‘বানান’ লিখুন, ‘বানাম’ নয়

‘বানান’ লিখুন, ‘বানাম’ নয়

ব্যবসা-বাণিজ্যের /BUSINESS
Spread the love


শৈশবের মজ্জাগত ভুলভুলাইয়ার গণ্ডি পেরিয়ে নিয়মনিষ্ঠ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের হাত ধরে বাংলা বানান।

দীপায়ন ভট্টাচার্য

বর্ণপরিচয়ের ধাপ পেরোতেই বানানের গোলকধাঁধায় আমাদের নাস্তানাবুদ হওয়া শুরু হয়। ঘরে-বাইরে বা বন্ধুমহলে প্রমিত ভাষার বদলে আঞ্চলিক টানের কারণে উচ্চারণ ও লিখনের ভিন্নতর অভ্যাস বানানের ঘাড়ে ত্রুটি হিসেবে চেপে বসে। বানানের এই জটিল ভুলভুলাইয়ার পিছনে কিছু সুনির্দিষ্ট কারণও বিদ্যমান। বাচনভঙ্গির পাশাপাশি পথেঘাটের সাইনবোর্ডে আন্তর্জাতিক ভাষার দাপট কিংবা অযত্নে ছাপা স্থানীয় পত্রপত্রিকার ভুল বানান মগজে ভুল শিকড় গেড়ে দেয়। অনেকের ভুল শুরু হয় ছোটবেলায় ‘বানান’-কে ‘বানাম’ বলা দিয়ে, যা পরে লেখার মস্ত ভুলে পরিণত হয়।

বানান-বিড়ম্বনা থেকে রেহাই পাননি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও। তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘চলতি বাংলার বানান সম্বন্ধে প্রশান্ত বিধান নিয়েছিলেন সুনীতির কাছ থেকে। নিয়মগুলো মনে রাখতে পারিনে, অন্যমনস্ক হয়ে হাজারবার লঙ্ঘন করি। সেইজন্যে অসংগতি সর্বদাই দেখা যায়।’ প্রথম জীবনে আমাদেরও সাধু ও চলিত ভাষার দড়ি টানাটানি এবং গুরুচণ্ডালি দোষের চরম ভয় প্রতিমুহূর্তে তাড়া করে বেড়াত। পরে বয়স বাড়লে জানা গেল, এই দুই রীতির মূল পার্থক্য লুকিয়ে থাকে ক্রিয়াপদ ও সর্বনামে; যেমন চলিত ভাষার ‘বলছিলাম’ ও ‘ওদের’ সাধু রীতিতে যথাক্রমে ‘বলিতেছিলাম’ ও ‘উহাদিগের’ হয়ে যায়। তৎসমবহুল সাধুভাষার বিপরীতে চলিতভাষায় তদ্ভব, অর্ধতৎসম আর দেশি শব্দের ভিড়ই বেশি থাকে। গোঁসাইরহাট গ্রামে থাকার সময় হাট থেকে কেনা কিশোর-পাঠ্য বাংলা শব্দার্থের চটি বইয়ের মাধ্যমে অর্থ ও বানান মকশো করার প্রাণান্তকর পরিশ্রম অবশ্য আমার মতো অনেকের ভিত মজবুত করেছিল।

একটা সময় রেফের পর দ্বিত্ব বর্জন নিয়ে বানান সমিতিতে তুমুল তর্কাতর্কি চলেছিল। মূলত মুদ্রণসৌকর্যের খাতিরে ‘সূর্য্য’, ‘সৌন্দর্য্য’, ‘ভট্টাচার্য্য’, ‘অর্জ্জুন’, ‘কর্ম্ম’, ‘গর্ব্ব’ ইত্যাদির বদলে ‘সূর্য’, ‘সৌন্দর্য’, ‘ভট্টাচার্য’, ‘অর্জুন’, ‘কর্ম’, ‘গর্ব’ লেখার নতুন বিধান দেওয়া হয়। সংস্কৃত ব্যাকরণ, হিন্দি বা মারাঠিতে এই দ্বিত্ব আগেই বর্জিত হয়েছিল। পরবর্তীকালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বানান সংস্কার সমিতি, বাংলা আকাদেমি, সাহিত্য সংসদ, একটি পত্রিকা গোষ্ঠী এবং বিশিষ্ট ভাষাতাত্ত্বিকদের যৌথ আলোচনায় একটি সর্বজনগ্রাহ্য বানানবিধি গৃহীত হয়। শীর্ষস্থানীয় লেখকদের নিজস্ব বানানরীতির সংঘাত পেরিয়ে আজ তা একটি মানানসই রূপ ধারণ করেছে।

উৎকট সংস্কৃত-প্রীতির কারণে একসময় বিদেশি গুণীজনদের নাম ‘সেক্ষপীয়র’ বা ‘মোক্ষমূলর’ লেখা হত, যা এখন পরিমার্জিত হয়ে ‘শেক্সপিয়র’ ও ‘ম্যাক্সমূলর’ বানানে ফিরে এসেছে। রবীন্দ্রনাথ নিজেও উচ্চারণানুযায়ী বানানের পক্ষপাতী ছিলেন; তাই তিনি তৎকালীন ‘বাঙ্গলা’ বদলে প্রথমে ‘বাঙলা’ এবং পরে ‘বাংলা’ লিখতে শুরু করেন, যা আজ আমাদের কাছে সর্বজনীন রূপ। শব্দের শেষে অপ্রয়োজনীয় হস্ চিহ্ন ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞাও জারি করে বানান সংস্কার সমিতি, যাতে ‘গভর্নমেন্ট’ শব্দটিকে দেখে কেউ ভুল করে ‘গভর্নোমেন্টো’ উচ্চারণ না করে বসেন।

বানানের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের পক্ষপাত ছিল হ্রস্ব ই-কারের দিকে (যেমন – ঘটি, দায়ি), অন্যদিকে সুনীতিকুমার পছন্দ করতেন দীর্ঘ ঈ-কারের ব্যবহার (যেমন- কাঁচী, খুঁটীনাটী, একটী)। সাধারণ মানুষ এই বৈপরীত্যে ধন্দে পড়লেও সংস্কারের হাত ধরে হরিণী বা বাঘিনীর মতো পাশাপাশি দুটি ই-কার যুক্ত তিন অক্ষরের শব্দে প্রথমে হ্রস্ব ও শেষে দীর্ঘ ব্যবহারের নিয়মটি বদলেছে। ফলে পূর্বের ‘কাহিনী’ এখন দুই হ্রস্ব ই-কার দিয়ে ‘কাহিনি’ লেখা হয়। সবকিছুরই সুনির্দিষ্ট বিধিবিধান রয়েছে, যা একটু সুলুকসন্ধান করলেই জানা যায়। তাই ‘বানান ভুলে কিছু আসে যায় না’ বলে অজ্ঞানতার পালে হাওয়া দেওয়া মোটেও উচিত নয়।

(লেখক নাট্যশিল্পী ও প্রাবন্ধিক। কোচবিহারের বাসিন্দা।)

The submit ‘বানান’ লিখুন, ‘বানাম’ নয় appeared first on Uttarbanga Sambad.



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *