বাবাই ডিজে

খেলাধুলা/SPORTS
Spread the love


  • কৌশিকরঞ্জন খাঁ

জানলা খোলা। ঘরে সিলিংফ্যান চলছে। তবু বাবাই ঘামছে। জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছে বাবাইয়ের জামার সব ক’টি বোতাম খোলা। বাবাই দুলে দুলে ইতিহাস পড়া মুখস্থ করছে, ‘হোয়াংহো, ইয়াংসিকিয়াং চিনের দুটি নদী। কনফুসিয়াস চিনের একজন দার্শনিক।’ জানলার পাশ দিয়ে যারাই যাচ্ছে, সবাই শুনছে বাবাই সকাল থেকে খুব পড়ছে। হঠাৎ পড়ায় নিমগ্ন বাবাই পাড়ার ষণ্ডামার্কা রাজীবের ধমক খেয়ে পড়া থামিয়ে দেয়।

-কী পড়ছিস! মন দিয়ে পড়।

বাবাই ফেনা ওঠা মুখে, হাঁফিয়ে ওঠা বুকে রাজীবের দিকে মুখ তুলে তাকায়।

রাজীব আবার একটা ধমক দিয়ে বলে, ‘হোয়াংহো, ইয়াংসিকিয়াং চিনের দুটো দার্শনিক? কনফুসিয়াস চিনের একজন নদী?’

পড়ার তোড়ে বাবাই কখন যে লাইন দুটি অদলবদল করে ফেলেছে, খেয়াল করেনি। এখন রাজীবের ধমক খেয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকায়। রাজীব হেসে হাতটা জানলার শিকের মধ্যে দিয়ে প্রবেশ করিয়ে বাবাইয়ের চুলগুলো এলোমেলো করে দেয়। বাবাইয়ের মুখেও হাসি ফোটে। শুধু একবার পিছনদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে নেয়- মা শুনে ফেলেছে কি না! কাছেপিঠে লতা না থাকায় বাবাই বই বন্ধ করে এক লাফে চৌকি থেকে নেমে বাইরে চলে আসে।

পাড়ার বড় বড় ছেলে সকালে উঠে আড্ডা দিতে বেরোলে বাবাই সুখী বেড়ালের মতো একবার তাদের গা ঘেঁষে চায়ের দোকানের কাঠের বেঞ্চটায় বসবেই। রাজীব, খোকন, অনয় খুব স্নেহ করে বাবাইকে। পাড়ার কে না স্নেহ করে! বাপহারা বাবাই গোটা পাড়ার মানুষের ভালোবাসার পাত্র। সারল্যের কোথাও দাম না থাকুক, মানুষের মনে ঠিক দাম থাকে। ঘোড়েল সব মানুষের সংসারে সরলরা হল সবার কাছে অক্সিজেন।

বাবাইয়ের জীবন নদীর মতো- যেদিকে বয়ে যায় যাক। মানুষজন যেন নদীর তীরে বসে থেকে তাকে দেখে চলে। তার আচরণের অনেক কিছুই ব্যাখ্যায় আসে না। সে যখন-তখন যা খুশি করতে পারে। পাড়ার কোনও বাড়িতে অনুষ্ঠান হলে বাবাইয়ের মন নেচে ওঠে। সে শুধু পাত পেড়ে খেয়ে ক্ষ্যান্ত দেয় না। তার সবচেয়ে আনন্দের জিনিস ডিজে। একবার ডিজে বাজা শুরু হলে বাবাইকে ঘরে ধরে রাখা মুশকিল। বাবাই সমানে নেচে যায়, পাগলের মতো নেচে চলে। তার হাত-পা অবশ হয় না।

বাবাইয়ের জীবন সংশয়ের কারণ হয়ে উঠেছে কতবার এই ডিজে! একবার বৈশাখের তীব্র গরমে কৈলাস চ্যাটার্জির ছোট ছেলের বিয়েতে সকাল থেকে রাত ডিজে বেজেছিল। পাড়ার লোক অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল। কেউই মুখ ফুটে কিছু বলতে পারেনি। সারা পাড়াজুড়ে নেমতন্ন। স্টার্টারেরই দশটা আইটেম। চিংড়ি, ইলিশ এ পর্যন্ত পাড়ায় কোনও বাড়িতে একসঙ্গে হয়নি, তার উপর খাসির মাংস, জিরা রাইস। রাজভোগ, আমসন্দেশ, লেডিকেনি, খেজুরগুড়ের সন্দেশ। সবকিছুর আভাস পেয়ে যাওয়ার পর পাড়ার লোক আর কৈলাসবাবুকে বলতেই পারেনি, ‘কৈলাসবাবু, সাউন্ডটা…’

বাবাই সারাটা দুপুর ঘাম ঝরিয়ে নেচে নেচে সন্ধে নামার একটু পরে দশাসই কালো ডিজে বক্সগুলোর সামনে শরীর এলিয়ে দেয়। রাজীব, খোকন, অনয়, বিনু, মান্তু ধরাধরি করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। এক রাতে তিন বোতল স্যালাইন টেনে সকালের দিকে চোখ খুলেই বলেছিল, ‘ডিজে শেষ!’

লতার কিচ্ছু করার থাকে না। বিয়ের পর পর বাবাইয়ের জন্মের দু’বছর হয়নি, বিশু মরে গেল। লোকে বলে লিভার পচে বিশু মরেছে। কেউ বলে লাংস ব্রাস্ট করে মুখে রক্ত উঠে মারা গিয়েছিল। তারপর থেকেই বাবাই একা লতার জীবনে। বাবাই ছাড়া তাঁর কেউ নেই, লতা ছাড়া অবশ্য গোটা পাড়া আছে বাবাইয়ের জন্য।

রাতের আকাশে তালে তালে সার্চলাইট জ্বলছে-নিভছে দেখে আকাশের দিকে তাকিয়ে বসে থাকলে লতা বলে, ‘রাত অনেক হল। বাবাই চ ঘুমিয়ে পড়ি।’

‘ডিজের লাইট!’ বাবাই আক্ষেপ ভরা গলায় বলে।

বিছানায় শুয়েও বাবাইয়ের কোমরটা নাচে। হাত-পা নড়েচড়ে ওঠে। দূরের আকাশের মেঘের গায়ে ডিজের সার্চলাইট বাবাইয়ের মনে তরঙ্গ তোলে। কিচ্ছু শুনতে পাচ্ছে না কিন্তু কোথা থেকে বিটগুলো এসে বাবাইকে ছন্দে ছন্দে নাচিয়ে যায় কে জানে!

পাড়ার পুজোয় ডিজে হবে বলে খুব আশায় ছিল বাবাই। সারাদিন সারারাত ধরে নাচবে। এমনিতে তো জীবনের ছন্দ ধরা বাবাইয়ের মতো নির্বোধের কম্ম নয়। একমাত্র ওই ডিজে বাজলেই জীবনের একটা ছন্দ খুঁজে পায়। গানের মাঝে মাঝে ‘ডিজে! ডিজে!’ শুনলে কোথাকার প্রাণশক্তি যেন এসে জড়ো হয়। সারা শরীরের শিরাধমনী দিয়ে একটা ছলকে ওঠা আনন্দ ঘুরে বেড়ায়। কে যেন হাত বাড়িয়ে তাকে নাচের আসরে নিয়ে যায়।

পুজোর সেক্রেটারি রাজীব মিটিংয়ে জানালেন, আর যাই হোক এবার ডিজে হবে না।

সবাই এ-ওর দিকে তাকায়। বয়স্করা স্বস্তি পায়। রাজীব গম্ভীর হয়ে বলে, ‘বাবাইয়ের কথা ভেবেই এই সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। ছেলেটা অসুস্থ হয়ে পড়বে। লতা মাসিরও চিন্তার শেষ থাকে না।’

মিটিংয়ের আলোচনা বাবাই বাড়িতে এসে লতার কাছে বলতে বলতে কাঁদে আর ফোঁপায়, ‘এবার ডিজে হবে না।’

লতাও কাঁদে। পাড়ার ছেলেদের বাবাইকে ভালোবাসার কথা ভেবে অজানা কারও কাছে কৃতজ্ঞ হয়। বাবাই কারও কেউ না। কম বুদ্ধির এক গরিব ছেলে। তবুও সবার ভালোবাসা ছিনিয়ে নিতে জেনে গেছে কীভাবে!

ঘুমন্ত বাবাইকে দেখলে খুব মায়া হয়। বিশুর মুখ বসানো। বিশুর সব ভালো ছিল, খারাপের মধ্যে কেবল ওই মদ। গাড়ির কনডাক্টর ছিল। কামাই খুব কম ছিল না। লতার জন্য হাতে করে কত জিনিস আনত। নেপালের হাওয়াই চপ্পল, সুইস দেওয়া ছাতা, শাড়ি, নাইটি, টিপের পাতা, নেলপলিশ। সব এনে দিত। কিন্তু নিজের জন্য খান কয়েক চপ আর বাংলা বোতল।

খেয়ে খেয়ে নেশায় চুর হয়ে কতদিন সারারাত খোলা উঠোনেই শুয়ে থাকত। সকালে চোখে রোদ এসে পড়লে উঠে বাকি মদটুকু মুখে ঢেলে নিয়ে স্নানে যেত। তারপর তো গাড়ির ডিউটি। কতদিন রাস্তায় পড়ে গিয়ে মাথা মুখ কেটে বাড়িতে এসেছে। গাড়ির স্টাফরা বাড়ি বয়ে দিতে এসে বলত, ‘বিশুদার সব ভালো, কিন্তু লিমিট জানে না। গাড়ির স্টাফ মাল খাবেই। আমাদের হয়ে গেলে আমরা গেলাস উলটে দেই। বিশুদার গেলাস উলটায় না কখনও, বিশুদাই উলটে যায়।’

লতা কখনও ভেবে ভেবে তল পায়নি- বিশু কেন এত মদ গেলে! গাড়ির স্টাফদের সবারই যা থাকে বিশুরও তাই ছিল। ইটের দেওয়ালের অ্যাসবেসটর ছাওয়া চাল, লতার মতো হালকাপাতলা বৌ। একটা ছেলেও হল। আর কী! আর কী চাই! লতা কোনওদিন বোঝেনি। তবে পাশের বাড়ির ননদ রত্না বলেছে, ‘না গো বৌদি। নিশার জন্য কারণ লাগে না। নিশাই আসল কারণ। মানুষ নিশার জন্যই নিশা করে। দারু খায়, ভাং খায়, গাঁজা খায়, পুরিয়া খায়। তোমার কোনও দোষ নাই গো।’

চৌকির উপর ঘুমন্ত বাবাই যেন একবার ফুপিয়ে উঠল। বন্ধ নিঃশ্বাস বুক ঠেলে বেরিয়ে এল। আজকাল এমন হয়েছে, অনেকেই বাবাইকে বাবাই বলে ডাকে না। কেউ বলে ‘ডিজে বাবাই’, কেউ বলে ‘ডিজে’। লতা এসব কথা ভাবতে ভাবতে একটু দম বন্ধ করে থমকে যায়। ‘আচ্ছা! বিশুর মদের মতো, বাবাইয়েরও ডিজেটা নেশা হয়ে ওঠেনি তো!’

দুর্গাপুজো শেষ। দশমীতে লতা বাড়িতে বসে থাকে। পাড়ার সবাই প্রতিমার পায়ে সিঁদুর ছোঁয়াতে যায়। তার যাওয়া হয় না। ছেলেকে জাপটে ধরে জানলা খুলে বসে থাকে। জানলার সামনের রাস্তা দিয়েই সারা জগতের হইহট্টগোল। একান্ন ঢাকি ঢাক বাজিয়ে পাড়ার প্রতিমা নিরঞ্জনে চলে গেল। বাবাই দেখল। লতা দেখল। কোনও কোনও প্রসেশনে মাইক বাজছে। বাবাইয়ের জন্মের বহু আগের সব গান। ‘ও খাইকে পান বেনারসওয়ালা’। বাবাইয়ের ভিতরটা যেন ঝাঁকি মেরে ওঠে। হাত–পা নিজের বসে আর থাকতে চায় না। সেটা মিলিয়ে যেতেই আবার শুনতে পায়- ‘দো ঘুট পিলা দে স্যারাবি’। বাবাইয়ের মাথার রক্ত লাফায়।

পাড়ার সবাই দশমীর ঘাটে চলে গেছে। লতা তাকে আগলে ধরে বসে ছিল। প্রতিবার দশমীতে নদীটায় কেউ না কেউ ডুবে যায়। একটা চোরাস্রোত থাকে নদীতে। কতবার হয়েছে নিখোঁজ মানুষের বডি ভেসে উঠেছে আড়াই কিলোমিটার দূরে খিদিরপুর শ্মশান কিংবা কংগ্রেসঘাটে। কখনও তো বর্ডার পেরিয়ে বাংলাদেশে ভেসে ওঠে।

মাঝে মাঝে একটা-দুটো ক্লাবের প্রতিমা যাচ্ছে। পাড়ার চায়ের দোকান ফাঁকা। কারা যেন সেখানে জিলিপির দোকান দিয়েছে। আশি টাকা কেজি। অল্প অল্প ভিড় হয়েছে। কেউ আড়াইশো, কেউ হাফ কেজি জিলিপি কিনে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছে। বাবাই পেছনের দিকের বেঞ্চে চুপচাপ বসে আছে। দূর থেকে বিট ভেসে আসছে। আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আলোর ওঠানামা। মাতালদের নাচ। কয়েকজন মাঝবয়সি ও বয়স্ক তাদের রাস্তার মধ্যে আটকে রাখতে চাইছে। ডিজের সঙ্গে নাচতে নাচতে কে কোথায় ছিটকে যাচ্ছে কেউ জানে না। তাদেরই কেউ বাবাইকে দেখতে পেয়ে চেঁচিয়ে ওঠে- ডিজে! ডিজে!

বাবাই সবার অলক্ষ্যে নাচতে নাচতে ভিড়ে মিশে যায়। ছোট শহরের অনেকেই চেনে ডিজে বাবাইকে। ‘কামারিয়া! কামারিয়া! গোলে গোলে ডোলে রাজাজি’র তালে তালে সার্চলাইট আকাশ ফেড়ে দিচ্ছে। বাবাই নাচতে থাকে। প্রসেশন এগিয়ে চলে। রাস্তা ভেসে যায় ভোজপুরি উম্মাদনা ও আবগারি মেজাজে।

রাত দশটায় দশমীর ক্লান্তি ছড়িয়ে পড়ে রাস্তায়, মোড়ে, ফাঁকা ছিন্নভিন্ন পুজো প্যান্ডেলে। সবাই চুপচাপ। লতা গলা চিরে ফেলে ডাকে, ‘বাবাই! বাবাই!’ উদ্ভ্রান্তের মতো খুঁজে চলে। পাড়ার প্রতিমা নিরঞ্জনের পর সবাই ফিরে এসেছে। রাজীব, খোকন, অনয়, অশোক, চাঙ্কি একটু নিরিবিলিতে লাল মদ আর চিপসের প্যাকেট খুলে বসেছিল। দূর থেকে উদ্ভ্রান্ত লতাকে দেখতে পেয়ে চলে আসে। বাবাই নেই!

কেউ বলছে চায়ের দোকানের বেঞ্চে একা চুপচাপ বসেছিল। কেউ বলছে বাড়ি ফিরে গেছে। সরোজ দাসের ইংলিশ মিডিয়ামে ক্লাস সেভেনে পড়া মেয়ে ত্রিজিতা ব্যালকনি থেকে দেখেছে সূর্যসাথী ক্লাবের প্রসেশনের সঙ্গে নাচতে নাচতে বাবাই চলে গেছে।

থানায় মিসিং ডায়েরি হল। পুজোয় বাঁচা টাকা থেকে বাবাইয়ের ছবি সহ ‘সন্ধান চাই’ হ্যান্ডবিল ছাপানো হল। জেলার বিভিন্ন রেলস্টেশনে, বাসস্টপে, মোড়ে মোড়ে বাবাইয়ের ছবি টাঙানো হল। রাজীব, অনয়, অশোক পাগলের মতো বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে গিয়ে হ্যান্ডবিল বিলোল। এত হ্যান্ডবিল, এত পোস্টার ছাপানো হয়েছিল যে অর্ধেকও খরচ হল না। সেই সব এনে রাখা হল লতার কাছে। মাস ঘুরে গেল বছরে। রাজীব ও পাড়ার ছেলেরা রথের দিন আবার খুঁটিপুজো করল। বাবাই কোথায় চলে গেল- সেই চিন্তা সবার কাছে পুরোনো হয়ে যেতে লাগল।

ডিজের শব্দ কোথাও থেকে ভেসে এলে শুধু লতাই মরিয়া হয়ে ওঠে। আপাত নিস্তব্ধ বুকে তরঙ্গ ওঠে। লোকের বাড়ির রান্নার কাজ সেরে সে নিজে বেরিয়ে পড়ে ‘সন্ধান চাই’ পোস্টার সঙ্গে নিয়ে। কোথায় বাদ গেছে ভেবে ভেবে, সেখানে পৌঁছে গিয়ে পোস্টার সাঁটে। জেলার বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ায়। জেলার আশপাশের শহর-গঞ্জে চলে যায়।

তাঁর পোস্টার সাঁটা দেখে অশোক, অনয়, মান্তুরা নিজেদের মধ্যে বলে, ‘ও কি আর ফিরবে! লতামাসির মাথাটা গেছে।’

রাজীব নিস্পৃহ স্বরে বলে, ‘থাক! একটা কিছু নিয়ে থাক।’



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *