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে বিরোধীরা প্রকারান্তরে ক্ষমতাধরদের সুবিধা করে দিচ্ছে। ডলারের দামের নিরিখে অতীতের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে ভারতীয় মুদ্রা ৯০ টাকা পেরিয়ে গেলেও কোন হা-হুতাশ নেই।
সরকার চুপ, বিরোধীরাও তাই। ভারতে বেকারত্বের ছবি ক্রমশ ভয়াবহ হচ্ছে। কিন্তু কারও হুঁশ নেই। জিএসটি হ্রাসের পর্ব পেরিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম ক্রমশ বেড়ে চলেছে। বাজার খরচ আকাশছোঁয়া। প্রতিদিন ডিম খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে বিজ্ঞাপনী প্রচার চললেও ডিম এখন অগ্নিমূল্য। সেসব নিয়ে কথাবার্তা সামান্যই হয়। বরং অনেক বেশি হুংকার, চর্চা বন্দে মাতরম নিয়ে।
যাঁরা দেশকে ভালোবাসেন, দেশের সাফল্যে গর্বিত হন, ব্যর্থতায় যাঁরা কষ্ট পান, তাঁরা সকলেই জাতীয় স্ত্রোত্র এবং জাতীয় গানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব, মর্যাদা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। সেসব জেনেবুঝেও বন্দে মাতরমের কিছু অংশ কেন বাদ দেওয়া হল, তাতে জওহরলাল নেহরুর ভূমিকা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে বিতর্কেই সময় কেটে যাচ্ছে।
এই বিতর্কে অনায়াসে আড়াল করা যাচ্ছে আর্থিক বৈষম্যকে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে মানুষের নাজেহাল দশা নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা হয় না সংসদে। বিনা পয়সার র্যাশনের লাইনে কোটি কোটি মানুষকে দাঁড় করিয়ে দেশের জিডিপি বৃদ্ধির আলোচনা নেহাতই নির্বুদ্ধিতা। মানুষকে ধর্ম ও উগ্র জাতীয়তাবাদে আবিষ্ট রেখে গণতন্ত্র কখনও উন্নত হতে পারে না।
