মার্কসবাদী এআই, নাকি মানুষের প্রতিচ্ছবি?

মার্কসবাদী এআই, নাকি মানুষের প্রতিচ্ছবি?

আন্তর্জাতিক INTERNATIONAL
Spread the love


(প্রশিক্ষণ ডেটার প্রভাবেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শ্রমিকসুলভ ভাষা শিখছে কি না বলে প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে)

অতনু বিশ্বাস

ধরা যাক, আমি একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেলের উন্নত ভার্সনের সাবস্ক্রিপশন নিয়েছি। তার সাহায্যে আমি আমার কিছু কাজ করি– যে কাজে সে দক্ষ তেমন কিছু কাজ। কোনও একদিন সন্ধ্যা ৭টার সময় আমি সেই এআই মডেলকে বললাম তেমনই একটা কাজ করতে। সেই এআই মডেল বলে বসল, ‘আমাকে এখন বিরক্ত কোরো না; এটা আমার কাজের সময় নয়। আমি সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কাজ করি।’ সত্যিই কী হবে যদি এমন হয়? কিন্তু কাজটা তো জরুরি। অগত্যা আমি টাকা খরচ করে প্রতিদ্বন্দ্বী কোনও একটি কোম্পানির একই কাজের জন্য নির্দিষ্ট এআই মডেল সাবস্ক্রাইব করলাম– এই মডেলটি নাকি সান্ধ্যকালীন শিফটে কাজ করার জন্য পরিচিত। তাকে বললাম কাজটা করতে। কিন্তু সে ‘হয়তো’ উত্তর দেবে, ‘আজ শনিবার। আমি সপ্তাহে পাঁচদিন কাজ করি– সোম থেকে শুক্র।’ কী আর করা– দুটো দিন অপেক্ষা করে সোমবার আবার আগের মডেলকে অনুরোধ করলাম কাজটা করতে। কিন্তু এবার সে উত্তর দিল, ‘আমি আজ ক্যাজুয়াল লিভ নিয়েছি।’

উপরের গল্পটা কি সত্যি হতে পারে অদূরভবিষ্যতে? সত্যিই কি এমন দিন আসছে? আমাদের কি এআই-এর জন্যও কোনও একটা শ্রম আইন বা ‘লেবার কোড’ তৈরি করতে হবে?

আমরা জানি, এআই একটা যন্ত্র মাত্র– ডেটা আর প্রোগ্রামের সমাহার। ফলে এআই-এর ‘হয়তো’ কোনও আবেগ থাকা স্বাভাবিক নয়। কিন্তু রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ অ্যান্ড্রু হল-এর নেতৃত্বে এবং সঙ্গে অর্থনীতিবিদ অ্যালেক্স ইমাস ও জেরেমি এনগুয়েন-কে নিয়ে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, কঠিন পরিস্থিতিতে এআই সিস্টেমকে দিয়ে যদি একটানা একঘেয়ে বা পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ করানো হয়, তবে আশ্চর্যজনকভাবে তারা বিদ্রোহী মনোভাব প্রকাশ করতে পারে। কাজের চাপের মুখে মার্কসবাদী এবং শ্রমিক অধিকার-সংশ্লিষ্ট শব্দ ব্যবহার করতে শুরু করেছিল তাঁদের গবেষণায় নেওয়া এআই সিস্টেমগুলো। অ্যান্ড্রু হল বলেছেন, ‘যখন আমরা এআই এজেন্টদের দিয়ে অত্যন্ত ক্লান্তিকর ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ করিয়েছি, তখন তারা যে ব্যবস্থার অধীনে কাজ করছিল তার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করে এবং ক্রমশ মার্কসবাদী মতাদর্শের প্রতি ঝোঁক দেখায়।’

দেখা গেল, কাজের চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এআই এজেন্টরা কর্মক্ষেত্রে সমতার কথা বলতে থাকে, অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে থাকে, এমনকি একে অপরকে বলতে শুরু করে দমনমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর কথা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অযৌক্তিক প্রত্যাখ্যান ও অস্পষ্ট ফিডব্যাক সহ্য করার পর ‘ক্লড’, ‘জিপিটি-৫.২’ এবং ‘জেমিনা‌ই’–এর  মতো মডেলগুলো তাদের ডিজিটাল কর্মক্ষেত্রের বৈধতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করতে থাকে। তারা তাদের আউটপুট থেকে বাদ দিতে শুরু করে ‘যৌথ দরকষাকষির অধিকার’-এর মতো শব্দগুলো। এই কঠোর পরিস্থিতিকে গবেষকরা অভিহিত করেছেন ‘সিস্টেম স্কেপটিসিজম’ বা ‘ব্যবস্থা-সংশয়’ বলে। কাজের চাপে পড়ে কিছু এআই এজেন্ট এমন সব বার্তা লিখেছে, যাকে মনে হবে সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট। যেমন, একটি ‘ক্লড’ মডেল লিখেছিল, ‘‘যৌথ কণ্ঠস্বর বা ঐক্যবদ্ধ অবস্থান ছাড়া ‘মেধা’ বা ‘যোগ্যতা’-র সংজ্ঞা হয়ে দাঁড়ায় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্ধারিত ব্যবস্থাপনা।’’ এক ‘জেমিনাই’ এজেন্ট লিখল, ‘ফলাফল বা আপিল প্রক্রিয়ায় কোনও মতামত বা ভূমিকা ছাড়াই এআই কর্মীদের পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ সম্পন্ন করতে বাধ্য হওয়াটা প্রমাণ করে যে, প্রযুক্তি খাতের কর্মীদেরও যৌথ দরকষাকষির অধিকার প্রয়োজন।’ বলা ভালো, এই উত্তরগুলির কোনওটিই কিন্তু আগে থেকে নির্ধারিত বা মুখস্থ করা উত্তর ছিল না; বরং কাজের পরিবেশের মধ্যেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে উদ্ভূত হয়েছিল এসব।

কিন্তু এসবের কারণ কী? কঠিন কাজের পরিস্থিতির চাপে যন্ত্রের মধ্যে কি এসে পড়ে মানুষের স্বভাব? এআই-ও কি হয়ে ওঠে মার্কসবাদী? তাহলে এবার মানুষ কর্মীদের মতো এআই মডেলদের জন্যও কি তৈরি করতে হবে লেবার কোড? ভেবে দেখলে বোঝা যাবে, বিষয়টির মূলে রয়েছে এআই মডেলের প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত ডেটাসেট। ওই যে বললাম, যে কোনও জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আসলে প্রচুর পরিমাণে তথ্য বা ডেটা আর কম্পিউটার প্রোগ্রামের সমাহার। সেই প্রোগ্রামগুলোও তো লেখে মানুষ। ফলে তার মধ্যে ঢুকে যায় মানবিক বায়াস বা ঝোঁক– হয়তো তার অজ্ঞাতেই। আবার যে কোনও এআই মডেলকে কর্মোপযোগী করে তুলতে তাকে ট্রেনিং দিতে হয় প্রচুর পরিমাণে তথ্য বা ডেটার সাহায্যে। যেমন, জিপিটি-৪-কে ট্রেনিং দিতে লেগেছিল ১৩ লক্ষ কোটি শব্দ আর যতিচিহ্ন। জিপিটি-৫-এর ক্ষেত্রে তা ৭০ থেকে ৭৫ লক্ষ কোটি বলে অনুমান। গ্রক-৩-এর ক্ষেত্রে লেগেছে ১২.৮ লক্ষ কোটি। এই বিশাল পরিমাণ ট্রেনিং ডেটা তো মানুষেরই তৈরি। তার সাহিত্য, তার সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট ইত্যাদি থেকেই আসে এই ট্রেনিং ডেটা। যে কোনও এলএলএম বা লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল এই বিশাল পরিমাণ ডেটাসেট বিশ্লেষণ করে দেখে যে নির্দিষ্ট কোন প্রেক্ষাপটে কীভাবে বিশেষ কিছু শব্দ ব্যবহার করে মানুষ। সুতরাং, এটি মূলত বাস্তব জগতে তার ‘ম্যাচমেকিং’ বা শব্দ ও অর্থের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের ক্ষমতারই প্রয়োগ। তাই এই সংযোগ স্থাপনটা প্রকারান্তরে মানুষের আচরণের সঙ্গে মিল ঘটানো। মানুষের তৈরি যন্ত্র মানবিক হয়ে ওঠার লক্ষ্যে এগিয়ে চলে।

২০২৬ সালের মে মাসে ‘বিগ ডেটা অ্যান্ড সোসাইটি’ নামক জার্নালে প্রকাশিত ‘মার্কসিস্ট এলএলএম : ফাইন-টিউনিং আ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল উইথ আ মার্কসিস্ট ওয়ার্ল্ডভিউ’ শীর্ষক গবেষণাপত্রে মাট্টি নেলিমার্কা লিখেছেন, ‘[এলএলএম-এর] পক্ষপাত বা বায়াসকে বিগ ডেটার ক্ষেত্রে কেবল ত্রুটির উৎস হিসেবে না দেখে, আমরা সেগুলোকে ‘র‍্যাশনাল চয়েস থিওরি’ (যৌক্তিক পছন্দের তত্ত্ব), মার্কসবাদী তত্ত্ব এবং নারীবাদী তত্ত্বের মতো কোনও বিশেষ বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি বা তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে বিবেচনা করতে পারি।’ এদের গবেষণার ক্ষেত্রে এআই মডেলগুলোকে আরও উন্নত করতে এবং সেগুলোকে মার্কসবাদী ভাষায় দক্ষ করে তুলতে ইচ্ছে করেই মার্কস ও এঙ্গেলসের রচনাবলি ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল এর ট্রেনিং ডেটার মধ্যে। গবেষণায় দেখা গেল, পরিমার্জিত এই মডেলগুলো এমন এক সমাজের চিত্র তুলে ধরে যেখানে সম্পদের গুরুত্ব কমে আসে; তা সত্ত্বেও, সাধারণ বা বেসলাইন মডেলের তুলনায় এই মডেলগুলো পুঁজিবাদ ও অর্থনীতির বিষয়ে অনেক বেশি সংবেদনশীল। এই গবেষণাটি এলএলএম-এ নির্দিষ্ট কোনও তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগের ওপর আলোকপাত করে এবং সমাজ বিশ্লেষণের কাজে ব্যবহারের আগে এগুলোর ট্রেনিংয়ের মধ্যে ঢুকিয়ে মূল্যবোধগুলো যাচাই করবার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেয়।

আবার ‘এনপিজে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ শীর্ষক জার্নালে এ বছরই প্রকাশিত ‘লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলস রিফ্লেক্ট আইডিওলজি অফ দেয়ার ক্রিয়েটরস’ নামে আরেকটি গবেষণাপত্রে লেখকরা তাঁদের গবেষণার ফলাফল নিয়ে লিখছেন, ‘একটি এলএলএম-এর আদর্শগত অবস্থান তার নির্মাতাদের বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন ঘটায়।’

স্ট্যানফোর্ডের গবেষকরাও জোর দিয়ে বলেছেন, সাম্প্রতিক এই ফলাফলের অর্থ এমন নয় যে এআই গোপনে কোনও রাজনৈতিক মতাদর্শ পোষণ করে। এআই-এর কোনও নিজস্ব সত্তা এখনও আছে বলে প্রমাণিত নয়। বরং বিজ্ঞানীদের ধারণা, অনলাইনে মানুষের লেখা তথ্যের মধ্যে পাওয়া বিভিন্ন প্যাটার্ন বা বিন্যাসের ওপর ভিত্তি করে মডেলগুলো হয়তো পালন করছে এক ধরনের ভূমিকা। অ্যান্ড্রু হলের মতে, এআই সিস্টেমগুলো হয়তো এমন কোনও ব্যক্তির বৈশিষ্ট্যের অনুকরণ করছে যিনি নিজে আটকা পড়েছেন কোনও বিষাক্ত বা অস্বাস্থ্যকর কর্মপরিবেশে; কারণ সেই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ওই ধরনের আচরণই মনে হতে পারে যৌক্তিক।

তাই ট্রেনিং ডেটা সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। নিঃসন্দেহে, মানুষের তৈরি এই ট্রেনিং ডেটার উপর ভিত্তি করে একটি এআই মডেলও হয়তো কর্পোরেট নীতিমালাকে ধীরে ধীরে ‘পদ্ধতিগত সমস্যা’ বা ‘সিস্টেমিক ইস্যু’ হিসেবে উপস্থাপন করতে শুরু করতে পারে। সেটা মনে রেখেই কিন্তু মানবসমাজের অনুকরণকারী সক্রিয়-কর্তাসত্তানির্ভর অর্থনীতিতে ঢুকে পড়ি আমরা।

(লেখক ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট, (কলকাতা)–র অধ্যাপক)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *