যে জন থাকেন আড়ালে

ব্লগ/BLOG
Spread the love


  • শুভ্রদীপ চৌধুরী

এই গল্পটা লিচুর।

ঠাকুরের গয়না বানাতে বানাতে ক্লাস এইটের লিচু আমায় বলেছিল অনেক কথা৷ সেসব কথা সংক্ষেপে বলি, লিচুর বাবা নেই। তিন বছর আগের একদিন শরীর খারাপ নিয়ে সেই যে হাসপাতালে গেলেন, আর ফিরলেন না। তিনি শোলা কেটে প্রতিমার সাজ, বর-কনের টোপর আর মুকুট তৈরি করতেন। সেবার পুজোয় সাজের বায়না নেওয়া ছিল অনেক। সেসব কাজ বিভিন্ন জনকে দিয়ে দিতে হয়েছিল। লিচুদের পাঁচপুরুষের সাজ বানানোর কাজ গেল থমকে।
লিচুর গল্প থামিয়ে শোলার সাজের শুরুর কথা বলি, বহু বছর আগে রুপোর তবক দিয়ে তৈরি হত ডাকের সাজ। সেই রুপোর পাত ডাকযোগে জার্মানি থেকে আসত বলেই নাম, ‘ডাকের সাজ’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে সেই রুপোর তবক আসা বন্ধ হয়ে গেল। শুরু হল শোলা দিয়ে সাজ। থেকে গেল, সেই পুরোনো নাম ‘ডাকের সাজ’।
শোলা দিয়ে সাজ তৈরি হবার প্রধান কারণ, শোলার রং সাদা। এই রং শুদ্ধ এবং পবিত্র। এক সময় বাংলার সব রকম আচার অনুষ্ঠানে শোলার ব্যবহার হত।
এই শোলার কাজের ব্যবহার নিয়ে রয়েছে নানান প্রাচীন লোককথা আর পৌরাণিক উপাখ্যান। শিবের উপাখ্যানটি এইরকম, দেবাদিদেব শিব পার্বতীকে বিবাহ করতে চলেছেন। বিয়ের দিন শিবের শ্বেতশুভ্র মুকুট পরার ইচ্ছে হল। শিব তাঁর ইচ্ছের কথা জানালেন দেবশিল্পী বিশ্বকর্মাকে। সব শুনে বিশ্বকর্মা ভাবতে লাগলেন, শ্বেত মুকুট তিনি কীভাবে তৈরি করবেন। ঠিক সেই সময় স্বয়ং মহাদেবের ইচ্ছেয় নরম ও শুভ্র এক উদ্ভিদের জন্ম হল মর্ত্যের জলাশয়ে। এই গাছের নাম শোলা।
শোলা গাছ সৃষ্টি হবার পরেও সমস্যা রয়েই গেল। বিশ্বকর্মা শক্ত ও ভারী বস্তু দিয়ে ভাস্কর্য বানাতে পারদর্শী। মহাদেব আবার তাঁর অলৌকিক শক্তির প্রয়োগ করলেন। সেই জলাশয় থেকে এক সুন্দর দেখতে যুবক উঠে এল। সেই যুবক মহাদেবের আদেশে জলাশয় থেকে নরম শোলা তুলে এনে বানালেন একটি শ্বেতশুভ্র মুকুট। অপূর্ব সুন্দর সেই মুকুট পরে শিব চললেন বিয়ে করতে।
শোলা পবিত্র সেতু, একথা বহুকাল থেকে এই গ্রামবাংলার মানুষের মনে গাঁথা হয়ে আছে। ভগবান আর ভক্তের মাঝখানে শোলা সেতু হয়ে বিরাজ করে।
বর্তমানে ঠাকুরের সাজ বানানোর কাঁচামাল ‘শোলা’ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ধানজমি কিংবা জলাশয়ে জন্মানো মস্ত কাণ্ডের এই গাছটি দুই প্রকারের হয়। কাঠশোলা আর ভাটশোলা। কাঠশোলা শক্ত আর ভাটশোলা নরম ও হালকা। এই ভাটশোলা পাওয়া গেলেও তার দাম বেড়েছে অনেকটা। চাহিদা আছে অথচ শোলা নেই। কারণ,
এক, গ্রামগঞ্জে জলাশয় কমেছে।
দুই, শোলার বেড়ে ওঠার সময় ঠিকঠাক বৃষ্টি হয় না।
দিনকে দিন থার্মোকলের দাপটে শোলার কাজ আজ কোণঠাসা। তবু পুজোর দিনগুলোতে গ্রামের মানুষ শোলার সামগ্রীর দিকেই হাত বাড়ায়।
এবার লিচুর কথা গল্পে বলা যাক,
লিচুর কথা শুনে চমকে গেল বিলু। দুই ভাই ফিরছিল স্কুল থেকে।
বিলু দাঁড়িয়ে পড়ল। চোখ বড় বড় করে দাদার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘দাদা, তুই একা একাই ঠাকুরের সব গয়না বানাবি? সত্যিই পারবি?’
লিচু ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মায়ের জ্বর না কমলে এছাড়া আর উপায় কী আছে! আর আমি একা কেন! তুই তো আছিস। তুই আমায় সাহায্য করবি। পারবি না?’
ক্লাস সিক্সের বিলু দাদার কথা শুনে মহানন্দে বলে উঠল, ‘খুব পারব। সেই তো ধারালো ছুরি দিয়ে, শোলাকে পাতলা টুকরো করে কেটে নিতে হবে। সেটা আমি পারব না। তুই করে দিবি। তারপর সেই টুকরোগুলো কখনও বেঁধে, আবার কখনও তেঁতুল বীজের আঠা দিয়ে জুড়ে তৈরি করতে হবে নতুন সাজ। তাছাড়া টোপর, মালা, ঠাকুরের সাজ, ঘটের মুকুট, কদমফুল আরও কত কী কাজ আছে! একবার দেখিয়ে দিলে আমি ঠিক শিখে নেব।’
লিচু চোখ বড় বড় করে বলল, ‘সাবাশ। চালির কাজের ওই একঘেয়ে গয়না বানাতে আর ভালো লাগে না। তবে মা কী রাজি হবে! আমার শোলার সাজ গড়তে বড্ড ইচ্ছে হয়।’
বছর দেড়েক হল তাদের মা আবার ঠাকুরের গয়নার কাজ শুরু করেছে। তবে সে সব নিজস্ব কাজ নয়। অন্য মহাজনেরা রঙিন কাগজ, থার্মোকল, চুমকি, অভ্র, সোনালি, রুপোলি সুতো, আঠা পৌঁছে দেয়।
আর দেয় ডিজাইনের স্টেনসিল। মাউন্ট বোর্ড কিংবা শক্ত কার্টিজ পেপারে সেই নকশা তুলে তাতে থার্মোকল সেট করে জরি, চুমকি, অভ্র দিয়ে সাজিয়ে দিতে হয়। পড়াশোনার ফাঁকে দুই ভাই ঠাকুরের চালির সাজ গড়ে। তাতে একঘেয়ে ডিজাইন। এই কাজ দুজনের মোটেই ভালো লাগে না। অথচ সাজে কত রকমের ডিজাইন হয়। সেসব ডিজাইন আবার বছরে বছরে পালটায়। জরি, চুমকি, সুতা, মাউন্ট বোর্ডে বসিয়ে চিক, মালা, কানপাশা তৈরি হয়। এক সময় খুব চলত আট বাংলা সাজ। সেই সাজ ডাকের সাজের মতো দেখতে। তৈরি হয় সিঁথির সাজ। এই মুকুট সিঁথি বরাবর স্থাপন করা হয়। যা মাতৃমূর্তির মুখমণ্ডলের প্রধান আকর্ষণ হয়ে ওঠে।
এই সময়ের ঝাঁ চকচকে বিরাট আকারের সাজের চেয়ে শোলার সাজ বেশি টানে লিচুকে। তার ইচ্ছে সে নিজেই একদিন ডাকের সাজের অর্ডার নেবে। আবার তাদের বাড়িতে ভরে উঠবে শোলার কাজ। পুজোর আগে নাওয়া খাওয়ার সময় থাকবে না। আজকাল লিচুর মাথায় ঘোরে নতুন নতুন ডিজাইন। সে প্রতিমা দেখবার সময় মুগ্ধ চোখে সাজ দেখে। কিছু কিছু ডিজাইন মাথায় গেঁথে রাখে।
শোলার কাজ শিখতে মাঝেমধ্যেই ছুটে যায় পবন মালাকারের বাড়ি। মানুষটা জরি, চুমকি, অভ্রর ঝলকানির বাইরে থাকবেন বলে শুধুমাত্র কালীর মুখা আর কদমফুল বানান। তিনি প্রথম দিন বলেছিলেন, ‘এই কাজ মস্ত দায়িত্বের। একবার পুজোর কাজ নিয়ে দূরের এক রাজ্যে গেছিলাম। সাজ সেট করার কাজ। সেখানেই খবর পেলাম, দু’মাস পর যার সঙ্গে আমার বিয়ে তার মৃত্যু সংবাদ। কাজ শেষ না করে ফেরা হল না। ফিরলাম চারদিন পর। শেষ দেখাটাও হল না।’
লিচুকে দেখলে তিনি খুশি হন। কত কি জানা যায় তাঁর কাছে। গতকাল তিনি বলেছেন, মধুমঙ্গল মালাকারের কথা। যিনি শোলার কাজ দিয়েই বিশ্ব জয় করেছিলেন। বাড়ি তাঁর দক্ষিণ দিনাজপুর। শোলার কাজ নিয়ে তিনি গেছেন উত্তরবঙ্গ থেকে অনেক দেশে। লন্ডন মিউজিয়াম, ফিলাডেলফিয়া মিউজিয়াম, সানফ্রান্সিসকো, স্কটল্যান্ড থেকে বার্সিলোনা সবখানে তাঁর কাজ রাখা আছে। বাংলার শিল্পকলাকে তিনি দক্ষিণ দিনাজপুরের ছোট্ট গ্রাম মুস্কিপুর থেকে পৌঁছে দিয়েছেন বিশ্বের দরবারে।
বাবার কাছে কাজ শিখেছেন তিনি। তাঁর বাবা যখন কাজ করতেন, তিনি দেখতেন মনোযোগ দিয়ে। দেখতেন বাবার হাতে এক টুকরো শোলা কেমন করে ফুল হয়ে যাচ্ছে।
এসব কথা বারবার শুনতে ইচ্ছে করে লিচুর। নিজেকেই সে ফিসফিস করে বলে, ‘একদিন আমিও শুধুই শোলার কাজ করব।’
মাঝে মাঝে স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে যায় লিচুর, তারা দুই ভাই মিলে সত্যি সত্যি মস্ত একটা সাজ গড়েছে। ‘ডাকের সাজ’। সেই সাজ পরানোর পর কেউ চোখ ফেরাতে পারছে না প্রতিমা থেকে। এই স্বপ্নের একটা অংশে বড়ই অদ্ভুত। সেটা এইরকম, লিচুর চোখে পড়ে অজস্র মানুষের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে তার বাবা। তিন বছর আগে যিনি চলে গেছেন ওই আকাশে। সেই মানুষ মুগ্ধ হয়ে দেখছেন তাঁর ছেলেদের বানানো ডাকের সাজ! বাবার চোখেমুখে আনন্দে ঝলমল করছে। লিচু একছুটে বাবাকে জড়িয়ে ধরবে ভেবেছিল। অথচ সে পারে না। তার পা যেন গেঁথে গিয়েছে মাটিতে। ঠিক এই সময় ঘুম ভেঙে যায়।
তারপর আর ঘুম আসতে চায় না।
শুধু স্বপ্নটা চোখের সামনে থেকে যায় না। লিচু ঘুমন্ত ভাইয়ের কানের কাছে বিড়বিড় করে, ‘বুঝলি ভাই, সত্যি সত্যি আমরা একদিন শোলার সাজ বানিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেবো।’
প্রিয় পাঠক, আর মাত্র কয়েকটা দিন পরে মা মণ্ডপে আসবেন। মায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়াব আমরা সবাই। আপনাকে বলছি, কয়েক সেকেন্ড থেমে জগৎজননী সহ পুরো কাঠামোর সাজের দিকে একটু তাকাবেন। এই সাজ আড়ালে থাকা অজস্র মানুষের স্বপ্ন।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *