বিধানসভায় বিরোধী দলের মর্যাদা নিয়ে বিধায়কদের সই জাল-কাণ্ডে সরগরম রাজ্য রাজনীতি। এবার তারই ছায়া তৃণমূল পুর দলে। তৃণমূল ভবনে দলের কাউন্সিলরদের বৈঠক ভেস্তে যাওয়ার পর পুরসভাতেও দল ধরে রাখার মরিয়া চেষ্টায় নামল তৃণমূল। একটি সূত্রের খবর, রবিবারই উত্তর আর দক্ষিণ কলকাতায় দুটি গোপন বৈঠকে সাদা পাতায় মেয়র পদে মমতার পছন্দের কোনও ব্যক্তিকে সমর্থনের জন্য সই চাওয়া হয়। তাতে বয়ান খানিকটা এইরকম– “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যাঁকে মেয়র হিসাবে বেছে নেবেন, তাঁর প্রতিই আমার সমর্থন থাকবে।” ফিরহাদ হাকিম সদ্য মেয়র পদে ইস্তফা দেওয়ায় সেই পদ ফাঁকা। আগামী ছয় মাস পুরসভা চালাতে হলে নতুন কাউকে সেই পদে নিয়ে আসতে চাইছেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, এমনটাই সূত্রের খবর। সেখানেই চর্চায় এসেছে ডেপুটি মেয়র অতীন ঘোষ ও প্রাক্তন মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায়ের নাম। কিন্তু এদিন সই করার জন্য যে সাদা পাতা দেওয়া হয় তাতে কারও নামের উল্লেখ নেই। এই পরিস্থিতিতে উত্তর ও দক্ষিণ কলকাতা মিলিয়ে মমতাকে সমর্থনের অর্ধেক সংখ্যক সইও মেলেনি বলেই খবর।
এই বিষয়ে আরও খবর
শোভনের নাম বদলি মেয়র হিসাবে চর্চায় আসার পর থেকেই রবিবার তৃণমূল ভবনে ডাকা বৈঠক নিয়ে অনিশ্চয়তার বাতাবরণ সামনে আসে। পুরসভার অচলায়তন কাটাতে তৃণমূলের পুরদলের শীর্ষ নেতৃত্বে চেয়েছিল তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ইচ্ছামতো নতুন নাম সমর্থন করুন কাউন্সিলররা। জানা যায়, এর পরই আসরে নামেন দলনেত্রীর ইচ্ছার বিরোধী কাউন্সিলরদের একটি দল। মেয়রহীন কলকাতা পুরসভায় যেখানে বোর্ড ভেঙে প্রশাসক বসানোর প্রক্রিয়া অনেকটা এগিয়ে ফেলেছে রাজ্য প্রশাসন, সেখানে আইনি জটিলতা বাড়িয়ে নতুন করে কাউকে সমর্থনের জন্য রবিবার তৃণমূল ভবনে কাউন্সিলররা যাবেন কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সরব হয় একটি গোষ্ঠী। তাতে রাস্তায় একজোট হয়ে তৃণমূল ভবনে গেলে সেখানে বিক্ষোভের মুখে পড়ার ভয়ও ছিল। ফলে মমতা এদিন শহরে থাকাকালীনই সেই বৈঠক ভেস্তে যায়। এরপর খবর আসে, বিকেলে গোপন দুটি জায়গায় গিয়ে মমতাপন্থী কাউন্সিলরদের সই করে আসতে বলা হয়েছে। একটি অংশের দাবি, উত্তরের জায়গাটি ঠিক করেন অতীন ঘোষ। দক্ষিণের জায়গাটি ঠিক হয় ভবানীপুরের প্রিয়নাথ মল্লিক রোডে সুব্রত বক্সির পার্টি অফিসে। সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন পুরসভার চেয়ারপার্সন মালা রায়। এখানে সক্রিয় হন উত্তর কলকাতার এক প্রাক্তন কাউন্সিলর ও দক্ষিণ কলকাতার এক হেভিওয়েট কাউন্সিলর। জনে জনে বাকি কাউন্সিলরদের ফোন করে তাঁরাই এই নতুন মেয়র বাছাই প্রক্রিয়ায় আইনি জটিলতার কথা বলে বিষয়টি থেকে বিরত থাকতে বলেন বলে খবর। যেক্ষেত্রে কৌশলী পরামর্শের জন্য এই গোষ্ঠীর যোগাযোগ ছিল বিধানসভার দুই বিদ্রোহী তৃণমূল বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহার সঙ্গে।
সন্ধ্যার পর খবর, দুই শিবির মিলিয়েও তৃণমূলের মোট কাউন্সিলর সংখ্যার অর্ধেকও সেই সাদা পাতায় সই করেননি। দেবাশিস কুমার, অসীম বসুর মতো বিদায়ী বোর্ডের একাধিক মেয়র পারিষদ এবং বরো চেয়ারম্যানও ভবানীপুরের ‘সই-সংগ্রহ কেন্দ্রে’ সই করতে আসেননি। তবে সন্দীপ বক্সি, বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়রা তৃণমূলনেত্রীর হয়ে সক্রিয় ছিলেন। বৈশ্বানরের কথায়, “পুর-আইনেই আছে নতুন করে মেয়র পদে কাউকে নির্বাচিত করতে হলে সংখ্যাগরিষ্ঠ কাউন্সিলরের সমর্থন প্রয়োজন। সেই উপায় যখন আছে, আইন অনুয়ায়ী তা করাও অস্বাভাবিক না।” উলটো পরিস্থিতির কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন উত্তর কলকাতার এক প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলর। বলেছেন, “বিধানসভার ক্ষেত্রে বিধায়কদের সই-জাল করা নিয়ে যে নজির তৈরি হয়েছে, তাতে পুরসভার ক্ষেত্রেও একই পথে গেলে আইনি জটিলতাই বাড়বে।” ফলাফল, বরো ৮ ও ৯-এর অধিকাংশ কাউন্সিলর সেই সাদা পাতায় সই করলেও বরো ১০-এর তপন দাশগুপ্ত ও অন্য দু’জন ছাড়া অধিকাংশ পুরপ্রতিনিধি সই করেনি। উত্তরেও একই অবস্থা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২ জন দলীয় কাউন্সিলর মারা যাওয়ায় বর্তমানে তৃণমূল পুরদলের সদস্য ১৩৫। এই সই পর্বে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণে ৬৮ জনকে দরকার। এর মধ্যে ৭ জন জেলে। এই পরিস্থিতি নিয়ে বরানগরের বিধায়ক তথা কলকাতার ৫০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সজল ঘোষের কটাক্ষ, “যাঁরা তৃণমূল ভবনে বৈঠকে গেলেন না তাঁরা অনেকেই মার্কসবাদী তৃণমূলে যাচ্ছেন। আর ফিরহাদ হাকিম নিধিরাম বলে পদ ছেড়েছেন। আমরাও একটু দেখতে চাই কে কত অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নতুন দায়িত্বে আসতে চাইছেন।”
এই বিষয়ে আরও খবর
সর্বশেষ খবর
