পাঁঠার মাংস

খেলাধুলা/SPORTS
Spread the love


  • পাঁঠার মাংস

অমিতাভ সাহা

কন্ট্রাক্টর রুনুবাবু বহুদিন ধরে অফিসের সাহেবের পিছুপিছু ঘুরছেন একটা কাজ পাওয়ার জন্য। মাসের পর মাস কাজ নেই, পকেটে টান অথচ বাজারের আগুন দাম কমার কোনও লক্ষণ নেই। সাহেবকে তেল মেরে হোক বা যেমন করেই হোক, একটা কাজ বাগাতেই হবে। তার জন্য সামান্য কিছু খরচাপাতি হলে তাও সই। কিন্তু সাহেব ওনাকে বিশেষ পাত্তা দিচ্ছেন না। সাহেব বয়স্ক, রাশভারী মানুষ। সামনাসামনি জোরাজোরিও করা যায় না।

অফিসের পিয়ন আর ক্লার্কদের পান-বিড়ি খাইয়ে রুনুবাবু বিশ্বস্তসূত্রে খবর পেলেন রাশভারী সাহেবের দুর্বল জায়গা, কচি পাঁঠার মাংসের ঝোল। এই একটি বস্তুর নাম শুনলে সাহেবের নাকি মেজাজ নিমেষে মোলায়েম হয়ে যায়। রুনুবাবু মনে মনে ফন্দি আঁটলেন, সাহেবকে একদিন বাড়িতে নেমন্তন্ন করে কব্জি ডুবিয়ে খাওয়াবেন। সামনেই রুনুবাবুর বিবাহবার্ষিকী। এই অছিলাটা দারুণ কাজে লাগবে। পরের দিনই ভালো জামাকাপড় পরে অফিসে গিয়ে সাহেবের ঘরে ঢুকলেন রুনুবাবু। গদগদ গলায় বললেন, ‘স্যর, সামনের রোববার আমার বিবাহবার্ষিকী। এই বিশেষ দিনে গরিবের বাড়িতে দুপুরে কিন্তু আপনাকে পদধূলি দিতেই হবে। নাহলে ভীষণ মাইন্ড করব।’ সাহেব প্রথমে একটু গাঁইগুঁই করলেও অনেক কষ্টে রাজি করালেন তাঁকে।

রুনুবাবুর বাড়ি কোচবিহার শহরে। রোববার সকালবেলা চাকর হরেনকে ডেকে হাজার টাকা দিয়ে বললেন, ‘শোন, ডোডেয়ারহাট থেকে কচি পাঁঠার মাংস নিয়ে আসবি। কম সে কম এক কিলো। ওই টাকায় যা হবে তাই নিয়ে আসবি। মাংসে যেন কোনও খুঁত না থাকে! আজ সাহেব এখানে খাবেন।’

হরেন তো হাজার টাকা হাতে পেয়ে মহাখুশি। বলল, ‘আর আমার যাওয়া-আসার ভাড়া দেবে না?’

রুনুবাবু বললেন, ‘যাওয়া-আসার ভাড়া ওর মধ্যেই দেওয়া আছে রে হারামজাদা।’

হরেন ওর মালিককে ভালো মত চেনে। এমন কঞ্জুস লোক আর দুটি নেই। এতদিন এ বাড়িতে চাকরি করছে, না কোনওদিন পুজো বোনাস পেয়েছে, না কখনও কোনও বকশিস। তাই আজকে যখন হাজার টাকা হাতে পেয়েছে, তখন এর সদ্গতি করতেই হবে।

দীর্ঘদিন হরেনের বাড়িতে ভালোমন্দ কিছু রান্না হয়নি। পাঁঠার মাংস তো দূর অস্ত, ব্রয়লার মুরগিও জোটে না। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে ভাবতে লাগল, বাবুর দেওয়া এই টাকা থেকে কিছু টাকা সরিয়ে কীভাবে নিজের বাড়ির জন্য একটু মাংস নেওয়া যায়। ডোডেয়ারহাটে না গিয়ে সে সোজা চলে গেল তার পাড়ার পরিচিত একটা মাংসের দোকানে। হরেন জানত, এই দোকানের ছেলেটা ভোরে ডোডেয়ারহাট থেকেই পাঁঠা কিনে এনে নিজের দোকানে কাটে। কচি পাঁঠার মাংসের দাম জিজ্ঞেস করল। ছেলেটা বলল, ‘আটশো টাকা কিলো।’

হরেন বলল, ‘বাপ রে! এত দাম! পাঁঠা তো হাতই দেওয়া যাবে না।’

ছেলেটা বলল, ‘এ রকমই দাম।’

হরেন বলল, ‘এর থেকে সস্তার মাল নেই?’

ছেলেটা বলল, ‘সস্তায় পাবে। তবে পাঁঠা পাবে না। পাঁঠী হবে। পাঁচশ টাকায় পাবে।’

হরেন শুনে খুশি হয়ে বলল, ‘তুই পাঁঠীর মাংসই এক কিলো দে।’

ছেলেটা বলল, ‘মাংসটা কিন্তু একটু শক্ত হবে। পরে এসে নালিশ করতে পারবে না।’

হরেন বলল, ‘তুই দে না। আর ওই যে কচি পাঁঠাটা ঝুলিয়ে রেখেছিস, ওখান থেকে পাঁচশো গ্রাম দে।’

দোকানের ছেলেটা তাই দিল। পাঁচশো টাকায় এক কিলো পাঁঠী আর চারশো টাকায় পাঁচশো গ্রাম কচি পাঁঠা। হরেনের পকেটে তখনও একশো টাকা উদ্বৃত্ত। সে রুনুবাবুর বাড়িতে এক কিলো পাঁঠীর মাংসটা গছিয়ে দিয়ে আর পাঁচশো গ্রাম কচি মাংস নিজের ব্যাগে সযত্নে লুকিয়ে সোজা নিজের বাড়ির দিকে হাঁটা দিল।

রুনুবাবুর গিন্নি মাংস ধুতে গিয়ে কেমন একটা গন্ধ পেলেন। রুনুবাবুকে এসে বললেন, ‘মাংসটা মনে হয় কচি নয় গো। কেমন যেন গন্ধ করছে। মনে হয় বুড়ো পাঁঠা। কাকে দিয়ে আনিয়েছ?’

রুনুবাবু দুশ্চিন্তায় পড়লেন। বললেন, ‘হরেনকে দিয়েই তো আনালাম। শালা, আজকের দিনেই ডোবাল মনে হচ্ছে। তুমি এক কাজ করো। মাংসটা লেবুর রস মাখিয়ে কিছুক্ষণ রেখে দাও। তারপর জল দিয়ে ভালো করে ধুয়ে নাও। তাহলে বোধ হয় গন্ধটা যাবে।’

গিন্নি তাই করলেন। গন্ধটা খানিকটা গেল। তারপর প্রেসার কুকারে মাংসটা ভেজে নিয়ে মশলা মাখিয়ে কষিয়ে পরিমাণমতো জল দিয়ে তিন-চারটে সিটি দিয়ে নামিয়ে নিলেন। মাংস টেস্ট করার জন্য রুনুবাবুকে ডেকে বাটিতে একটুকরো তুলে দিলেন। উনি মুখে দিয়ে দেখেন, মাংস রীতিমতো শক্ত, দাঁত দিয়ে টেনে ছেঁড়া যাচ্ছে না। বললেন, ‘সর্বনাশ! এ তো বুড়ো পাঁঠা নিয়ে এসেছে। এই মাংস খেতে গেলে তো সাহেবের দাঁত খুলে পাতে চলে আসবে! তুমি এক কাজ করো, আরও সাত-আটটা সিটি মেরে দাও। না হলে এ মাংস সেদ্ধ হবে না।’

গিন্নি তাই করলেন। তারপর প্রেসার কুকার থেকে বের করে দেখলেন, ব্যাপারটা পুরো ঘেঁটে ঘ হয়ে গেছে। অতিরিক্ত সিটির চোটে মাংসের পেশীগুলো ছিবড়ে হয়ে গেছে আর হাড় থেকে মাংস পুরোপুরি আলাদা হয়ে ঝোলের মধ্যে ভাসছে।

রুনুবাবু রেগে গিয়ে বললেন, ‘এই মাংস না খাওয়ালেই ভালো হত। খাইয়ে আরও বদনাম কুড়নো। হরেন হারামজাদাকে পাই আগে।’

দুপুরবেলা সাহেব গাড়ি করে রুনুবাবুর বাড়ি এলেন। এসেই রুনুবাবুকে বললেন, ‘একটা মস্ত বড় ভুল করে ফেলেছি। দাঁত ফেলে এসেছি বাড়িতে। গাড়িতে আসার সময় মাঝরাস্তায় মনে পড়ল। তাই আজ আর নিমন্ত্রণ রক্ষা করা হল না। শক্ত কিছু তো চিবোতে পারব না। প্লিজ কিছু মনে করবেন না’ বলেই ফোকলা হাসি দিলেন।

রুনুবাবু জানতেন না, অফিসে সাহেবের যে সুন্দর দাঁতগুলো দেখেছিলেন, সেগুলি আসলে এক্সট্রা লাগানো দাঁত। উনি একটু ভেবে বললেন, ‘আপনি কিচ্ছু ভাববেন না। আপনার জন্য কচি পাঁঠার ঝোল রান্না করেছি। একদম নরম, মুখে দিলেই গলে যাবে। দাঁতের কোনও দরকারই পড়বে না! ডোডেয়ারহাটের কচি পাঁঠা।’

কচি পাঁঠার ঝোলের কথা শুনে সাহেবের মুখেও জল চলে এলো। উনি আর না করলেন না। খাবার টেবিলে বসে সাহেব যখন প্রথম মাংসের টুকরোটা মুখে দিলেন, তাঁর মুখটা মুহূর্তের মধ্যে কুঁচকে গেল। দাঁতহীন মাড়ি দিয়ে তিনি প্রাণপণে সেই রাবারের মতো মাংস চিবোনোর চেষ্টা করতে লাগলেন। সাহেবকে গলদঘর্ম হতে দেখে রুনুবাবু কাঁচুমাচু মুখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেমন হয়েছে স্যর মাংসটা?’

সাহেব হাতের টুকরোটা প্লেটে সশব্দে নামিয়ে রেখে চরম বিরক্তির স্বরে গর্জে উঠলেন, ‘এই আপনার কচি পাঁঠা? এ তো পুরো চিমড়ে, ছিবড়ে মাংস! আমার তো মনে হচ্ছে এটা কোনও বয়স্ক ধেড়ে পাঁঠীর মাংস। প্রেসার কুকারে একগাদা সিটি দিলেই কি আর বুড়ো মাংস কচি হয়ে যায় মশাই? আপনি কি আমাকে বোকা পাঁঠা পেয়েছেন?’

সাহেবের মেজাজ পুরো খিঁচড়ে গেল। তিনি আর এক গ্রাসও না খেয়ে হাত ধুয়ে গজগজ করতে করতে উঠে পড়লেন। রুনুবাবু সাহেবের সামনে ভীষণভাবে অপদস্থ হলেন। তাঁর কন্ট্রাক্টরির স্বপ্ন চোখের সামনে ধূলিসাৎ হয়ে গেল। আর এই সমস্ত অপমানের রাগ গিয়ে পড়ল সেই হতভাগা হরেনের ওপর।

সাহেব চলে যাবার পর উনি গেলেন হরেনের বাড়ি ওর গুষ্টির ষষ্ঠীপুজো করতে। হরেনদের ভাঙাচোরা বাড়ির সামনে পৌঁছে দেখলেন, হরেনের বাবা দাওয়ায় একটা পুরোনো খাটিয়ায় পরম তৃপ্তিতে হেলান দিয়ে বসে আছেন। তাঁর মুখে তৃপ্তির ঢেকুর, আর হাতে একটা নিমকাঠি দিয়ে আয়েশ করে দাঁত খোঁচাচ্ছেন।

রুনুবাবুকে দেখে ব্যস্ত হয়ে সামনে চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বসালেন। রুনুবাবু রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে হরেনের কথা জিজ্ঞেস করলেন।

হরেনের বাবা একগাল হেসে বললেন, ‘এই তো বাবু, এখানেই ছিল ছোঁড়াটা। একটু আগেই দুপুরের খাওয়াদাওয়া শেষ করে উঠল। তা বাবু, আপনার যে এত দয়ার শরীর, তা তো আগে জানতাম না! আজ কতদিন পরে যে আপনার দৌলতে আমরা কচি পাঁঠার মাংস দিয়ে পেট ভরে ভাত খেলাম, কী বলব! অভাবের সংসারে কচি পাঁঠার স্বাদ তো ভুলতেই বসেছিলাম। হরেন আজ বাড়ি ফিরে বলল, রুনুবাবু স্পেশাল কচি পাঁঠার মাংস দিয়ে পাঠিয়েছেন আমাদের জন্য। আমাদের বাড়িতে তো লোক বেশি, তাই জনপ্রতি মোটে দুই টুকরো করে ভাগে পেয়েছি। তবু ওই কচি পাঁঠার মাংস দু টুকরো মুখে দিয়ে যে কী স্বর্গীয় শান্তি পেলাম! মাখনের মতো গলে গেল বাবু। ভগবান আপনার মঙ্গল করুন, আপনার আয়ু বাড়ুক।’

রুনুবাবু একটা মেকি হাসি দিয়ে বললেন, ‘অনেকদিন আপনাদের জন্য কিছু পাঠানো হয়নি। তাই ভাবলাম আর কী!’

কিন্তু তাঁর ভেতরে তখন রাগের আগ্নেয়গিরি ফাটছে। মনে মনে বললেন, ‘হারামজাদা চোর! আমার বাড়িতে বুড়ো পাঁঠীর মাংস গছিয়ে দিয়ে নিজের বাড়ির জন্য কচি পাঁঠার মাংস নিয়ে এসেছে! দাঁড়া, তোকে আজ আগে একলা পাই, তোর পিঠের চামড়া যদি না গুটিয়েছি তো আমার নাম রুনু নয়!’

কিন্তু দীর্ঘক্ষণ খাটিয়ায় বসে অপেক্ষা করেও হরেনের টিকিটি দেখতে পেলেন না তিনি। অবশেষে ব্যর্থ মনোরথ হয়ে রাগে গজগজ করতে করতে তাঁকে খালি হাতেই বাড়ি ফিরতে হল।

আসলে হরেন তো ধুরন্ধর কম নয়। সে ঠিকই আঁচ করতে পেরেছিল যে, মাংসের কেলেঙ্কারির পর বাবু নিশ্চয়ই নালিশ জানাতে আজ ওদের বাড়িতে হামলা করবেন। তাই দূর থেকে রুনুবাবুর সাইকেল আসতে দেখেই সে পেছনের দরজা দিয়ে সোজা চম্পট দিয়েছিল। সেই যে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হল, হরেন আর তার বাড়ির ত্রিসীমানায় পা রাখল না।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *