ছোটগল্প – Uttarbanga Sambad

শিক্ষা
Spread the love


  • অক্ষর–বৃত্ত

অতনু বিশ্বাস

লেখক ঋদ্ধিমা ঘোষালের সবচেয়ে বড় শত্রু ডেডলাইন। ডাকসাইটে প্রকাশক সৌম্যজিৎ বসু তিনদিন অন্তর ফোন করছেন—‘ঋদ্ধি, পাণ্ডুলিপি কোথায়? আমি তো সাঙ্ঘাতিক চাপে রয়েছি।’

‘কী করব, সৌম্যদা? এতো আচার নয় যে রোদে দিলেই তৈরি হবে।’ হালকা হাসি হাসে ঋদ্ধিমা।

লেখক হিসেবে অল্প সময়েই বেশ নাম করেছে ঋদ্ধিমা। সে থাকে দক্ষিণ কলকাতার এক পুরোনো ফ্ল্যাটে– একা। চারদিকে বইয়ের স্তূপ। সমস্যা হল, তার নতুন উপন্যাস এগোচ্ছে না একেবারে। অথচ প্লটটা দুর্দান্ত। এক বৃদ্ধ ঘড়ির মেকানিক, যে অচল ঘড়ির মধ্যে জমিয়ে রাখে মানুষের হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি। কিন্তু ভাবনা আর উপন্যাস নির্মাণ এক জিনিস নয়। সেজন্য লাগে শহর, রাস্তা, চরিত্র, ভাষা, গন্ধ, ইতিহাস, অসংখ্য সূক্ষ্ম বাস্তবতা– আর লাগে মানুষ।

সেখানেই ঋদ্ধিমা আটকে গিয়েছে। এমনিতে একটা দৃশ্য লেখার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইব্রেরিতে কাটায় সে। বইপত্র ঘেঁটে গবেষণা করে সংগ্রহ করে ডিটেলস। কিন্তু এখন অশ্লীল রকমের ডেডলাইন তাকে সে সুযোগটা দিতে নারাজ।

সেদিন দুপুরে এল তার কলেজের বন্ধু অনির্বাণ। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। ঘরে ঢুকেই বলে, ‘কিরে ঋ, তুই এখনও বইয়ের নীচে চাপা পড়ে মরিসনি?’

ঋদ্ধিমা বিরক্ত মুখে বলে, ‘চুপ কর। আমি জটিল গবেষণা করছি।’

‘গবেষণা না বইয়ের সঙ্গে সহবাস?’ মুচকি হাসে অনির্বাণ।

ঋদ্ধিমা একটা কুশন ছুড়ে মারল ওর দিকে। অনির্বাণ ল্যাপটপ খুলে বলল, ‘এবার লেখালেখির গবেষণায় একটা জিনিস ব্যবহার করে দেখ। সময় বাঁচবে।’

‘আবার কী?’ ঋদ্ধিমা কিছুটা কৌতূহলী হয়।

‘একটা এআই চ্যাটবট।’ অম্লান মুখে জানায় অনির্বাণ।

শুনে ঋদ্ধিমা এমন মুখ করল যেন অনির্বাণ তাকে চিরতার জল খাওয়াচ্ছে। ‘দেখ, আমি উপন্যাস লিখি। ম্যানুফ্যাকচার করি না।’

অনির্বাণ তার ভুল শুধরে দেয়, ‘এআই দিয়ে তোকে লিখতে বলছি না। তুই গল্প ভাববি, ও তথ্য খুঁজে দেবে।’

ঋদ্ধিমা একটু হেসে বলল, ‘তুই সবসময় এত বিরক্তিকর কেন?’

অনির্বাণ কাঁধ ঝাঁকাল। ‘কারণ তোর হাসি দেখতে চাই।’

ঋদ্ধিমা জোর করে মুখ গম্ভীর করে। ‘এইসব সস্তা সংলাপ আমার উপন্যাসে চলবে না।’

অনেক তর্কের পরে অনির্বাণ তাকে খুলে দিল ‘অক্ষর’ নামের এআই চ্যাটবটটা। ঋদ্ধিমা খানিক সন্দেহের চোখে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, ‘উনিশ শতকের কলকাতায় ঘড়ির দোকানগুলো কেমন ছিল?’

সেকেন্ডের মধ্যে উত্তর। এবং সেটা শুধু তথ্য নয়– যেন কাঠের কাউন্টার, পিতলের যন্ত্রপাতি, কেরোসিন বাতির হলদে আলো, ব্রিটিশ আমলের পকেট ঘড়ির বাজার, এমনকি ধাতু আর পুরোনো তেলের মিশ্র গন্ধ পর্যন্ত উগড়ে দিচ্ছে এআই চ্যাটবটটা।

ঋদ্ধিমা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল, ‘আচ্ছা… খারাপ না।’

অনির্বাণ বিজয়ীর হাসি হাসল। ‘ভবিষ্যতের দুনিয়ায় স্বাগত। দেখ, এসব তথ্যই তো তুই জোগাড় করতিস লাইব্রেরিতে পুরোনো বইপত্র আর ম্যাগাজিন ঘেঁটে, কয়েকদিন সময় খরচ করে। হয়ত পুরো তথ্য পেতিসও না।’

মাথা নাড়ে ঋদ্ধিমা। এরপর শুরু হল অদ্ভুত এক সহযোগিতা। ঋদ্ধিমা তৈরি করত গল্পের হৃদয়– চরিত্রের ভাঙন, ভালোবাসা, একাকীত্ব, স্মৃতির ব্যথা। আর অক্ষর তাকে সাহায্য করত চারপাশের পৃথিবী গড়ে তুলতে। ঋদ্ধিমা জিজ্ঞেস করল, ‘১৯৪০-এর কলকাতায় বৃষ্টির দিনে ট্রামের ভিতরের গন্ধ কেমন হত?’ অক্ষর উত্তর দিল, ‘ভেজা কাঠ, কয়লার ধোঁয়া, ভিজে কাপড়, আর কখনও সস্তা আতর– সবকিছুর মিশ্রণ।’ ঋদ্ধিমা জিজ্ঞেস করল, ‘অনেকগুলো পুরোনো যান্ত্রিক ঘড়ি একসঙ্গে চললে কেমন শব্দ হয়?’ অক্ষর লিখল, ‘সময় যেন নিজেই অসংখ্য ছোট পায়ে হাঁটছে।’

ঋদ্ধিমা অবশ্য উত্তরগুলো হুবহু ব্যবহার করত না। কিন্তু তার মাথায় দৃশ্যগুলো জীবন্ত হয়ে উঠত। সে লিখল, ‘দোকানের মধ্যে মহাকাল যেন শত প্রকারের গতিতে হাঁটছিল।’ সেই লাইন পরে জনপ্রিয় হয়েছিল বেশ।

অচিরেই অক্ষর হয়ে উঠল তার গবেষণা-সহকারী। আগে যে গবেষণার জন্য লাগত কয়েক সপ্তাহ, এখন কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ঋদ্ধিমা পেয়ে যাচ্ছিল সব– সম্ভাবনা, তথ্য, পরিবেশ, ভাষা। সে আরও বেশি সময় দিতে পারছিল মানুষের আবেগের মূলে, তার প্রকাশে।

উপন্যাসের শেষ পর্যায়ে ঋদ্ধিমা আটকে গেল। গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে নিরঞ্জন বুঝতে পারবে, সে যে ঘড়ি সারায়, সেগুলোর মধ্যে জমে থাকে মানুষের জট-পাকানো স্মৃতি। কিন্তু দৃশ্যটা ঠিক দাঁড়াচ্ছিল না।

রাত আড়াইটে। টেবিলে ঠান্ডা চা। বাইরে খুব বৃষ্টি– বাজ পড়ছে। বিরক্ত ঋদ্ধিমা লিখল—‘আমি সস্তা আবেগ চাই না গল্পের মধ্যে।’ কয়েক সেকেন্ড পরে অক্ষর উত্তর দিল—‘স্মৃতিগুলো সরাসরি দেখানোর বদলে, ঘড়িগুলোর সময় থেমে যেতে পারে আলাদা আলাদা মুহূর্তে।’

ঋদ্ধিমা থেমে গেল। তার শরীরে কাঁটা দিল। এমন তো সে ভাবেনি। প্রতিটি সময় হয়ত কারও না কারও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। এটা তো লুকিয়েই ছিল গল্পের অন্তরে। হঠাৎ যেন কেউ অন্ধকার ঘরে আলো ধরল।

সে রাতেই লেখা হল উপন্যাসের শ্রেষ্ঠ অধ্যায়। ছ’মাস পরে বই বেরোল– ‘সময়-সংগ্রাহক’।

তারপর বিস্ফোরণ। বইমেলায় লাইন। সংবাদপত্রে প্রশংসা। সমালোচকেরা বললেন, বাংলা সাহিত্যে বহুদিন পরে এমন নিখুঁত পরিবেশ-নির্মাণ দেখা গেল।

আসল ঝড়টা শুরু হল জয়পুরের সাহিত্য উৎসবে। এক আলোচনা-সভায় সঞ্চালক প্রশ্ন করলেন—‘শুনছি আপনি এআই-এর সাহায্য নিয়ে লিখেছেন?’

ঋদ্ধিমা শান্তভাবে বলল—‘হ্যাঁ। গবেষণা, তথ্যসংগ্রহ, ভাষাগত সূক্ষ্মতা এবং পরিবেশ নির্মাণে আমি এআই ব্যবহার করেছি বৈকি।’

কেউ যেন দেশলাই ছুড়ে দিল শুকনো খড়ের মধ্যে। সামাজিক মাধ্যমে আগুন লেগে গেল। ‘এটা সাহিত্য নয়, সফটওয়্যার!’ ‘এআই-লিখিত বই পুরস্কার পাবে কেন?’ ‘মানুষের সৃজনশীলতা শেষ!’

এক প্রবীণ কবি টেলিভিশনে বললেন—‘আজ উপন্যাস লিখতে এআই ব্যবহার করছে, কাল কবিতাও লিখবে এআই।’ আরেক ঔপন্যাসিক লিখলেন—‘এটা ডোপিং-এর মতো। খেলোয়াড় যেমন স্টেরয়েড নেয়, লেখকও এখন এআই নিচ্ছে।’ মিম তৈরি হল– ঋদ্ধিমা চা খাচ্ছে, আর পেছনে রাত জেগে উপন্যাস লিখছে রোবট।

সেদিন অনির্বাণ এসে বলল— ‘তুই ক্যালকুলেটর ব্যবহার করিস– রয়্যালটির হিসাব করতে?’

-হ্যাঁ।

-তাহলে কি তুই অঙ্ক জানিস না?

ঋদ্ধিমা বিরক্ত হল। ‘সাহিত্য আর ক্যালকুলেটর এক জিনিস না।’

-না, কিন্তু প্রযুক্তি মানুষের কাজকে বদলায়, মুছে তো দেয় না। সম্পাদক তোকে মতামত দেয়, এআই-ও তাই করছে। শুধু একটু দ্রুত করেছে। দেখ ঋ, এআই তোকে গল্প অনুভব করতে শেখায়নি। শুধু তোকে দ্রুত হাঁটতে সাহায্য করেছে।

ঋদ্ধিমা জানে, আগে যেখানে একটা দৃশ্যের জন্য পাঁচদিন লাইব্রেরিতে কাটাতে হত, সেখানে এখন কয়েক মিনিটে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এটা কি অন্যায্য সুবিধা? কিন্তু গল্পের হৃদয় তো সে-ই লিখেছে। নিরঞ্জনের ভয়, ভালোবাসা, স্মৃতির ব্যথা– এসব কি কোনও যন্ত্র অনুভব করেছিল? ঋদ্ধিমা ধীরে বলল—‘তুই সবসময় আমার পাশে থাকিস কেন?’

অনির্বাণ হাসল। ‘কারণ তুই যখন হারিয়ে যাস, সে সময় তোকে খুঁজে ফেরা আমার পুরোনো অভ্যাস।’

প্রকাশক সৌম্যজিৎ প্রথমে খুব খুশি ছিলেন। বিতর্ক মানেই বিক্রি! কিন্তু তিনদিন পরে তিনিও হাঁপিয়ে উঠলেন। প্রতিদিন সাংবাদিকরা একই প্রশ্ন করছে—‘উপন্যাসের কত শতাংশ এআই লিখেছে?’

এবার ঋদ্ধিমা আমন্ত্রণ পেল অক্সফোর্ডের ‘ফিউচার অব ক্রিয়েটিভিটি’ সম্মেলনে। সেখানেও একই প্রশ্ন– মানুষ আর যন্ত্র একসাথে সৃষ্টি করলে, স্রষ্টা কে? এক সাংবাদিকের সরাসরি প্রশ্ন—‘আপনার বইয়ের কোন অংশ আপনার লেখা, আর কোন অংশ এআই-এর?’

ঋদ্ধিমা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল—‘‘আমরা ভুল প্রশ্ন করছি। ‘এআই লিখেছে কিনা’ নয়, প্রশ্নটা হওয়া উচিত– ‘মানুষ এআই-কে কীভাবে ব্যবহার করছে’। আমার বইয়ে এআই গবেষণা-সহকারী, সম্ভাবনা-প্রস্তাবকারী, কখনও সম্পাদকীয় আলোচক। কিন্তু চূড়ান্ত সৃষ্টিশীল সিদ্ধান্ত মানুষের।’’

তার বক্তৃতার পর শুরু হল একটা নতুন আলোচনা। ফলাফল ইতিবাচক। বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু হল ‘হিউম্যান-এআই কোলাবরেটিভ রাইটিং’ নামে কোর্স, যার মূল কথা— ‘এআই ধারণা দিতে পারে। দায় ও দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের।’

এক বৃদ্ধ পাঠক সংবাদপত্রে চিঠি লিখলেন—‘আগে ভাবতাম এআই এলে মানুষ লিখবে কম। এখন মনে হচ্ছে, হয়ত মানুষ আরও গভীরভাবে লিখবে।’

সেদিন রাতেও ঝমঝমে বৃষ্টি। অনির্বাণ এসেছে অফিস ফেরত। ঋদ্ধিমা ল্যাপটপ খুলে অক্ষরকে লিখল—‘আজ একজন বলল, তুমি নাকি আমার সহ-লেখক।’

অক্ষর উত্তর দিল—‘তুমিও কি তাই মনে কর?’

এবার ঋদ্ধিমা স্পষ্ট লিখল—‘না, তুমি সহ-লেখক নও। তুমি হয়ত এমন এক আয়না, যেখানে মানুষ নিজের কল্পনাকে দ্রুত দেখতে পায়।’

অনির্বাণও স্ক্রিনের দিকে তাকায়। ‘বেচারা!’

‘কেন?’ জিজ্ঞেস করে ঋদ্ধিমা।

‘এতদিন ধরে তোকে সাহায্য করল, গবেষণা করল, প্লট সাজাল। তবু বাদ পড়ে গেল শেষ দৃশ্যে।’ তারপর অনির্বাণ একটু গম্ভীর মুখে বলল, ‘দেখ, একজন লেখকের এআই লাগতে পারে। কিন্তু একজন মানুষের লাগে আরেকজন মানুষ।’

ঋদ্ধিমা কিছু বলল না।

অনির্বাণ এবার চোখ নামিয়ে বলল, ‘একটা আবেদনপত্র অনেকদিন ধরে জমা পড়ে আছে। স্থায়ী পার্টনার পদে।’

ঋদ্ধিমা এবার তাকাল তার দিকে। অনির্বাণ মজা করছে বলে মনে হচ্ছে না। তারপর ধীরে বলল, ‘অ্যাপ্লিকেশনটা কি খুব পুরোনো?’

‘হ্যাঁ, কলেজের সময়ের।’ উত্তর দেয় অনির্বাণ। ‘প্রশাসনিক জটিলতায় ফাইলটা মনে হয় আটকে আছে।’

ঋদ্ধিমার ঠোঁটের কোণে হাসি। ‘তাহলে আর নতুন করে আবেদন করতে হবে না।’

অনির্বাণ তার দিকে তাকাল। ‘তাহলে কি ফাইলটা নড়াচড়া শুরু করেছে?’

ঋদ্ধিমা উত্তর দিল না। শুধু তার হাতের উপর নিজের হাতটা আরও একটু শক্ত করে রাখল।

ঘরের কোণে ল্যাপটপের অন্তরালে অক্ষর অপেক্ষা করছে নতুন কোনও প্রশ্নের জন্য– যে প্রশ্ন আর উত্তরের বৃত্তে ঘুরে চলে চ্যাটবটের অস্তিত্ব। কিন্তু সেই মুহূর্তে কোনও প্রশ্নের দরকার ছিল না। কারণ, কিছু উত্তর মানুষ এখনও নিজেরাই খুঁজে নিতে পারে।

The submit ছোটগল্প appeared first on Uttarbanga Sambad.



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *