ভরা থাক স্মৃতিসুধায় – Uttarbanga Sambad

ভরা থাক স্মৃতিসুধায় – Uttarbanga Sambad

শিক্ষা
Spread the love


সযত্নে সাইকেল চালানো সেই বন্ধুকে অজস্র ধন্যবাদ

  • কুনাল রায়

আমার ছেলেবেলার শিক্ষকদের মধ্যে সৈকতও আছে। এক যুগের ছেলেবেলায় সে নেহাতই নগণ্য এক টুকরো হলেও, আমাকে প্রথম চাকায় ভর করে উড়ে বেড়াতে শিখিয়েছিল সৈকতই। তখন ক্লাস এইট, তখনও আমি সাইকেল চালাতে পারি না। প্রথম স্থায়ী ঠিকানা হওয়ার পর, বাদ পড়া জিনিসের তালিকায় ঢুকে গিয়েছিল আমার প্রথম তিনপেয়ে সাইকেলটা। তারপর আর কেনা হয়নি। অন্তিম পরীক্ষার ফলটা পদের মতো হলেও, তবু কথা ছিল। পাঁচ, ছয় এমনকি সাত ক্লাসেও ফলাফল তেমন ভালো হয়নি। ছ’য়ে তো উইকেট পড়ে যায় যায় অবস্থা। শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্যবাবুর মতিভ্রমে সে যাত্রায় বৈতরণি পেরিয়েছিলাম। তারপর আর তালগোলে দু’চাকার মালিক হওয়া হয়নি।

আট নম্বর ক্লাসে সম্ভবত, মা অনেক আশা নিয়ে এক মাস্টারমশাইয়ের কাছে নিয়ে গেলেন। সেখানেই সৈকতকে পেয়ে গেলাম। ওর একটা বাদামি রঙের বেটে সাইকেল ছিল। সবাই বলত ক্যাপ্টেন সাইকেল। বেশ বন্ধুত্ব জমেছিল ওর সঙ্গে। যেদিন শুনল, আমার কখনও সাইকেল শেখা হয়নি। কী যে হেসেছিল! তারপর কেন জানি না, নিজেই দায়িত্বটা ঘাড়ে চাপিয়ে নিল। ওই মাস্টারমশাইয়ের বাড়ির কাছের মাঠে, কটাদিন আধ ঘণ্টা করে ক্যারিয়ার ধরে ছুটেছে সৈকত। একদিন হঠাৎ দেখলাম, অচিরেই ওকে দাঁড় করিয়ে রেখে, মাঠের অনেকটা দূরে চলে গেছি। পরে নিজের যখন একটা সাইকেল হল, সৈকতের সঙ্গে দুরত্ব অনেকটা বেড়ে গেছে। মাও ওই স্যরের ওপর ভরসা হারালেন সহসা।

তারপর সাইকেলে চেপে পাড়া, বেপাড়ায় কত আড্ডা দিলাম। সাইকেল নিয়েই চলে গেলাম, শহরের অলিগলি। আমার সাইকেলেরও বন্ধু হল কত। পাশাপশি রাস্তাজুড়ে হইহই করে ছুটত কতগুলো দামাল সাইকেল। কিন্তু সময় এমনই, আমাকে কোথায় ভাসিয়ে নিয়ে গেল, সৈকতকে আর পেলাম না। তারপরও বহুবার সৈকতের সঙ্গে দেখা হয়েছে। কথাও হয়েছে। ওর বাড়ি খুব একটা দূর নয় যে, মুখশ্রীটাই ভুলে যেতে হয়। কিন্তু কখনও ওকে কৃতজ্ঞতাটুকু জানানো হয়নি বলে মনে পড়ে আজও। পরে হয়তো বলাই যেত, কেন যে বলিনি জানি না। আজ এইটুকু কলম চালালাম স্রেফ সৈকতের জন্য।

সৈকত আমার জীবনে নীরেন্দ্রনাথের ‘অমলকান্তি’-র মতো। আজও যদি আমার সঙ্গে দেখা হত একবার, ওর ‘উঠি তাহলে’ বলার আগে নিশ্চয়ই, জোলো একটা ধন্যবাদ দিতাম। তবে আমি চাই, ও যদি ভুলেও কোনওদিন রোদ্দুর হতে চেয়ে থাকে, পরমাত্মা যেন ওকে আস্ত সূর্য করে দেন।

 

আমাকে কাঁধে নেওয়ার মতো আজ কেউ নেই

  • আবদুল্লা রহমান

ঠিক কোন সময়টাকে ‘ছোটবেলা’ বলব? প্রথমে এটা একটা বড় প্রশ্ন। যতদূর মনে পড়ছে ততটাকেই না হয় আমার বোঝা ও দেখা, শৈশব ধরি। আমার শৈশব বলতে সবার আগে যাঁর কথা মনে পড়ে, তিনি আমার ঠাকুরদা। রোজ এক কাঁধে দুধের ভাঁড়, অন্য কাঁধে আমাকে নিয়ে হেঁটে যেতেন প্রায় দুই কিলোমিটার। আমরা গোয়ালা। তখন তো মাপ জানতাম না, এখন জেনেছি। নাতির প্রতি ঠিক কতটা ভালোবাসা থাকলে এমনটা করা যায়।

সাল খুব সম্ভবত ২০০০। আমি তখন সদ্য প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হয়েছি। ঠাকুরদা ভুল আর বিনা চিকিৎসায় আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। সেই দিনটা আমি জীবনে কোনওদিন ভুলতে পারব না। ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল ৭টা হবে। এক আত্মীয় আমাদের খবর দিয়ে গেল ঠাকুরদা আর নেই। প্রাণবন্ত মানুষটা প্রাণহীন হয়ে সকাল ৯টায় বাড়ি ফিরলেন। আমাদের বাড়িতে কান্নার রোল। মানুষের ঢল নেমেছিল। হিন্দু-মুসলিম সকলের কাছে ঠাকুরদা খুব প্রিয় ছিলেন বলেই তাঁর শেষদিনে সেদিন তত লোক।

আমি অনেক চেষ্টা করেছিলাম কাঁদতে, পারিনি। পাথর হয়ে গিয়েছিলাম। গোসলের (স্নান) আগে সকলে তাঁকে যখন দেখতে হুড়োহুড়ি করছিল, তখন আমি চুপ করে বসেছিলাম। অভিমানী বালকের মতো! মা আমাকে জোর করে ঠাকুরদার কাছে নিয়ে গেল, তাঁর খোলা চোখ দুটো বন্ধ করে দিতে বলল। তার আগে আমার পরিবারপরিজনের সকলে সেটা বন্ধ করার চেষ্টা করেছিল পারেনি। জানি না আমাকে শেষবার দেখতে চেয়েছিল বলেই নাকি তাঁর চোখ দুটো খোলা ছিল। আমি তাঁর দুই চোখ আস্তে করে বন্ধ করে দিলাম। দেখলাম আর তিনি চোখ খুললেন না। সবাই বলতে শুরু করল ‘আদরের নাতি কিনা, শেষ দেখার ইচ্ছে ছিল’।

আমাদের পারিবারিক কবরস্থানে ঠাকুরদার জন্য নতুন ঘর বানানো হয়েছে। এখন ওখানেই তিনি থাকবেন এমনটাই আমাকে বোঝানো হয়েছে। মাটি, বাঁশ আর কলা পাতার সেই ঘর। সময় কেটে গিয়েছে। আর কোনওদিন তিনি আমাকে কাঁধে নিতে আসেননি। বাজারে সেরা খেলনা, মিষ্টি, ফল কিনে দেননি। আজ প্রায় পঁচিশ বছর পরেও আমার স্মৃতি, মনন ও যাপনে তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি। এভাবেই থেকে যাবে গোটা জীবন।

 

দিদিভাই, এই নাও তোমার পেপসি, তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও দেখি

  • অনুষ্কা বর্মন      

ছোটবেলাটা আমাদের সহজেই ফাঁকি দিতে শিখে যায়। আবার কখনও উঁকি দিয়ে আমাদের মনোযোগী করে তোলে সেই হারিয়ে যাওয়া ‘আব্বুলিশে’র দিনগুলির প্রতি। এই ফাঁকি-উঁকির লুকোচুরি খেলায় ‘ধাপ্পা’ হয়ে ধরা দেওয়া একটা দিনের কিছু ঘটনা হাতছানি দিয়ে যায়….।

সেই পেপসির কথা খুব মনে পড়ে। সেগুলিকে ঘিরে আমাদের ছোটবেলায় এক অন্য আবেগ ছিল। আমার কাছে একটু বেশিই আবেগের। ছোটবেলায় আমার প্রায়ই পেটব্যথা হত। ছিল মা-বাবার চোখরাঙানি আর বাক্যবাণ, ‘এগুলো একদম খাবে না, ড্রেনের জল দিয়ে তৈরি, খেলে কীরকম পেট ব্যথা হয় দেখবে।’… ড্রেনের জল আর পেটব্যথাকে শত্রুপক্ষ ভেবে একটু ভয় পেলেও এসব বেদবাক্য হিসেবে মেনে নেওয়ার মতো ভদ্রছানা আমি কোনওকালেই ছিলাম না। আর তাতে ‘পার্টনার ইন ক্রাইম’ ছিলেন আমার দাদু (ঠাকুরদা)।

মা-বাবা অফিসে, স্কুল থেকে ফিরে অলস দুপুরে খেলায় বা গল্পের বই পড়ায় বা দুষ্টুমিতে মগ্ন আমি হয়তো কোনও কোনও দিন খেয়ালও করতাম না গরমকালে পাড়ার অলিগলি কাঁপানো আইসক্রিমকাকুর ঠ্যালাগাড়ির ওই টিং- টিং- টিং শব্দটা। হঠাৎ দেখি মুখের সামনে দাদুর হাতে ধরা ওই ‘ড্রেনের জলের তৈরি’ লোভনীয় পেপসি। ‘দিদিভাই, এই নাও তোমার পেপসি, তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও দেখি’। একদিকে আনন্দে আত্মহারা আমার মুখ থেকে বেরোনো প্রথম প্রশ্ন, ‘মা-বাবা এলে বলবে না তো?…অন্যদিকে সেটা শুনে দাদুর হো-হো করে হেসে ওঠা আর কোলের কাছে টেনে নিয়ে মা-বাবার বকুনির রক্ষাকবচ হয়ে বলা ‘কোনও চিন্তা নেই, তুমি আগে খাও তো’-য় চোখ বুজে ভরসা করে আমি ততক্ষণে পেপসিতে ঠোঁট কমলা করে ফেলেছি।

দাদু চলে যাওয়ার পর আর আমার এই পেপসির সঙ্গে দেখা হয়নি কোনও দিন। শহরতলিটার ‘শহুরে’ হওয়ার অছিলায় হারিয়ে গেছে সেই সব স্বাদ। এত বছর পর হঠাৎ সেদিন এক দোকানে আইসক্রিম কিনতে গিয়ে চোখে পড়ল আবার এই পেপসি। কালের নিয়ম ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির অঙ্কে পারদর্শী হয়ে তা এখন তিন টাকা মূল্যকে সঙ্গী করে ফেলেছে। এক ঝলকে সেই ঝকঝকে ছোটবেলাকে দেখতে পাওয়া আমি আইসক্রিম ফেলে ততক্ষণে লুফে নিয়েছি সেই ছেলেবেলার স্বাদ, আর এই সব কিছুর মধ্যে আবারও শুনতে পাচ্ছিলাম হারিয়ে যাওয়া সেই কয়েকটা শব্দের অনুরণন, ‘দিদিভাই, এই নাও তোমার পেপসি, তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও দেখি’। শুধু সামনে তাকাতে গিয়ে দেখি আর বাড়িয়ে দেওয়া নেই চামড়া কুঁচকে যাওয়া সেই হাতের সঙ্গে অভয়বাণীর ভরসা দিয়ে হো-হো করে হেসে ওঠা মুখটা…

 

ফাঁকা জমিতে দাঁড়িয়ে থাকা সাদা অ্যাম্বাসাডরটা আজও মনজুড়ে

  • অরুণাভ পাল

ছোটবেলা অনেকটা ক্যালিডোস্কোপের মতো। ভাঙা কাচের টুকরোয় ঠাসা, অগোছাল, বিশৃঙ্খল, অথচ নিবিড়ভাবে সংঘবদ্ধ। তার লেন্সে চোখ রাখার পর নানান রকম রঙিন প্যাটার্ন খুঁজে পাওয়া যায়।

মনে পড়ে, দক্ষিণ কলকাতায়, আমাদের বাড়ির অদূরেই একটা বড় বাড়ির সামনের ফাঁকা জমিতে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো, পরিত্যক্ত সাদা হিন্দুস্তান অ্যাম্বাসাডর গাড়িটার কথা। শনিবার সকালে যখন বাড়িটার সামনে দিয়ে আঁকার স্কুলে যেতাম, তখন দেখতাম, গাড়িটা ওই ফাঁকা জমিতে একলা দাঁড়িয়ে থাকত। এরপর কাজে, অকাজে নানান সময় ওই রাস্তা দিয়ে যেতে গাড়িটা চোখে পড়ত। আস্তে আস্তে দেখতাম কীভাবে গাড়িটার ওপর ধুলো আর শুকনো পাতা জমছে। সময়ের সঙ্গে আরও একটা জিনিস লক্ষ করতাম। কীভাবে গাড়িটা আস্তে আস্তে মাটির ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। বৃষ্টির সময় মাটি ভিজে নরম হয়ে যাওয়ার পর গাড়িটার ওজন আর নিতে পারত না। তারপর একদিন বাড়িটার সামনে দিয়ে যেতে গিয়ে দেখলাম, জায়গাটা ফাঁকা। গাড়িটা আর নেই।

ওই বাড়িটার মতো, কলকাতার আরও অনেক বর্ধিষ্ণু পরিবারের কাছে অ্যাম্বাসাডর গাড়ি ছিল। কালের নিয়মে, সেই পরিবারগুলোও এখন আগের মতো নেই। যৌথ পরিবারগুলো ভেঙে নিউক্লিয়ার পরিবারে পরিণত বা তাঁদের বর্তমান প্রজন্ম বিদেশে চলে গিয়েছে। আজও ওই জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালে, গাড়িটার অনুপস্থিতি আমার শরীরের ভেতর এক অদ্ভুত অনুভূতির সঞ্চার ঘটায়। সময়ের এই গতিময়তা ও অপ্রতিরুদ্ধ বহমানতা এবং তার ভেতরে ঘটে চলা নানান ধরনের আশ্চর্য পরিবর্তন- কালের নিয়তি সম্পর্কে আমায় পরিচিত করায়।

হিন্দুস্তান অ্যাম্বাসাডরের আরও একটা পরিচয় রয়েছে। তা হল হলুদ ট্যাক্সি। সময়ের নিয়মে যা কলকাতা শহর থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। হলুদ ট্যাক্সি কলকাতার ভিজুয়াল ও কালচারাল আইকন। হলুদ ট্যাক্সি হারিয়ে গেলে, হারিয়ে যাবে তাদের ছোটবেলা, যাদের স্মৃতির সঙ্গে সেটা জড়িয়ে রয়েছে।

হারিয়ে যাবে আরও অনেক কিছু। একটা শহরের সামগ্রিক ইতিহাস। হারিয়ে যাবে পরিবারের সঙ্গে আত্মীয়দের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার স্মৃতি, শীতের রোববারে চিড়িয়াখানা ঘুরতে যাওয়ার উন্মাদনা মাখানো শৈশব, সন্ধ্যার নন্দন কিংবা অ্যাকাডেমিতে নাটক দেখতে যাওয়ার গল্প, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সামনে প্রেম, হাওড়া স্টেশন কিংবা দমদম এয়ারপোর্ট থেকে ঘরে ফেরার গান, এমনকি দরকারের সময় রিফিউসালও! হারিয়ে যাবে, জানলার নামানো কাচের ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া পোড়া ডিজেলের গন্ধ। হারিয়ে যাবে শহরের ভেতর এরকম বুনে ওঠা হাজারো মানুষের গল্প। এভাবেই, পালটাতে থাকা শহরে এবং হলুদ ট্যাক্সির মতো আরও অনেককিছুকে হারিয়ে যেতে দেখার মাধ্যমে, কখন জানি সময় আমাদের জানান দিয়ে গিয়েছে, ‘তোমরা বড় হয়ে গিয়েছ।’

 

ছোটবেলায় সেই ছেলেধরাজুজু আজও তাড়া করে

  • তন্ময়িতা পাল

ছোটবেলায় আমাদের প্রায় সবারই মনে হয়, ‘আমি বড় হয়ে গিয়েছি!’ মনে হয়, বড়দের মতো আমিও সব করতে পারব, যেখানে খুশি সেখানে যাব। ছোটবেলায় আমারও একবার এরকম মনে হয়েছিল। তখন আমার বয়স সাড়ে তিন কী চার বছর। সেদিন ছিল রবিবার। মা সকাল থেকে রান্নাঘরে ব্যস্ত। আমি আর দিদিভাই ঘরে বসে খেলছিলাম। মা দিদিভাইকে ডেকে বলল, ‘ভোলাকাকুর দোকান থেকে একটা গরম মশলার প্যাকেট নিয়ে আয় তো।’ দিদিভাই দোকানে যাবে শুনে আমিও সঙ্গে যাওয়ার বায়না ধরলাম। কিন্তু মা বারণ করে বলল, “না, তুই ছোট, বাড়িতেই থাক।”

কথাটা শুনে আমার খুব রাগ হল। মনে মনে ভাবলাম, ‘আমি তো এখন বড় হয়ে গিয়েছি। একা একা হাত দিয়ে খেতেও পারি।’ যেমন ভাবা তেমন কাজ। চুপিচুপি দরজা খুলে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে গেলাম। দোকানের বাইরে দেখলাম অনেক লোক, কিন্তু দিদিভাইকে খুঁজে পেলাম না। ভাবলাম দিদিভাই হয়তো অন্য দোকানে গিয়েছে। আমি আশপাশের আরও এক-দুটো দোকান ঘুরে দেখলাম। কিন্তু দিদিভাইকে কোথাও খুঁজে পেলাম না। এমন সময় ঢাকের আওয়াজ কানে এল। দেখলাম মোড়ের মাথার নিমতলা কালীবাড়িতে পুজো হচ্ছে। কী মনে হল মন্দিরের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম।

এদিকে, দিদিভাই দোকান থেকে ফিরে এসে বাড়িতে আমাকে দেখতে না পেয়ে মাকে জিজ্ঞেস করল, ‘বুনু কোথায়?’ মা ভেবেছিল আমি হয়তো কোথাও লুকিয়ে আছি। কিন্তু সারা বাড়ি খুঁজেও যখন আমাকে পেল না, তখন বাবা আর পাশের বাড়ির জেঠু আমাকে খুঁজতে বের হল। রাস্তায় অনেককেই জিজ্ঞেস করল কোনও বাচ্চা মেয়েকে দেখেছে কি না।

এর মাঝেই জেঠুর হঠাৎ চোখে পড়ল মন্দিরের গেটের সামনে একটা বাচ্চা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাবা আর জেঠু সামনে এগিয়ে দেখে ওই বাচ্চা মেয়েটা আমি। তারপর বাবা আর জেঠু আমাকে বাড়ি নিয়ে আসে। বাড়ি ফিরে দেখি মা কাঁদছে। আমি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করি, ‘কাঁদছ কেন?’ সেদিন কেউ আমাকে বকেনি। তবে বাবা শুধু বলেছিল, ‘একা একা এভাবে কোথাও যেতে নেই। নাহলে ছেলেধরা এসে নিয়ে যায়।’ ছেলেধরা যে ঠিক কী জিনিস বুঝতে না পারলেও বেশ ভয় পেয়েছিলাম সেদিন। এখন অনেক বড় হয়ে গিয়েছি বটে, তবে আজও ছেলেধরার কথা শুনলে সেই দিনটার কথাই মনে পড়ে।

 

কুপি হাতে আসা বন্ধু বাঁশ বাগান থেকে উদ্ধার করেছিল

  • সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায়

উত্তরবঙ্গের গ্রামগুলোতে শীত আসার ঠিক আগের সময়টা খুব মোহময়ী। সন্ধ্যা নামলেই গ্রামগুলোকে কুয়াশা এসে ঢেকে দেয়। আমার বাড়ি আলিপুরদুয়ারের জটেশ্বর গ্রামে।  জটেশ্বরকে এখন আর গ্রাম বলা যায় না।  সে এখন মফসসল সেজে বসে থাকে। কিন্তু  শীত যত গাঢ় হয় আমার গ্রামের মফসসলি আচ্ছাদন সরে যায়। ফিরে আসে চেনা গন্ধ। ফেরত আসে ছোটবেলা।

বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। এক ঝাঁক কিশোর আমার সামনে দিয়ে হুস করে সাইকেলে চেপে  একটু দূরের কুয়াশায় মিলিয়ে গেল। ছোটবেলা হঠাৎ  সামনে এসে দাঁড়াল। শীতকাল আমার একদম পছন্দ না, কারণ শীতকালে ‘এই আসছি’ বলে হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলো আর কখনও ফিরে আসেনি। ছোটবেলার শীতকালে খেলার সময় ব্যাপক হারে কমে যেত। তাই স্কুল থেকে ফিরে নাকেমুখে গুঁজেই খেলতে যেতাম। আর সন্ধেবেলা শাঁখে ফুঁ পড়লেই সবাই বাড়ি ফিরতাম। রকমারি খেলা ছিল আমাদের। ক্রিকেট, ফুটবল, গোল্লাছুট, কুমিরডাঙা। তবে বাড়ি ফেরার আগে লুকোচুরি খেলাই আমাদের সবচেয়ে প্রিয় ছিল।

তখন ক্লাস সেভেন। নভেম্বরের শেষ। ক্রিকেটের পর আমরা মেতেছি লুকোচুরিতে। মেঘের সঙ্গে লুকোচুরি খেলে কখন যে সূর্য ডুবে গেছে খেয়ালই করিনি। আমার বাড়ির পাশে এক মস্ত বাঁশ বাগান ছিল। বাড়ির বড়রা আমাদের ওই বাগানে যেতে পইপই করে বারণ করত। কিন্তু তখন আমি সদ্য ‘চাঁদের পাহাড়’ শেষ করেছি। অ্যাডভেঞ্চারের নেশায় বুঁদ হয়ে লুকোতে ঢুকেছিলাম ওই বাগানের একদম ভেতরে। কিন্তু সবে ক্লাস সেভেন তো, শাঁখের আওয়াজ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মন থেকে অ্যাডভেঞ্চারের নেশা উবে গিয়ে বকা খাওয়ার ভয় ঢুকে পড়েছিল। সময় পেরোচ্ছে, কিন্তু আমাকে কেউ খুঁজে পাচ্ছে না। বাগানের গোলকধাঁধা ভেঙে কিছুতেই বেরোতে পারছি না। মনে তখন বড়দের বলা গল্পগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে, ভয় আর বাড়ছে। হঠাৎ দেখি একটা কুপি নিয়ে আমার  এক বন্ধু আমায় খুঁজতে এসেছে। লুকোচুরিতে ধরা পড়ে গিয়ে এত খুশি আমি জীবনে হইনি।  কুপিটা ওই বন্ধুর বাড়িতে  রাখতে গিয়ে দেখি ওই বন্ধুর আর আমার মা বন্ধুর বাড়ির উঠোনে বসে। তারপর আমাদের যা ‘আপ্যায়ন’ হয়েছিল সেকথা ঊহ্যই থাক। কিন্তু মার খেয়েও আমার বন্ধু একবারের জন্যও  বলেনি যে দোষটা আসলে আমার। আসলে ছোটবেলায় আড়ি-ভাব ছিল। বিশ্বাসঘাতকতা ছিল না। পরের দিন একসঙ্গে সাইকেলে করে স্কুল থেকে ফেরার সময় আমি ওকে চাঁদের পাহাড়ের গল্প বলেছিলাম। বাঁশ বাগানটা আর নেই। বড় হয়ে আমি ‘শংকর’ না হয়ে আরও বেশি করে ভীতু হয়েছি।

 কিন্তু আমার সেই বন্ধুটি এখনও আছে। এখনও যখন আমাদের দেখা হয় এই গল্প ফিরে আসে, কিছুটা পালটে। আমরা ফিরে যাই…

 

অঙ্কে শূন্য পাওয়ায় বাবার হাতে রামঠ্যাঙানি 

  • সন্দীপ বসাক

সময়ের সঙ্গে কর্মব্যস্ত জীবনে চলার পথে ছেলেবেলাটাকে প্রায় ভুলে যেতে বসেছি। কিন্তু তার মধ্যেও বিশেষ কিছু স্মৃতি মাঝেমধ্যেই মনে উঁকি মারে। আমি যখন ক্লাস ফোরে পড়ি সেই বছর আমার জন্মদিনের দিন দুপুরবেলা বাবা আমাকে স্নান করিয়ে নতুন জামাকাপড় পরিয়ে রেডি করে দিয়েছিলেন। কারণ আমাকে নিয়ে সেদিন বাবা-মা মন্দিরে পুজো দিতে যাবেন। সেই সময় আমার বাড়ির পাশের মাঠে পাড়ার বন্ধুরা ক্রিকেট খেলছিল। আর ঠিক সেই সময় বাবা-মায়ের কাজের ব্যস্ততার সুযোগ বুঝে আমিও মাঠের দিকে দৌড় দিয়েছিলাম। আর এদিকে কাজ শেষ করে বাবা আমাকে ঘরে দেখতে না পেয়ে খুঁজতে খুঁজতে মাঠে খেলতে দেখতে পান আমাকে। আমার গোটা গায়ে মাটি আর ঘাম। মাঠের পাশ থেকে একটা গাছের ছোট ডাল কুড়িয়ে আমাকে উনি মারতে মারতে বাড়ি ফেরত এনেছিলেন। সেটাই ছিল আমার জন্মদিনের প্রথম এবং শেষবারের মতো মার খাওয়া।

তারপর আরেকটি ঘটনা হল আমি যখন ক্লাস সিক্সে পড়ি। ক্লাস টেস্টে সেবার অঙ্কে শূন্য পেয়েছিলাম। ভয়ে বাড়িতে এসে কথা বলার সাহস পায়নি। বাবা কয়েকদিন জিজ্ঞাসা করেছিল যে, স্কুল থেকে অঙ্ক খাতা দিয়েছে কি না! আমি না বলেছিলাম। বাবা তখন সন্দেহ প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘সব বিষয়ে খাতা দিল আর অঙ্কের খাতা কেন দিচ্ছে না?’ কোনও মতে কিছু বলে আমি সমানে কাটিয়ে চলেছিলাম। কিন্তু কথায় আছে যে চোরের দশ দিন হলে গেরস্থের একদিন। আমারও একদিন সেই দশা হল।

আমার এক বন্ধুর সঙ্গে বাবার দেখা হয়। বাবা সেই বন্ধুকে অঙ্ক খাতার বিষয়টি জিজ্ঞাসা করলে ওই বন্ধু সত্যি কথাটা বলে দেয়। আমার ওই বন্ধু বাবাকে বলেছিল, ‘স্কুল থেকে অনেকদিন আগেই অঙ্ক খাতা দিয়েছে। সন্দীপ শূন্য পেয়েছে তাই ভয়ে বাড়িতে তোমাকে খাতা দেখায়নি।’ ব্যাস, বাজার থেকে বাড়িতে এসে বাবা একটা মোটা লাঠি দিয়ে আমাকে বেধড়ক পেটাতে শুরু করেন। আমার চিৎকারে ঠাকুমা এসে বাবার মারের হাত থেকে আমাকে বাঁচান। এমন মার খেয়েছিলাম যে কয়েকদিন শরীরে ব্যথা ছিল। ব্যথা সারাতে প্রতিদিন ঠাকুমা আমাকে গোটা শরীরে তেল মালিশ করে দিতেন। সেই স্মৃতি একইসঙ্গে খুব বেদনাদায়ক, আবার মজারও। জীবনে ঠিকমতো পথ চলার জন্য এমন স্মৃতিগুলি খুব বেশি করে প্রয়োজন যে হয় সেটা আজ বেশ বুঝতে পারি।

 

এক বাসার দেওয়াল থেকে অন্য বাসার উঠোন

  • তৃণা চৌধুরী

জানলা, কড়ি বরগা, সিঁড়ি- কোনও একটা বাড়ির এসবে কি ছোটবেলা লেগে থাকে? এই প্রশ্নে বেশিরভাগ মানুষ দুটো দলে ভাগ হবেন। যাঁরা একবাক্যে হ্যাঁ বলবেন প্রথম থেকে নিজের বাড়ি বলার মতো একটা ছাদ তাঁদের ছিল। আমি অন্য দলে পড়ি। গ্রাম-মফসসল থেকে পেশার খাতিরে কলকাতায় ছুটে আসা পরিবারগুলোকে যে বাড়িগুলো আশ্রয় দিয়ে নিজের করে নেয় আমরা ভালোবেসে সেগুলোর নাম দিই বাসাবাড়ি।

একটা ইট-সিমেন্ট, চুন-সুড়কি ঘেরা ছাদের দু’দুটো নাম। ভারী মজার তো! বাবা প্রতি মাসে যাঁদের ভাড়া দেন তাঁরা বলেন বাড়ি। আর আমাদের কাছে বাসা। কলকাতার প্রথম ঠাঁই এখনও ঝাপসা হয়নি। ৪- বি মদন মিত্র লেন। আজও সহজে পৌঁছোনো যায়। তবে আমাদের ঘরটা নতুন বহুতল মালিক এখন যত্ন করে বাদ দিয়েছেন। একটা আট ফুট বাই এগারো ফুট ঘরে আমার প্রথম আট বছরের মেয়েবেলা। মা বলেন, আমি নাকি খুব ছোট থেকে একটা টেবিলে সারাদিন বসে থাকতাম। ওই ঘরে প্রথম হাঁটতে শিখেছি। প্রথম আধো-আধো কথা বলেছি। স্লেট-পেন্সিলে মা শিখিয়েছেন অ-আ, A-Z, আবার পড়ে শুনিয়েছেন ছোটদের রামায়ণ, মহাভারত। ছুটির দিনে হেদুয়া পার্ক পর্যন্ত যাওয়ার রাস্তা মুখস্থ ছিল। ফিরে আসতেই একরাশ খেলনা ছড়ানো থাকত উঠোনে। আবার রাতে বাবা-কাকারা ফিরে এলে একটা অদ্ভুত যন্ত্র চালানো হত। সাদা-কালো টিভি।

ধীরে ধীরে উঠোন আর আমি একটু বড় হলাম। ঠিকানা বদল হল। তিন কামরার বাড়িটা তখন রাজপ্রাসাদের থেকে কম কিছু নয়। গড়পারে, এক্কেবারে জটায়ুর পাড়ায়। ওই বাড়িটার একতলায় কান পাতলে এখনও শোনা যাবে মায়ের সাবধানবাণী- ‘জোরে জোরে পড়, যেন রান্নাঘর থেকে শুনতে পাই।’ সঙ্গে ছিল দেওয়ালে আঁকিবুকি কেটে টিচার টিচার খেলা, ওড়না দিয়ে শাড়ি পরা, পড়ার বইয়ের তলায় লুকোনো গল্পের বই, রান্নাবাটির সংসার ইত্যাদি। উপরি পাওনা মায়ের বকুনি, অঙ্কে ভুল করে আসার ভয়, খেলতে গিয়ে রক্তারক্তি কিংবা জ্বরের রাত।

এরপর আমাদের নিজেদের বাড়ি হল। কত আনন্দের। তবু বাসা ছাড়ার আগে কেন জানি ভারী হয়েছিল চোখের পাতা। সিঁড়িতে ভারী হচ্ছিল পা দুটোও। মনে আছে শেষ রাতে কেউ ঘুমোয়নি। এখন প্রায় চার বছর বাড়ি থেকেও দূরে আছি। আগের বাসাদুটো আমায় শিখিয়েছে অদ্ভুত বৈপরীত্য। সংকীর্ণতা থেকে উদারতা, অভাব থেকে প্রাপ্তি, না পাওয়া থেকে পাওয়ার আনন্দ। এই ঠিকানাগুলোই আসলে আমার জীবনের মানচিত্র এঁকে দিয়েছে। যা পরে নিখুঁতভাবে ঢুকে পড়েছে আমার জীবনদর্শনে। বাকি টুকরো স্মৃতি, সেই টেবিলটা, খেলনাবাটি, ভাঙা সাইকেল জমিয়ে রেখেছি, আর এসব হাবিজাবি লিখতে গিয়ে ভাবছি কিছু কিছু বাসা-ভালোবাসা।

 

 

 



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *