জয় মণ্ডল, হিউস্টন: হিউস্টনের এনআরজি স্টেডিয়ামের মিক্সড জোন তখন সাংবাদিকদের ভিড়ে গিজগিজ করছে। উজবেকিস্তানের বিরুদ্ধে পর্তুগালের ৫-০ গোলের দাপুটে জয়ের পর সবার চোখ খুঁজছে কেবল একটি মানুষকে। (Soccer World Cup 2026) মাঠে জোড়া গোল করার পর টিভি ক্যামেরার লেন্সে চোখ রেখে বুক চিতিয়ে যিনি গর্জন করে উঠেছিলেন, ‘আই অ্যাম ব্যাক… আমি ফিরে এসেছি!’ সেই ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো (Cristiano Ronaldo) আমার থেকে তখন মাত্র কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে। তাঁর মেজাজ যে মিক্সড জোনে এসে এভাবে বারুদে পরিণত হবে, তা কে জানত! ৪১ বছর ১৩৮ দিন বয়সে জোড়া গোল করে সমালোচকদের মুখ হয়তো সাময়িকভাবে বন্ধ করেছেন, কিন্তু একটা নাম যেন কিছুতেই তাঁর পিছু ছাড়তে চাইছে না। সেই নামটা হল লিওনেল মেসি (Lionel Messi)।
মিক্সড জোনে আমার ঠিক পাশে থাকা এক সাংবাদিক যখন তাঁকে প্রশ্ন করতে গিয়ে গত সোমবার অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে মেসির জোড়া গোল এবং তাঁর স্বপ্নের ফর্মের প্রসঙ্গ টেনে আনলেন, রোনাল্ডোর মুখের রেখাগুলি নিমেষে কঠিন হয়ে গেল। দৃশ্যতই বিরক্ত সিআরসেভেন তৎক্ষণাৎ মুখ ঘুরিয়ে অন্য এক সাংবাদিককে ইশারায় প্রশ্ন করতে বলেন। কিন্তু সেই দ্বিতীয় সাংবাদিকও আবার তাঁর সেই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর প্রসঙ্গ তুলতেই ধৈর্যের বাঁধ পুরোপুরি ভেঙে যায় পর্তুগিজ মহাতারকার। তীব্র ক্ষোভে মিক্সড জোন ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে তিনি বলে যান, ‘অন্যদের নিয়ে আমার কিচ্ছু যায় আসে না…এমবাপেও তো গোল করেছে।’ এরপর অন্য এক সাংবাদিক যখন মরিয়া হয়ে জিজ্ঞেস করেন, ফাইনালে পর্তুগাল বনাম আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হলে কেমন হবে, তখন সেই প্রশ্নেরও কড়া জবাব দেন তিনি। তির্যক হেসে তিনি বলেছেন, ‘এই প্রশ্নের কোনও মানেই হয় না। এর কী উত্তর দেব জানি না। তবে হ্যাঁ, হলে ব্যাপারটা দারুণ হবে।’
আজ, বুধবার মেসির ৩৯তম জন্মদিন। তাঁর সঙ্গে রোনাল্ডোর যে খুব একটা ভাব-ভালোবাসা আছে, এমন কথা কেউ বলতে পারবে না। বিশ্বকাপ শুরুর আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা ছবি বেশ ঘোরাঘুরি করছিল- হাত ধরাধরি করে মেসি-রোনাল্ডো একসঙ্গে মাঠে নামছেন। ছবিটি যে এআই জেনারেটেড, তা বোঝার জন্য অবশ্য কোনও পুরস্কার নেই! সেই রোনাল্ডো যে মেসির জন্মদিনে নিদেনপক্ষে লোকদেখানো শুভেচ্ছাবার্তাও সামাজিক মাধ্যমে দেবেন, এমন ভাবার কোনও কারণ ছিল না। কিন্তু তাই বলে মেসির নামোচ্চারণে তিনি যে এভাবে তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠবেন, তাই বা কে জানত! বিশ্বকাপে ১৮টি গোল করে সর্বকালের সর্বাধিক গোলস্কোরার হয়ে গিয়েছেন। এবারের টুর্নামেন্টেও পাঁচটি গোল করে সোনার বুটের দৌড়ে সবার আগে সেই আর্জেন্টিনীয় জাদুকর। সিআরসেভেনের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রীতিমতো স্বপ্নের জগতে বিচরণ করছেন, যা ছুচ্ছেন, তাই সোনা। দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে চলা এই মহাকাব্যিক দ্বৈরথে মেসির এই অনায়াস উড়ান যে রোনাল্ডোর বিশাল ইগোতে কোথাও একটা সূক্ষ্ম আঘাত করছে, হিউস্টনের মিক্সড জোনের এই দৃশ্য যেন তারই জ্বলন্ত প্রমাণ।
অথচ এই মিক্সড জোনের কথোপকথনের শুরুটা কিন্তু একেবারেই অন্যরকম ছিল। ডিআর কঙ্গো ম্যাচের পর থিয়েরি অঁরির মতো কিংবদন্তিরা যখন তাঁকে ‘স্বার্থপর’ তকমা দিয়ে দলের বোঝা বলছিলেন, তখন তিনি নিজেকে এক আদর্শ ‘টিমম্যান’ হিসেবে তুলে ধরার আপ্রাণ চেষ্টাই করছিলেন। গত একটা সপ্তাহের দমবন্ধ করা পরিবেশের কথা বলতে গিয়ে রোনাল্ডো বলেছেন, ‘এক অন্ধকার, কঠিন সপ্তাহ পেরোলাম আমরা। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। আমি জানতাম আমার সতীর্থরা আমাকে সাহায্য করবে। ব্যক্তিগত রেকর্ড সবসময়ই ভালো লাগে, কিন্তু আমার আসল লক্ষ্য সব সময় দলকে সাহায্য করা।’ ক্যামেরায় সেই বিখ্যাত হুংকার নিয়ে তাঁর জবাব, ‘আমি ফিরে এসেছি, আর সেটা জানান দিতেই ওই হুংকারটা দিয়েছি, যাতে মানুষ ভুলে না যায়।’
রোনাল্ডোর এই ফিরে আসার গর্জনে অবশ্য বেশ অবাকই হয়েছেন জলাটান ইব্রাহিমোভিচ। ফক্স স্পোর্টসের স্টুডিওতে বসে এই সুইডিশ কিংবদন্তি স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে বলেছেন, ‘বুঝলাম না ও কেন বলল ফিরে এসেছে, ও কি অবসর নিয়ে নিয়েছিল নাকি!’ ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের প্রাক্তন সতীর্থ ওয়েইন রুনি এবং রয় কিনও এই বয়সে তাঁর এই রাজকীয় প্রত্যাবর্তনে মুগ্ধ। তবে সবচেয়ে মোক্ষম কথাটা হয়তো বলেছেন বিপক্ষ কোচ ফ্যাবিও ক্যানাভারো। তাঁর কথায়, ‘৪১ বছর বয়সে কেউ এভাবে খেললে বুঝতে হবে তাঁর খিদেটা এখনও কতটা ভয়ংকর। রোনাল্ডোকে যদি এক সেন্টিমিটার জায়গাও ছাড়েন, ও গোল করবে, আর আপনি ওখানেই শেষ।’
হিউস্টনের রাতটা হয়তো রোনাল্ডোর সেই অদম্য খিদেরই সাক্ষী হয়ে রইল। ৪১ বছর বয়সে রজার মিল্লার পর দ্বিতীয় প্রবীণতম হিসেবে গোল করার রেকর্ড হয়তো তাঁকে স্বস্তি দিয়েছে। কিন্তু চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর দীর্ঘ ছায়া থেকে তিনি যে আজও বেরোতে পারেননি, মিক্সড জোনের এই নাটকীয় প্রস্থান যেন সেই অমোঘ সত্যটিকেই আরও একবার মনে করিয়ে দিয়ে গেল।

