যে রাজনৈতিক ভাষ্যকে আশ্রয় করে বামেদের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানিয়ে থাকে ভারতীয় জনতা পার্টি, এবার সেই অস্ত্রে গেরুয়া শিবিরকে ঘায়েল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সিপিএম। বিজেপি বরাবর জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে বামেদের বিঁধে থাকে। তাদের অভিযোগ, বামেরা কোনওকালে জাতীয়তাবাদী শক্তি ছিল না। এমনকি, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী পর্যন্ত সিপিএম-কে দেশবিরোধী বলতে কসুর করেননি।
বাম দর্শনে দীক্ষিত নেতাদের বহুবার বিজেপির কর্মকর্তারা দেশদ্রোহী বলে চিহ্নিত করেছেন। প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশ থেকে মাওবাদীদের নিশ্চিহ্ন করার যে অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন, তার মধ্যে বাম বিরোধিতা স্পষ্টভাবে প্রকট হয়েছে। পুর নির্বাচনের প্রাক্কালে রাজ্যের বিজেপি নেতৃত্ব সিপিএম-কে একই অভিযোগে বিদ্ধ করে চলেছে।
সিপিএম যে জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে আর রক্ষণাত্মক খেলায় রাজি নয়, তা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে প্রকাশ্য জনসভায় দলীয় নেতৃত্বের বক্তব্যে। জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে নির্বাচনি প্রচারের অভিমুখটি বদলাতে শুরু করেছে সিপিএমের বক্তব্য থেকে। সিপিএমের অভিযোগ, গেরুয়া শিবির কোনওকালে জাতীয়তাবাদী শক্তি ছিল না। বরং তারা প্রাকস্বাধীনতা পর্বে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল। অর্থাৎ তারাই দেশ বিরোধিতায় শামিল ছিল।
পুর নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে তত রাজ্যে রাজনৈতিক উত্তাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক সংঘর্ষের সংখ্যা বাড়ছে, বিরোধী দলের অফিস ভাঙচুরের ঘটনা ঘটছে। একদিকে যখন রাজনৈতিক সংঘর্ষ বাড়ছে, তখন শাসকদল এবং বিরোধীদের বাগযুদ্ধের উত্তাপ সমানতালে বৃদ্ধি পাচ্ছে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্প্রতিক কিছু অনভিপ্রেত ঘটনার প্রেক্ষিতে জাতীয়তাবাদের প্রশ্নটি প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে।
রাজ্য সরকার এবং বিজেপি নেতৃত্বের অভিযোগ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে একশ্রেণির বামপন্থী পড়ুয়ার মুখে ‘আজাদি’ শব্দটির উচ্চারণের মধ্যে দেশদ্রোহিতার প্রতিফলন রয়েছে। সুতরাং এই ধরনের স্লোগান দেওয়া চলবে না। ডিওয়াইএফআই-এর সমাবেশে সদ্য সিপিএমের দুই নেতা মহম্মদ সেলিম এবং মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় বলেছেন, স্বাধীনতার জন্য যাঁরা প্রাণ দিয়েছিলেন, তাঁরা সকলেই দেশের ‘আজাদি’ চেয়েছিলেন।
‘আজাদি’ উচ্চারণে বিজেপি নেতৃত্বের বিতৃষ্ণাকে সিপিএম শুধুমাত্র দেশ বিরোধিতা বলে চিহ্নিত করেনি, তারা এর মধ্যে বিভাজনের রাজনীতি প্রত্যক্ষ করেছে। সিপিএমের অভিযোগ, বিজেপি ভারতের বহুত্ববাদে বিশ্বাস করে না। এই কারণে উর্দু শব্দের প্রতি তাদের এত বীতরাগ। ভারতের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেক্ষিতে বিজেপির বিরুদ্ধে সিপিএমের বক্তব্যকে অনৃত ভাষণ বলে খারিজ করার উপায় নেই।
কারণ এ কথা ঐতিহাসিকভাবে সত্য যে, বিজেপি দল যাঁর মতাদর্শে দীক্ষিত- সেই সাভারকর বা গোলওয়ালকরের মতো নেতারা স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে কখনও প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন না। বরং ব্রিটিশদের প্রতি নরমভাবাপন্ন ছিলেন। অন্যদিকে ভারতের কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধেও কিছু অভিযোগ যে সম্পূর্ণ অসত্য, তেমনটি বলা যাবে না। ভারতের কমিউনিস্টদের মধ্যেও দেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে চরম মতানৈক্য দেখা দিয়েছে বহু সময়।
কাজেই জাতীয়তাবাদের প্রশ্নটি খুবই স্পর্শকাতর। বর্তমানে জাতীয়তাবাদের প্রসঙ্গটি মোটেও মতাদর্শগত বিরোধিতার ইঙ্গিতবাহী নয়, বরং তা এখন রাজ্যে ক্ষমতা দখলের স্লোগান হয়ে দেখা দিয়েছে। এই রাজ্যে পূর্বের শাসকদল তৃণমূল হীনবল হয়ে যাওয়ায় এই মুহূর্তে বিরোধী পরিসর দখলে মরিয়া হয়ে উঠেছে সিপিএম। শাসকদলের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে বিজেপি বিরোধী হাওয়া ইতিমধ্যে বইতে শুরু করেছে। সেই হাওয়ায় ভর করে সিপিএম তাদের জমি পুনরুদ্ধারে উঠেপড়ে লেগেছে।
পুর নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, তত এই হাওয়ার জোর বাড়তে পারে। বিজেপির অজানা নয় যে, সিপিএম যদি পুর নির্বাচনে বিরোধী শক্তি হিসাবে এরাজ্যে ফের আত্মপ্রকাশ করে, তাহলে শাসকদলের পক্ষে তা মোটেও স্বস্তিকর হবে না। অন্যদিকে সিপিএম জানে, তাদের এখন আক্রমণাত্মক খেলায় নামা ছাড়া ভিন্ন পথ নেই। এজন্য তারা বিজেপির প্রধান অস্ত্রটিকেই পালটা হিসাবে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জাতীয়তাবাদের প্রশ্নেই তারা ঘায়েল করতে চাইছে বিজেপিকে।

