প্রতিশ্রুতিই সার, লগ্নি বা কর্মসংস্থান কই?

প্রতিশ্রুতিই সার, লগ্নি বা কর্মসংস্থান কই?

শিক্ষা
Spread the love


 

  • অনিরুদ্ধ দাশগুপ্ত

নিউটাউনের কনভেনশন সেন্টারের ঝাড়বাতির আলোর রোশনাই আর বিশ্ব বাংলা গেটের আভিজাত্য এক মুহূর্তের জন্য চোখ ধাঁধিয়ে দিতে পারে। মঞ্চে দাঁড়িয়ে যখন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শিল্পপতিদের উদ্দেশে বলেন, ‘বেঙ্গল মিনস বিজনেস’, আর পালটা প্রশংসায় যখন শিল্পপতিরা রাজ্যকে ‘লগ্নির গন্তব্য’ বলে অভিহিত করেন, তখন মনে হয় সুদিন আর বেশি দূরে নয়। কিন্তু সম্মেলনের আলো নিভলে, শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষের বাইরে বেরিয়ে এলে বাস্তবটা বড়ই নির্মম, বড়ই ধূসর। সেখানে পরিসংখ্যানের জাদুকরী আছে, মউ সইয়ের পাহাড় আছে, কিন্তু যা নেই-তা হল কারখানার সাইরেন আর কর্মসংস্থান।

পশ্চিমবঙ্গে একের পর এক ‘বেঙ্গল গ্লোবাল বিজনেস সামিট’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিবারই সম্মেলনের শেষে ঘোষিত হয়েছে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকার লগ্নির প্রস্তাব। কিন্তু সেই প্রস্তাবের কত শতাংশ বাস্তবে রূপ পেয়েছে, আর কতটাই বা ফাইলে বন্দি হয়ে লাল ফিতের ফাঁসে আটকে আছে- প্রশ্ন আজ সাধারণ মানুষের মুখে মুখে। রাজ্য সরকারের দাবি এবং শিল্পোন্নয়নের বাস্তবের মধ্যে যে ফারাক, তা আজ আর ঢেকে রাখা যাচ্ছে না।

বাণিজ্য সম্মেলন : বাস্তব নাকি মরীচিকা?

রাজ্য সরকারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিগত কয়েকটি বাণিজ্য সম্মেলনে লগ্নির প্রস্তাবের অঙ্ক চোখ কপালে তোলার মতো। কোথাও ৩ লক্ষ কোটি, কোথাও ৪ লক্ষ কোটি টাকার প্রতিশ্রুতি। কিন্তু ‘ডিপার্টমেন্ট ফর প্রোমোশন অফ ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড ইন্টারনাল ট্রেড’-এর তথ্য বলছে অন্য কথা। প্রস্তাবিত লগ্নির খুব সামান্য অংশই বাস্তবে মাটিতে নেমেছে। খাতায়-কলমে সই হওয়া ‘মউ’ বা মেমোরেন্ডাম অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিং অনেক ক্ষেত্রেই ‘কাগুজে বাঘ’ হয়েই রয়ে গেছে।

শিল্পমহলের একাংশের মতে, এই সম্মেলনগুলো এখন অনেকটাই বাৎসরিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। গৌতম আদানি, মুকেশ আম্বানিরা আসেন, সৌজন্যমূলক প্রশংসা করেন, কিছু ঘোষণা করেন এবং চলে যান। কিন্তু সেই ঘোষণার বাস্তবায়ন কোথায়? মুকেশ আম্বানি জিও-র নেটওয়ার্ক বিস্তার বা রিলায়েন্স রিটেলের বিপণি খোলার কথা বলেন, যা মূলত পরিষেবা ক্ষেত্র। কিন্তু ভারী শিল্প বা ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টরে বড় কোনও বিনিয়োগের দেখা নেই। রিলায়েন্স বা আদানির মতো গোষ্ঠী গুজরাট বা মহারাষ্ট্রে যে মাত্রায় শিল্পস্থাপন করে, বাংলার ক্ষেত্রে তা কেবল ‘টোকেন ইনভেস্টমেন্ট’ হয়েই সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে।

তাজপুর এবং প্রতিশ্রুতির জট

সবচেয়ে বড় উদাহরণ তাজপুর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প। আদানি গোষ্ঠীকে এই প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছিল ধুমধাম করে। স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী আদানিদের হাতে নথিপত্র তুলে দিয়েছিলেন। আশা জেগেছিল, হলদিয়ার পর রাজ্যে আরও একটি বড় বন্দর তৈরি হবে, কর্মসংস্থান হবে হাজার হাজার তরুণের। কিন্তু সাম্প্রতিক খবর অনুযায়ী, রাজ্য সরকার এই প্রকল্পের জন্য নতুন করে টেন্ডার ডাকার কথা ভাবছে। অর্থাৎ, কয়েক বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও আমরা সেই শুরুর বিন্দুতেই দাঁড়িয়ে আছি। এই অনিশ্চয়তা, এই নীতিগত দীর্ঘসূত্রতাই হল পশ্চিমবঙ্গে লগ্নির পথে বড় বাধা। যেখানে অন্য রাজ্যে প্রকল্পের কাজ যুদ্ধকালীন তৎপরতায় শেষ হয়, সেখানে বাংলায় প্রকল্প মানেই ‘দেখছি, দেখব’-র দীর্ঘমেয়াদি খেলা।

সিঙ্গুর থেকে সানন্দ : এক বিষাদগাথা

পশ্চিমবঙ্গের শিল্পায়নের কফিনে শেষ পেরেকটি সম্ভবত পোঁতা হয়েছিল সিঙ্গুরে। টাটা ন্যানো বিদায়ের সেই অভিশপ্ত অধ্যায় আজও রাজ্যের পিছু ছাড়েনি। জমি আন্দোলনের জেরে টাটারা যখন গুজরাটের সানন্দে পাড়ি দিল, তখন শুধু একটি কারখানা গেল না, গেল রাজ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা। আজ সানন্দের দিকে তাকালে বুকটা হাহাকার করে ওঠে বাংলার তরুণসমাজের। গুজরাটের সেই অখ্যাত জায়গাটি আজ ভারতের অন্যতম বড় অটোমোবাইল হাব। টাটার পিছু পিছু ফোর্ড, মারুতি সুজুকি-কে নেই সেখানে? টাটাদের ন্যানো প্রকল্প ব্যর্থ হলেও, ওই সূত্র ধরেই আজ সানন্দে হাজার হাজার কোটি টাকার লগ্নি, সহায়ক শিল্প এবং লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান। সানন্দ যখন বিশ্বমঞ্চে জৌলুস ছড়াচ্ছে, সিঙ্গুরের জমি তখন আগাছায় ভরা, না হচ্ছে সেখানে চাষ, না হল শিল্প। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে জমি ফেরত পাওয়া হয়তো আইনি জয় ছিল, কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে তা ছিল এক চরম পরাজয়। সেই ‘নেতিবাচক ধারণা’ আজও লগ্নিকারীদের মনে গেঁথে আছে- ‘বাংলায় শিল্প করা নিরাপদ নয়।’

উত্তরবঙ্গ : অবহেলার আরেক নাম

শুধু কলকাতা বা দক্ষিণবঙ্গ নয়, বঞ্চনার ছবিটা আরও প্রকট উত্তরবঙ্গে। শিলিগুড়িতে ঘটা করে বিজনেস সামিট করা হয়েছে। প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে উত্তরবঙ্গকে বাণিজ্যিক করিডর হিসেবে গড়ে তোলার। কিন্তু চা, আর পর্যটনের বাইরে সেখানে ভারী শিল্পের দেখা মেলেনি। বাগডোগরা বিমানবন্দর সম্প্রসারণের কথা দীর্ঘদিন ধরে শোনা গেলেও, কাজের গতি মন্থর। শিলিগুড়ি বা জলপাইগুড়ির তরুণসমাজকে আজও কাজের খোঁজে পাড়ি দিতে হয় ভিনরাজ্যে বা দক্ষিণ ভারতে। সম্মেলনের জৌলুস তাদের পেটের ভাত জোগাতে পারেনি।

মেধার পরিযায়ী স্রোত

রাজ্যে শিল্পের এই খরার সবচেয়ে বড় মাশুল দিচ্ছে বর্তমান প্রজন্ম। কর্মসংস্থানের অভাবে আজ বাঙালি তরুণ–তরুণীরা ‘পরিযায়ী শ্রমিক’ হতে বাধ্য হচ্ছেন। শুধু অদক্ষ শ্রমিক নয়, রাজ্যের সেরা মেধা-ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, ম্যানেজমেন্ট গ্র্যাজুয়েটরা দলে দলে রাজ্য ছাড়ছেন। বেঙ্গালুরু, পুনে, হায়দরাবাদ বা গুরুগ্রামের আইটি পার্কগুলোতে কান পাতলে শোনা যায় বাংলার হাহাকার।

কেন নিজের রাজ্যে কাজ নেই? কেন উচ্চশিক্ষিত ছেলেমেয়েদের বৃদ্ধ বাবা-মাকে একা রেখে ভিনদেশে পড়ে থাকতে হয়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যাবে, রাজ্যে আইটি সেক্টরে কিছু কাজ হলেও, কোর ইঞ্জিনিয়ারিং বা ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টরে সুযোগ নগণ্য। সরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়াও আইনি জটিলতা আর দুর্নীতির অভিযোগে জর্জরিত। ফলে ‘বাংলা থেকে পালাও’- এটাই যেন অলিখিত স্লোগান হয়ে দাঁড়িয়েছে।

৩৪ বছরের দায় ও বর্তমানের ব্যর্থতা

অবশ্য এই পরিস্থিতির জন্য কেবল বর্তমান সরকারকে দায়ী করলে বিশ্লেষণ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসনামল রাজ্যের শিল্প মানচিত্রকে কার্যত ধ্বংস করে দিয়েছিল। ‘চলবে না, হবে না’ সংস্কৃতি, জঙ্গি ট্রেড ইউনিয়নবাদ, ঘনঘন ধর্মঘট আর লাল ঝান্ডার দাপট- এই সবকিছুই পশ্চিমবঙ্গকে লগ্নিকারীদের কাছে ‘নিষিদ্ধ এলাকা’-য় পরিণত করেছিল। সেই জঞ্জাল সাফ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েই বর্তমান সরকার বিপুল জনাদেশ নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল।

কিন্তু গত প্রায় দেড় দশক ক্ষমতায় থেকেও কি সেই ছবিটা বদলানো গিয়েছে? দৃশ্যত, ধর্মঘটের সংখ্যা কমেছে ঠিকই, কিন্তু তার জায়গা নিয়েছে ‘সিন্ডিকেটরাজ’ আর স্থানীয় স্তরে তোলাবাজির অভিযোগ। লগ্নিকারীরা এখন ইউনিয়ন লিডারদের ভয় পান না, ভয় পান স্থানীয় দাদাদের। বিপুল জনাদেশ থাকা সত্ত্বেও, একটি স্থিতিশীল সরকার থাকা সত্ত্বেও, রাজ্য সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দ্বিতীয় সানন্দ বা দ্বিতীয় গুরুগ্রাম তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে।

আজ পশ্চিমবঙ্গ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। কলকাতার দুর্গাপুজোকে ইউনেসকোর স্বীকৃতি বা রাজ্যে পর্যটনের প্রসার অবশ্যই গর্বের, কিন্তু তা শিল্পের বিকল্প হতে পারে না। একটি রাজ্য কেবল উৎসব আর অনুদানের ওপর ভর করে চলতে পারে না। প্রয়োজন কংক্রিটের লগ্নি, প্রয়োজন ধোঁয়া ওঠা চিমনি, প্রয়োজন কর্মসংস্থান।

শিল্পপতিদের প্রশংসাবাক্য আর সামিটের জৌলুস দিয়ে পেটের খিদে মেটে না। আদানি-আম্বানিদের ‘দিদি’ ডাকের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বিনিয়োগের শূন্যতা আজ বড্ড  প্রকট। সময় এসেছে প্রতিশ্রুতির ফানুস না উড়িয়ে বাস্তবের মাটিতে পা রাখার। নতুবা, ট্রেনের জেনারেল বগিতে ঠাসাঠাসি করে ভিনরাজ্যে পাড়ি দেওয়া ওই তরুণের দীর্ঘশ্বাসই হয়ে উঠবে আগামীর বাংলার একমাত্র সত্যি।

(লেখক পেশায় অর্থনীতিবিদ)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *