প্রতিটি বিধানসভা এলাকা একেকটি জীবন্ত জনপদ। তার নিজস্ব রসায়ন আছে। একেক বিধানসভায় রাজনীতির বোঝাপড়া একেকরকম। ভোটের আগে প্রতিটি বিধানসভার সেইসব গোপন রাজনৈতিক রসায়নের কথা তুলে ধরছে উত্তরবঙ্গ সংবাদ। আজ নজরে নাটাবাড়ি
গৌরহরি দাস ও শিবশংকর সূত্রধর, নাটাবাড়ি: ‘ও কী ও বন্ধু কাজল ভ্রমরা রে, কোনদিন আসিবেন বন্ধু কইয়া যাও-কইয়া যাও রে…।’
বলরামপুরে আব্বাসউদ্দিন আহমেদের ভাঙাচোরা বাড়ির সামনে দাঁড়ালে গানটি মনে পড়বেই পড়বে। যে ভাওয়াইয়া গানে রাজ্য সরকার উন্নয়নের নানা প্রচার চালাচ্ছে, সেই ভাওয়াইয়ার প্রবাদপ্রতিম শিল্পীর গান বাঁধার ঘর এখন ঝোপঝাড়ে ভর্তি। বাড়িটি থেকে কিছুটা দূরে রাস্তার পাশে গোরুর দড়ি বাঁধছিলেন এক বৃদ্ধ। তাঁর গলায় গুনগুন করছিল ভাওয়াইয়া গানের কলি।
শুনে সাইকেলে পাশ দিয়ে যাওয়া এক তরুণ বললেন, ‘আব্বাস সাহেবের গান আমরা টিকিয়ে রাখলে কী হবে, সরকার তো ওঁর বাড়ির দিকে ঘুরেও তাকায় না।’ ফ্যালফ্যাল করে তরুণের দিকে তাকিয়ে রইলেন বৃদ্ধ। ততক্ষণে তরুণ প্যাডেলে চাপ দিয়ে এগিয়ে গিয়েছেন। বৃদ্ধ আবার গলায় মাফলার জড়িয়ে গোরু চরাতে চরাতে গান ধরলেন। যে গানে আছে মাটির গন্ধ।
ভাওয়াইয়ার পীঠস্থান এই বলরামপুর নাটাবাড়ি (Natabari Meeting Political Battle) বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে পড়ে। স্থানীয় বিধায়ক মিহির গোস্বামী (Mihir Goswami)। তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে নাম লিখিয়েছিলেন। তাঁর সৌজন্যে গত বিধানসভা ভোটে নাটাবাড়ি বিজেপির দখলে আসে। পাঁচ বছর যেতে না যেতে তাঁকে নিয়ে নানা রসিকতা ছড়িয়ে আছে নাটাবাড়িতে।
বলরামপুরের এক তরুণের কথায়, আব্বাস সাহেব গেয়েছিলেন ‘কোনদিন আসিবেন বন্ধু…,’ নাটাবাড়ির বিধায়কের ক্ষেত্রে গানে এই প্রশ্নের উত্তর হতে পারে, ‘ভোটের আগে।’ বিধায়ককে এলাকায় পাওয়া যায় না বলে বিস্তর অভিযোগ। সেটাই এখন বিজেপির কাঁটা। নাটাবাড়ি বাজারে কয়েকজন জানালেন, এই তো কয়েকদিন আগে বিধায়ক এলাকার খেলার মাঠে একটি অনুষ্ঠানে এসে ফিরে যাওয়ার পর কেউ কেউ বললেন, গত পাঁচ বছরে এই প্রথম নাকি তাঁরা বিধায়ককে দেখলেন।
অথচ মিহির গত ভোটে হারিয়েছিলেন তৃণমূলের দীর্ঘদিনের নেতা রবীন্দ্রনাথ ঘোষকে (Rabindranath Ghosh)। নাটাবাড়ি যখন লালদুর্গ ছিল, তখন থেকেই রবি নাটাবাড়ির জবরদস্ত নেতা। নাটাবাড়ি থেকে জিতে রবি একবার মন্ত্রীও হয়েছিলেন। আসলে ভাওয়াইয়া সংস্কৃতিতে মুড়ে থাকা নাটাবাড়িতে উন্নয়নের তালিকা যেমন লম্বা, তেমন না পাওয়ার ফর্দটা কম দীর্ঘ নয়। রবির মতো নেতার হেরে যাওয়ার পিছনে সেটা একটা কারণ ছিল বৈকি।
নাটাবাড়িতে বেশ কয়েকটি হাইস্কুল থাকলেও কোনও কলেজ নেই। কলেজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে জিতেছিলেন মিহির। কলেজের ইট গাঁথা দূরের কথা, অনুমোদন পর্যন্ত আনেননি তিনি। নাটাবাড়ি বাজার ও আশপাশের এলাকায় আগুন লাগলে বড় বিপদ। সেই তুফানগঞ্জ বা কোচবিহার ছাড়া দমকলকেন্দ্র নেই। রাজ আমলের বলরাম মন্দির রয়েছে নাটাবাড়ি এলাকায়। পাশাপাশি ইতিহাসবিজড়িত শালবাড়ি বনাঞ্চলকে কেন্দ্র করে ভালো সম্ভাবনা থাকলেও সরকারি প্রচার ও উদ্যোগের অভাবে পর্যটন সম্ভাবনা দানা বাঁধেনি।
কিংবদন্তি ভাওয়াইয়াশিল্পী আব্বাসউদ্দিনের বাড়ি সংরক্ষণেও কোনও উদ্যোগ নেয়নি সরকার। তবে মিহির গোস্বামীর গ্রহণযোগ্যতা কমে যাওয়া দলের দুর্বল দিক হলেও স্থানীয় স্তরে ভালো সংগঠন বিজেপির প্রধান ‘অ্যাডভান্টেজ’। একসময় বসে যাওয়া এখানকার বিজেপি নেতা সঞ্জয় চক্রবর্তী ফের সংগঠনে সক্রিয় হয়েছেন। মুখ পরিবর্তন হলে তাই বিজেপি এখনও লড়াই দিতে পারবে বলে মনে করেন অনেকে।
তবে কোচবিহার-১ ব্লকের ছয়টি ও তুফানগঞ্জ-১ ব্লকের ১০টি গ্রাম পঞ্চায়েত নিয়ে নাটাবাড়ি কেন্দ্রটিতে এবার মরিয়া ঘাসফুল শিবিরও। সংগঠন গোছানোর পাশাপাশি প্রশাসন ও পঞ্চায়েত ব্যবস্থার তত্ত্বাবধানে প্রচুর রাস্তাঘাট, পথবাতি, নদীবাঁধ ইত্যাদি তৈরি করানো হয়েছে। তাতে সুবিধাজনক অবস্থায় থাকা যাবে বলে শাসকদল আশা করছে।
প্রাক্তন বিধায়ক রবীন্দ্রনাথ ঘোষকেই এই কেন্দ্রে দলের কোঅর্ডিনেটর করেছে তৃণমূল। এই কেন্দ্রে মনোনয়ন পাওয়ার জন্য তিনি মরিয়াও বটে। কিন্তু উন্নয়ন দিয়ে ভোট টানার চেষ্টা করা হলেও শাসকদলের বড় কাঁটা গোষ্ঠীকোন্দল। তৃণমূলের জেলা সভাপতি অভিজিৎ দে ভৌমিকের সঙ্গে রবির কোন্দল এখন গোটা রাজ্য জানে। দুজন আলাদা আলাদাভাবে নাটাবাড়িতে সংগঠন গুছিয়েছেন। এই সমান্তরাল সংগঠনই আবার কাঁটা হয়ে উঠতে পারে।
তবে এলাকায় কান পেতে এই বার্তা স্পষ্ট বোঝা গেল গোষ্ঠীকোন্দল মিটিয়ে নিলে নাটাবাড়িতে ঘাসফুলের দাপট আটকানো কঠিন। জাঁকিয়ে শীত পড়েছে ক’দিন ধরে। ডাউয়াগুড়ির এক চায়ের দোকানের আড্ডায় স্থানীয় এক তরুণের কথায় সবাই সায় দিলেন। তরুণের কথায়, ‘নাটাবাড়ি কেন্দ্রে তৃণমূল বনাম বিজেপি’র লড়াই নয় মশাই, এখানে তৃণমূলের সঙ্গে তৃণমূলের লড়াই। যাকে বলে ভোট কাটার লড়াই।’
ডাউয়াগুড়ির প্রধানের ছেলে অমর রায় কয়েকমাস আগে খুন হয়েছেন। যা নিয়ে দলেরই একটি অংশের, এমনকি রবির দিকে আঙুল তুলেছে নিহতের পরিবার। বাম, কংগ্রেস এখানে অপ্রাসঙ্গিক। ফলে আব্বাসউদ্দিনের এলাকায় হাড্ডাহাড্ডি লড়াই এখন দুই ফুলের।
