বাঙালির শারদোৎসবে নতুন সংযোজন গণেশপুজো। ওদিকে ম্লান হয়ে যাচ্ছে বিশ্বকর্মাপুজো।
রূপায়ণ ভট্টাচার্য
রাসবিহারী মোড় থেকে রুবি হাসপাতালের দিকে যাচ্ছি। রাত বারোটা তখন। মনটন খারাপ, অনেক চেষ্টা করেও এই গণেশপুজোয় অনলাইনে মোদক আনতে পারিনি। সব অ্যাপে দেখাচ্ছে ‘আউট অফ স্টক’! সাধারণ মিষ্টির দোকানে মোদক মোটামুটি ক্ষীরের ঢেলা। বাইরের রাজ্যগুলোর মোদকই ভালো।
এসব ভাবনার মাঝে হঠাৎ দেখি, বালিগঞ্জ বিজন সেতুর ওপর এক অদ্ভুত দৃশ্য।
একদিক থেকে ঢাক, ডিজের শব্দে মুখর লরিতে আসছে সুবিশাল গণেশ প্রতিমা। ডিজে যে কোথায় সরকারি ব্যান হল বুঝলাম না। গণপতি বিসর্জনে যাচ্ছেন। অন্যদিক থেকে এক ছোট ম্যাটাডোরে নীরবেই আসছেন বিশ্বকর্মা। তাঁর মুখ ঢাকা। তিনি প্যান্ডেলের পথে।
বিজন সেতুর ঠিক মাঝামাঝি এসে দুটো শোভাযাত্রাই মুখোমুখি। মাঝরাতে যানজট।
সেই ফাঁকে ট্রাকের ওপর থেকে গণেশ দেখলেন, পাশের ম্যাটাডোরে অত্যন্ত করুণ মুখে ঝিমিয়ে বসে বিশ্বকর্মা। সহাস্য গণেশের গলায় গাঁদার মোটা মালা। পেটভর্তি মোদকের তৃপ্তি। উলটোদিকে বিশ্বকর্মার মুখটি প্রথমার চাঁদের মতো শুকিয়ে।
গণেশ শুঁড় দুলিয়ে হাত নাড়লেন।
‘কী হে বিশ্বকর্মা ভায়া! মুখখানা এমন হাঁড়িপানা করে বসে কেন? কাল তো তোমারই পুজো!’
বিশ্বকর্মা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। হাতের হাতুড়িটা পাশে নামিয়ে রেখে বললেন, ‘কী আর বলব দাদা। তোমার যা রমরমা দেখছি, আমার তো নিজের বাহনটার দিকে তাকাতেই লজ্জা করছে। হাতিটা পর্যন্ত কেমন কাঁচুমাচু হয়ে বসে।’
গণেশ তৃপ্তির ঢেঁকুর তুললেন। তাঁর মন্তব্য, ‘বাঙালি এখন আমাকে বড্ড ভালোবাসছে বুঝলে ভাই! আগে শুধু পৈতাধারী পুরোহিত আর বড়বাজারের অবাঙালি ব্যবসায়ীরা আমাকে চিনত। এখন দ্যাখো কাণ্ড! পাড়ায় পাড়ায় আমার প্যান্ডেল। এমন অবস্থা, সাতদিন লোকে অনলাইনে অর্ডার দিতে গিয়ে হাত কামড়েছে। মোদক নাকি সব আউট অফ স্টক! রসগোল্লা বা সন্দেশ নয়, সবাই মোদক খাচ্ছে।’
বিশ্বকর্মার চোখ ছলছল। কোনওমতে জবাব, ‘তুমি তো অ্যাপে মোদক খেয়ে পেট ফুলিয়ে বসে আছো দাদা। আর আমার খবর রাখো? আমার রিকশাস্ট্যান্ডগুলো একে একে সব উঠে গেল। শহরের ট্রাম বন্ধের মুখে। গ্যারাজগুলোতে আর নতুন কোনও কাজ আসে না। মেকানিকরা বসে মাছি তাড়াচ্ছে। হাওড়া-হুগলি-ব্যারাকপুরের কারখানার চিমনিগুলো দিয়ে আর ধোঁয়া ওড়ে না। জুটমিল বন্ধ। যারা হাতুড়ি, ছেনি আর বাটালির ঠোকাঠুকিতে আমার পুজো জমিয়ে রাখত, তারা আজ বেকার।’
গণেশ একটু নড়েচড়ে বসলেন যেন। গলায় বোঝানোর সুর, ‘আরে ভাই, ডিজিটাল বাংলা! ডিজিটাল ইন্ডিয়া! একেই তো প্রগতি বলে। তুমি এখনও সেই পুরোনো লোহালক্কড়, হাতুড়ি আঁকড়ে বসে থাকলে চলবে? টেকনলজি তো তোমারই ডিপার্টমেন্ট ছিল। সময়ের সঙ্গে আপডেট হওনি কেন?’
বিশ্বকর্মা যেন এবার একটু ক্ষুব্ধ। তাঁর কথায়, ‘আপডেটটা হব কোথায় শুনি? কারখানা না থাকলে কীসের প্রযুক্তি? এখন ব্যবসা নাকি বাংলায় দারুণ বেড়েছে। কিন্তু সেই ব্যবসার চরিত্র দেখেছ? সব ল্যাপটপ আর মোবাইল ফোনে বন্দি। ঘরে বসে, সোফায় শুয়ে তরুণ-তরুণীরা ফোন স্ক্রল করছে। গায়ে এক ফোঁটা ঘাম নেই। একটা লোহার নাটবল্টু কীভাবে আঁটতে হয়, এই প্রজন্ম জানে না। তাদের কাছে টেকনলজি মানে স্রেফ কয়েকটা বিদেশি অ্যাপ।’
গণেশ মুচকি হাসলেন, ‘ভাই রে, বাঙালির চরিত্রটাই তো বদলে গেল। তুমি খেয়াল করছ না? বাঙালি আর ঘাম ঝরিয়ে কারখানায় খাটতে চায় না। তারা শর্টকাট খুঁজছে। ইনস্ট্যান্ট সাকসেস। আমি হলাম সিদ্ধিদাতা। আমায় ডাকলে স্টার্টআপের ফান্ডিং মেলে, ক্রিপ্টোর দর ওঠে, আইটি কোম্পানির শেয়ার বাড়ে। পুজো দিয়ে ভাবে রাতারাতি বড়লোক হবে। তাই তো তোমার গ্যারাজে তালা, আর আমার ক্যাশ বাক্স উপচে পড়ছে।’
বিশ্বকর্মা করুণ চোখে বিজন সেতুর রেলিংয়ের দিকে তাকালেন। নীচে সম্ভবত বজবজ বা বারুইপুরের শেষ ট্রেন চলে গেল।
বিশ্বকর্মা আরও করুণ, ‘বাঙালির এই হুজুগটাই আমাকে মারল। এককালে এই বাংলায় যাওয়া মানে ছিল অন্যরকম উন্মাদনা। সকালে ছাদে দাঁড়িয়ে ভোকাট্টা চিৎকার। আকাশে লাল-নীল ঘুড়ির মেলা। গ্যারাজে গ্যারাজে চোঙা বেঁধে মান্না দে বা কিশোরকুমারের গান। পুজোর গান কোনটা হিট হবে, ঠিক করে দিতাম আমি। রিকশা, সাইকেল, অটোর গায়ে ফুলমালা ঝুলত। মেকানিকদের মুখে আনন্দের ছাপ থাকত। আর এখন? ঘুড়ি ওড়ানো নাকি ব্যাকডেটেড। ছাদে ঘুড়ি ওড়াবে কে, সবাই তো ফোনে রিলস বানাতে ব্যস্ত! বাংলা পুজোর গানও শেষ।’
গণেশ সায় দিলেন, ‘তা ঠিক বলেছ। গানও শেষ, পুজো সংখ্যার বইও শেষ। আছে শুধু রিল। আমার শোভাযাত্রাতেও সবাই ফোনের ক্যামেরা তাক করে নাচছিল। মন কেবল ইনস্টাগ্রামে লাইভ করায়।’
বিশ্বকর্মার গলায় রাগ, ‘শুধু তাই? তোমার পুজো নিয়ে যা চলছে, ভাবা যায় না! রাস্তা আটকে পুজো হচ্ছে। সরস্বতীপুজোর চেয়েও তোমার পুজোয় চাঁদার জুলুম বেশি। বাঙালি নিজের সংস্কৃতিটাই ভুলে গেল দাদা। সরস্বতীরও কপাল পুড়েছে। বাঙালি বিদ্যার পুজো ছেড়ে শুধু ধনদৌলতের পুজোয় মেতেছে।’
গণেশ একটু অপ্রস্তুত। শুঁড় চুলকে বললেন, ‘আরে, এতে আমার কী দোষ? আমি কি বলেছি রাস্তা আটকে প্যান্ডেল বানাও? তা তোমার প্যান্ডেল কোথায় হয়েছে এবার?’
বিশ্বকর্মার মুখ আরও কালো, ‘সেটাই তো চরম অপমানের কথা দাদা। তোমার ফেলে যাওয়া প্যান্ডেলেই আমাকে ঢুকিয়ে দেবে। তোমার ব্যানারটা ছিঁড়ে নামিয়ে সেখানে আমার নামের ফ্লেক্স ঝুলিয়ে দেবে। মানে তোমার এঁটো প্যান্ডেলে আমাকে বসতে হচ্ছে।’
গণেশ হো হো করে হেসে উঠলেন।
‘ভায়া, এতে মন খারাপ করছ কেন? বাংলায় একেই বলে অপচয় রোধ! আধুনিক পরিবেশবান্ধব পুজো। আমার ফেলে যাওয়া মোদকের মিষ্টি শুঁকতে শুঁকতেই কালকের দিন কাটিয়ে দাও। বেশি বায়না কোরো না। মন্দার বাজারে নিজের আলাদা প্যান্ডেল পাওয়াই ভাগ্যের ব্যাপার।’
বিশ্বকর্মার গলায় দীর্ঘশ্বাস, ‘তোমার আনন্দও বেশিদিন টিকবে না দাদা। বাঙালি যে হারে মোদক গিলছে আর শুয়ে বসে ফোন ঘাঁটছে, ঘরে ঘরে সুগার আর প্রেশার। শুনলাম, মিষ্টির দোকানে খাঁটি জিনিস দেওয়া বন্ধ। অতিরিক্ত ভেজাল তেল আর বাসি গুঁড়ো দুধ দিয়ে ঝটপট মোদক তৈরি হচ্ছে প্লাস্টিকের যন্ত্রে।’
গণেশ আঁতকে উঠলেন। ‘বলো কী হে? সত্যি?’
বিশ্বকর্মা এতক্ষণে মুখে এক চিলতে বিজয়ের হাসি ফুটিয়ে তুললেন, ‘একশো বার সত্যি। আমি যন্ত্রের দেবতা। মিষ্টি বানানোর সব মেশিনের নাটবল্টু ঢিলে। রক্ষণাবেক্ষণের কারিগর বাংলায় আর নেই। মিষ্টির ভালো কারিগরও হারিয়ে যাচ্ছে। ভালো মিষ্টির দিন শেষ। ভেজাল মোদক খেয়ে তোমার পেটও একদিন বিগড়োবে দাদা।’
গণেশ হাত দিয়ে নিজের বিশাল ভুঁড়িটা একটু মেপে দেখলেন। মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল।
ঠিক এই সময় নীচের ট্রাফিক সিগন্যালে এতক্ষণে পুলিশ এসে হাজির। কে একজন ছুটে এসে তাড়া দিল। সেতুতে গাড়ির লম্বা লাইন।
গণেশ হাত নাড়েন, ‘চললাম ভাই। বাবুঘাটে আমার বিসর্জন। গঙ্গায় ডুব দিয়ে একটু গা জুড়োই। এই শহরে যা দূষণ, গঙ্গার জলেই একমাত্র শান্তি।’
বিশ্বকর্মা তাঁর বাহন হাতির পিঠে হাত বুলিয়ে ইঞ্জিন স্টার্ট দেওয়ার ইশারা করলেন। কিছুটা উদাস গলা, ‘যাও দাদা। স্বর্গরাজ্যে গিয়ে নিশ্চিন্তে বিশ্রাম নাও। আমাকে তো কাল দিনভর এই কর্পোরেট শহরটার দিকে চেয়ে বসে থাকতে হবে। যেখানে কোনও কারখানার সাইরেন বাজে না। কেউ যন্ত্রকে ভালোবেসে পুজো করে না। কাল সকাল হতেই একদল লোক ঘুম থেকে উঠে শুধু ল্যাপটপের ধুলো মুছবে। কিবোর্ডে একটু চন্দনের ফোঁটা ছোঁয়াবে। তারপর আমাকে দুটো শুকনো বোঁদে আর জিলিপি অফার করে ফের সেই ফোনে বুঁদ হয়ে যাবে।’
গণেশের বিশাল শোভাযাত্রা এগিয়ে গেল গঙ্গার ঘাটের দিকে। বিশ্বকর্মার ম্যাটাডোর ধীরে ধীরে নামল কসবার দিকে।
রাত বারোটা পঁচিশে বিজন সেতুর ওপর একা পড়ে রইল উড়ে আসা শুকনো রজনীগন্ধা ও গাঁদার পাপড়ি। এবং দূর থেকে ভেসে আসতে লাগল দুটো ভিন্ন বাংলার দীর্ঘশ্বাস। একদিকে হারিয়ে যাওয়া একচিলতে সোনালি শৈশব আর কারখানার ব্যস্ত সাইরেন। অন্যদিকে সাউন্ডবক্সে বাজল বাঙালির অপরিচিত অপটু উচ্চারণের স্লোগান, ‘গণপতি বাপ্পা মোরিয়া, মঙ্গলমূর্তি মোরিয়া।’
যেতে যেতে বিশ্বকর্মা হাসলেন, মোরিয়া-টা মরিয়ার মতো শোনাচ্ছে দেখে। তাঁর নামেও একসময় বহুবার স্লোগান উঠত, বিশ্বকর্মা মাইকি জয়। ‘মা’ কথাটা শুনে বিরক্ত হতেন। এখন তাঁর মনে হল, সেই পুরোনো স্লোগানেই আন্তরিকতা বেশি ছিল। গণেশ কিন্তু সেই আন্তরিকতা দেখতে পেল না জীবনে!
(লেখক সাংবাদিক)

