(রাজবংশী লোকায়ত সংস্কৃতির আমাতি ও গচিবুনা উৎসবের মধ্য দিয়ে প্রকৃতির আরাধনা উত্তরবঙ্গের অন্যতম ঐতিহ্য।)
শ্রাবস্তী রায়
বর্ষার প্রথম পশলা বৃষ্টি নামতেই তিস্তা–তোর্ষা–জলঢাকা বিধৌত উত্তরবঙ্গের মাটি এক অলৌকিক সুবাসে ভরে ওঠে। আষাঢ়ের এই বিশেষ সময়টিই হল অম্বুবাচি যা স্থানীয় রাজবংশী লোকায়ত সংস্কৃতিতে ‘আমাতি’ নামে পরিচিত। একদিকে কামাখ্যা মহাতীর্থের জনজোয়ার অন্যদিকে উত্তরবঙ্গের নিভৃত গ্রামে মাটির গভীর থেকে জেগে ওঠে এক আদিম শাশ্বত উৎসবের স্পন্দন। রাজবংশী সমাজে আমাতি কেবল ধর্মীয় আচার নয়, এটি মূলত ধরিত্রী মাতার ঋতুস্রাব ও উর্বরতার আবাহন। এই তিনদিন জমিতে লাঙল ধরা নিষেধ এবং মাটিতে কোদাল মারা পাপ। এমনকি ঘরের শিলনোড়াকেও এই সময় সম্পূর্ণ বিশ্রাম দেওয়া হয়।
আমাতির দিনগুলিতে রাজবংশী সংস্কৃতির খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। এই সময় কালো কচু সহ সব ধরনের কচু এবং শাকপাতা খাওয়া নিষেধ। তবে গাভী দুইয়ে টাটকা কাঁচা দুধ খাওয়া অপরিহার্য। আমাতির দিনগুলিতে রাজবংশী বাড়ির ছোট ছোট বাচ্চারা রাস্তার ধারে কাগজ এবং গাছের ডাল ও পাতা দিয়ে অস্থায়ী মন্দির বানায়। পথচলতি মানুষদের আটকে তারা মাগন সংগ্রহ করে। কেউ ফলমূল যেমন লটকা, আম, কলা দেয় কেউ বা দেয় খুচরো পয়সা। বাচ্চারা তা সানন্দে গ্রহণ করে এবং সেই সংগৃহীত সামগ্রী দিয়ে আমাতি শেষ হলে অস্থায়ী মন্দিরে পুজো দেওয়া হয়।
গবেষক চারুচন্দ্র সান্যালের পর্যবেক্ষণকে স্মরণ করলে বোঝা যায় যে, এই লোকজ নিষেধাজ্ঞা আসলে প্রকৃতির প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা এবং মাটিকে ক্ষণিকের বিশ্রাম দেওয়ার এক পরিবেশবান্ধব প্রয়াস। রাজবংশী লোকবিশ্বাসে আমাতি থেকে গচিবুনা হল ধরিত্রী মায়ের রজঃস্বলা হওয়া থেকে সন্তান ধারণের এক পর্যায়ক্রমিক রূপক। আধুনিক পরিবেশচেতনার নিরিখে ঐতিহ্যের এই যোগসূত্র অত্যন্ত গভীর। কারণ এই তিনদিন বিশ্রাম পেলে ধরিত্রী আবার নতুন ফসলে উর্বর হয়ে উঠবে বলেই কৃষিভিত্তিক সমাজের বিশ্বাস। আষাঢ়ের শুরুতে আমাতি পর্ব শেষ হতেই তাই প্রকৃতি মাতাকে সম্মান জানিয়ে নিষ্ঠা ও শ্রদ্ধায় গচিবুনা পুজোর মধ্য দিয়ে ধান রোপণের তোড়জোড় শুরু হয়।
পঞ্জিকায় একটি শুভ দিন দেখে চাষ করা জমির উত্তর কোণে ছোট কলার গাছ, কেয়ার গাছ, পাটের গাছ এবং কালো কচুর গাছ লাগিয়ে দুধ, কলা, ফল ও ফুল দিয়ে পুজো দেওয়া হয়। সিঁদুরের ফোঁটা দেওয়া হয় মাটিতে ও গাছগুলোতে এবং সোনা, রুপা ও খুচরো পয়সা ধোয়া জলও নিবেদন করা হয়। বাড়ির পুরুষেরা মূলত এই গচিবুনা পুজো করে থাকেন। রাতে নিয়ম মেনে রান্না করে খেতে হয় ঠাকুরি কলাইয়ের ডাল ও কচু শাক ভাজা। সন্তানকে গর্ভে ধারণের মুহূর্তে ধরিত্রী মায়ের যেন কোনও কিছুর অভাব না থাকে সেই উদ্দেশ্যে তাকে তুষ্ট করতে এই পুজোর আয়োজন করা হয়।
পুজো শেষ হলে সেই নির্দিষ্ট স্থানেই তিন গুচ্ছ বা পাঁচ গুচ্ছ ধানের চারা রোপণ করে মূল জমিতে ধান লাগানো শুরু হয়। উত্তরবঙ্গের এই লোক উৎসব প্রমাণ করে যে সনাতন ধর্মের মূল স্রোতের সমান্তরালে এখানে এক স্বাধীন প্রাকৃত জীবনদর্শন বহমান যা আধুনিক পরিবেশচেতনার আদিম ভিত্তিভূমি। বিশ্বায়নের করাল গ্রাসে যখন গ্রামীণ লোকসংস্কৃতি ধুঁকছে তখন রাজবংশী সমাজের আমাতি ও গচিবুনা আজও মাটির গন্ধকে বাঁচিয়ে রেখেছে। উত্তরবঙ্গের নিজস্ব জলহাওয়ায় গড়ে ওঠা এই অনন্য ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা মানে নিজের শিকড়কে চিনে নেওয়ার দায় স্বীকার করা।
(লেখক সংস্কৃতিকর্মী। ধূপগুড়ির বাসিন্দা।)

