উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: আলিপুরে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা প্রশাসনের সদর দপ্তরে ঘটে যাওয়া বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ডের (Alipore Hearth) নেপথ্যে এবার বড়সড় ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব দানা বাঁধছে। বুধবারের এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড নিয়ে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত। তবে আগুনের চরিত্র এবং বিস্তারের ধরণ দেখে থমকে যাচ্ছেন খোদ তদন্তকারীরা।
বৃহস্পতিবার দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান দমকল প্রতিমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরি। ভবনের অগ্নিসংযোগের চরিত্র দেখে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন। মন্ত্রী জানান, চার ও পাঁচ তলায় আগুন লাগার পর তা মাঝের তলাগুলি সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে সরাসরি নয় ও দশ তলায় কীভাবে পৌঁছে গেল, তা অত্যন্ত রহস্যজনক এবং তদন্তসাপেক্ষ।
তদন্তকারীদের সবচেয়ে বেশি ভাবিয়ে তুলছে মাঝের ছয়, সাত এবং আট তলা সম্পূর্ণ অক্ষত থাকার বিষয়টি। এই তিনটি ফ্লোরে আগুনের কোনো চিহ্ন না থাকলেও, এগুলির সিঁড়িতে আগুন লেগেছিল। প্রাথমিক অনুমান, সিঁড়ি বেয়েই আগুন ওপরের ফ্লোরগুলিতে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু কেন শুধু সিঁড়ি? কেন মাঝের ঘরগুলো অক্ষত? এই প্রশ্নই এখন ষড়যন্ত্রের তত্ত্বকে উস্কে দিচ্ছে।
জানা গিয়েছে, ভবনের শীর্ষ তলায় ১০টি বিধানসভা কেন্দ্রের প্রায় ৪ হাজার ইভিএম (EVM) মজুত ছিল, যা আগুনে সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে গিয়েছে।
পাশাপাশি, পুলিশ সূত্রে খবর, এই আগুনে জেলা পরিষদের অফিস এবং অতিরিক্ত জেলাশাসকের অফিসের বিভিন্ন ফ্লোর মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে বর্তমানে পুলিশ হেফাজতে থাকা দুই প্রভাবশালী তৃণমূল নেতা জাহাঙ্গির খান (Jahangir Khan) ও শওকত মোল্লার (Saokat Molla) অফিস সহ একাধিক কর্মাধ্যক্ষের দপ্তর। ঘটনাচক্রে, বর্তমানে এই দুই নেতার বিরুদ্ধেই একাধিক বিষয়ে তদন্ত চলছে। ঠিক এই সময়েই তাঁদের দপ্তর পুড়ে খাক হয়ে যাওয়াকে নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে মানতে নারাজ ওয়াকিবহাল মহল। বৃহস্পতিবার ভবনের ভিতরে গিয়ে দেখা যায়, অগ্নিকাণ্ডে মূলত পূর্ব দিকের ফ্লোরগুলিই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। তবে পশ্চিম দিকে থাকা জেলাশাসকের অফিসের অংশটি সুরক্ষিত রয়েছে।
আগুন নেভানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় জলের উৎসের অভাব। ভবনে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা থাকলেও তা এই ভয়াবহ আগুন মোকাবিলার জন্য মোটেও পর্যাপ্ত ছিল না। ফলে দমকলকর্মীদের বাধ্য হয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে পাইপ লাইনের মাধ্যমে জল দিতে হয়েছে।
এদিকে, ঘটনার দিন কর্তব্যরত এক দমকল আধিকারিকের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে পুলিশ। বুধবার ওই আধিকারিক সংবাদমাধ্যম ও পুলিশকে জানিয়েছিলেন যে চার ও পাঁচ তলার আগুন নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। পুলিশের প্রশ্ন, ওই আধিকারিক ভালো করে খতিয়ে না দেখেই কেন তড়িঘড়ি আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার কথা ঘোষণা করলেন? এবং কীভাবে তারপরেই নয় ও দশ তলায় নতুন করে আগুন ছড়িয়ে পড়ল? এর পিছনে কোনো গাফিলতি নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তের খাতিরে এসি বন্ধ থাকা অফিসে অফিস টাইমের আগে উপস্থিত চার কর্মীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। তবে পুলিশের এক পদস্থ কর্তা জানিয়েছেন, ওই চারজনকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর সন্দেহজনক কিছু মেলেনি। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন রঙের মিস্ত্রি, যিনি ছাদ থেকে দড়ি বেয়ে নেমে আত্মরক্ষা করেন। অন্য দু’জন সুইপার, যাঁরা ঘর পরিষ্কার করতে এসেছিলেন। চতুর্থ ব্যক্তি ছিলেন সাহাবুদ্দিন মোল্লা নামে ওই ভবনেরই এক স্টাফ, যিনি সাত তলায় আটকে পড়ে ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়েন।
ঘটনার আসল কারণ উদঘাটনে বৃহস্পতিবারই ফরেন্সিক টিম (Forensic Investigation) ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তবে ভবনের ভিতরে অতিরিক্ত তাপমাত্রা থাকার কারণে গতকাল তারা উপযুক্ত নমুনা সংগ্রহ করতে পারেনি। সেই কারণে আজ, শুক্রবার ফরেন্সিক দল পুনরায় ঘটনাস্থলে গিয়ে ল্যাবরেটরির জন্য নমুনা সংগ্রহ করবে। ফরেন্সিক রিপোর্ট জমা পড়ার পর পুলিশ প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নোটিস পাঠিয়ে বিশদ জিজ্ঞাসাবাদ করবে বলে জানা গিয়েছে।
