দুয়ারে অন্য বিপদ

দুয়ারে অন্য বিপদ

ভিডিও/VIDEO
Spread the love


স্কুল না হয় সকালে হল। চাকরিজীবীদের না হয় বলা হল টুপি পরে বাইরে যান। কিংবা মাথায় ছাতা রাখুন। অথবা ভরদুপুরে যতটা পারেন, ঘর থেকে বেরোবেন না। কিন্তু কৃষকের, শ্রমিকের কী হবে! যতই কাঠফাটা রোদ উঠুক, চাষিকে পাটখেতের আগাছা সাফ করতেই হবে। তাপ যতই অসহ্য মনে হোক, চা শ্রমিকের ঘুরে ঘুরে পাতা তোলা ছাড়া উপায় নেই। অনেক কারখানায় শ্রমিকের কর্মস্থলে মাথার ওপর ছাদ নেই।

গিগ ওয়ার্কারদের কথা তো অনেকে বিবেচনাতেই রাখেন না। ঝলসানো রোদ কিংবা কনকনে ঠান্ডা বা প্রবল বর্ষণে তাঁরা ছুটছেনই। কথায় কথায় মানুষ হিংসায় উত্তাপের কথা বলে। অথচ প্রকৃতির উত্তাপ সেই হিংসাকে ছাপিয়ে যেতে পারে। চলতি বছরে তেমন পূর্বাভাস দিয়ে রেখেছেন আবহবিদরা। প্রায় এক দশক পর ভারতে আবার সেই বিপদ নিয়ে আসছে সুপার এল নিনো।

যার প্রভাবে আবহাওয়ার স্বাভাবিক ছন্দ তছনছ তো হবেই। ধাক্কা লাগবে খাদ্য উৎপাদন, চাষাবাদ ও জ্বালানিতে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সম্ভাবনা ষোলো আনা এবং শেষপর্যন্ত অর্থনীতি ও সামাজিক ব্যবস্থা জেরবার হয়ে যেতে পারে। শেষবার এল নিনো’র কারণে খরা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল বৃষ্টির ঘাটতির কারণে। প্রাকৃতিক জলাধারগুলি শুকিয়ে গিয়েছিল। খাদ্যসামগ্রীর দাম আকাশছোঁয়া হয়েিছল। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, চলতি বছরের এল নিনো আরও ভয়ংকর চেহারা নিতে পারে।

অনাবৃষ্টির পরিস্থিতি তৈরি হলে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে সমস্যা দেখা দিতে পারে। সেই সংকট সামাল দিতে খোঁজ পড়বে বিকল্প জ্বালানির। অথচ পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সাধারণ জ্বালানির সরবরাহ এখন ভীষণভাবে অপর্যাপ্ত ও অনিয়মিত। ভারত সরকার আশ্বস্ত করছে যে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। বাস্তবে পেট্রোল, ডিজেল ও রান্নার গ্যাসের দাম কয়েক দফায় বাড়াতে বাধ্য হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলি। এই সংকট আশু সমাধান সম্ভব নয়।

জ্বালানির দাম বাড়ার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে পরিবহণ খরচে। সেই খরচ বৃদ্ধির ধাক্কায় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস থেকে শিল্পসামগ্রী- সবকিছু মহার্ঘ হয়ে যেতে পারে। প্রাকৃতিক এই সমস্যাটি কিন্তু তেমনভাবে সরকারি-বেসরকারি স্তরে আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে না। বাংলা এখন ব্যস্ত ‘অনুপ্রবেশকারী’দের হোল্ডিং সেন্টারে আটকে রাখতে ও বাংলাদেশে পুশব্যাকের মরিয়া চেষ্টায় কিংবা দুর্নীতিগ্রস্ত তৃণমূল নেতাদের ওপর ডিম বৃষ্টিতে বা শাস্তি দিতে। প্রকৃতির মার যে তৃণমূল-বিজেপির বিভাজন করবে না- এই সার সত্যটি নিয়ে যেন কারও মাথাব্যথা নেই।

শেষপর্যন্ত সুপার এল নিনো আছড়ে পড়বে কি না ভারতে, পড়লে অভিঘাত কতটা হবে ইত্যাদি বোঝা যাবে নির্দিষ্ট সময়ে। কিন্তু জলবায়ুর ব্যাপক পরিবর্তনে কৃষি, শিল্প, খাদ্যের মূল্য, অর্থনীতি ও সমাজে বিপর্যয়ের জন্য আগাম প্রস্তুত থাকা জরুরি। নাহলে যে বিপদ এসে উপস্থিত হবে, তাকে আটকানোর ক্ষমতা এই ভোটকেন্দ্রিক ক্ষমতা দখলের কারবারের নেই। সন্দেহ নেই যে, এল নিনো’র মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা ভারতের আছে।

আগের চেয়ে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়ার প্রযুক্তি এখন অনেক বেশি উন্নত। বিপর্যয়ের সম্ভাবনায় খাদ্যের মজুত ভাণ্ডার থাকে সরকারের। তবুও আশঙ্কার কারণ হল- প্রতিটি এল নিনো’র আগের চেয়ে বেশি তীব্রতা নিয়ে ধেয়ে আসার বাস্তবতা। তাছাড়া ২০১৫-য় প্যারিসের আবহাওয়া সম্মেলন সতর্ক করেছিল যে, বিংশ শতাব্দীতে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ১.৫ ডিগ্রি বাড়লে বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হবে।

অথচ ২০২৫-এই সেই বৃদ্ধি ১.৪৬ ডিগ্রিকে ছুঁয়ে ফেলেছে। ফলে বিজ্ঞানীদের নির্ধারিত বিপর্যয়ের সীমা পার হয়ে যাওয়া যে সময়ের অপেক্ষা, তা বুঝতে পণ্ডিত হওয়ার দরকার পড়ে না। এল নিনো’র বিপদ আসার আগেই দেশে আবহাওয়ার যে মতিগতি ধরা পড়ছে, তাতে উৎপাদনে বিরাট ঘাটতি তৈরির আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। সময় থাকতে সাবধান না হলে বিপদ ঘরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *