দীপঙ্কর মিত্র, রায়গঞ্জ: বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের ওপর নির্যাতন অব্যাহত। এবার মুম্বই যাওয়ার পথে নাগপুর স্টেশনের কাছে দুষ্কৃতীদের খপ্পরে পড়লেন রায়গঞ্জ ও মালদার শ্রমিকরা। একদল দুষ্কৃতী ওই শ্রমিকদের মারধর করে সঙ্গে থাকা টাকা ছিনতাই করে নেয়। আধার কার্ড দেখালেও জন্ম শংসাপত্র না থাকায় তাঁদের ওপর এই হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ। এই পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত শ্রমিকরা মাঝপথ থেকেই বাড়ি ফিরে এসেছেন।
রায়গঞ্জ ব্লকের ৭ নম্বর শীতগ্রাম অঞ্চলের ধোঁয়াবিশুয়া গ্রামের বাসিন্দা সোহরাব হোসেন আক্রান্ত শ্রমিকদের মধ্যে একজন। সোহরাব জানান, গত ৫ অগাস্ট রায়গঞ্জ থেকে রওনা দিয়ে শালিমার এক্সপ্রেসে তিনি মুম্বই যাচ্ছিলেন। তাঁর সঙ্গে ওই একই কামরায় মালদার আরও পাঁচ শ্রমিক ছিলেন। ৬ অগাস্ট নাগপুর স্টেশনের আগের এক স্টেশনে কিছুক্ষণের জন্য তাঁরা ট্রেন থেকে নেমে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ালে কয়েকজন লোক এসে তাঁদের পরিচয়পত্র দেখতে চায়। আধার কার্ড দেখানো হলেও তারা জন্ম শংসাপত্র দাবি করে। তা না থাকায় শ্রমিকদের ব্যাগপত্র আনতে বলে এবং বেধড়ক মারধর শুরু করে। অভিযোগ, তাঁদের কাছ থেকে নগদ টাকা ও মোবাইল কেড়ে নেওয়া হয়। পরে সুইচ অফ করে মোবাইল ফেরত দিয়ে সতর্ক করে দেওয়া হয়, ফোন অন করা যাবে না। ফোন সুইচ অন করলে পরের স্টেশনে ঝামেলায় পড়তে হবে।
সোহরাব বলেন, ‘দীর্ঘ ২০ বছর ধরে কাজের সূত্রে মুম্বইয়ে যাতায়াত করছি। কখনও এমন ঘটনা ঘটেনি। প্রথমে ভেবেছিলাম ওরা রেল পুলিশ। পরে বুঝলাম ওরা আসলে দুষ্কৃতী।’ ঘটনার পর কোনওক্রমে সোহরাব সহ মালদার পাঁচ শ্রমিক ফিরে আসেন কলকাতায়। ওই পাঁচজনকে আরও বেশি মারধর করা হয় বলে অভিযোগ। ভয়ে আপাতত বাড়িতে ফিরলেও ফের কি কর্মস্থলে যাবেন এই শ্রমিকরা? শীতগ্রামের সোহরাব হোসেন বলেন, ‘এখানে কাজ নেই। তাই পেটের দায়ে যেতেই হবে।’
রবিবার তাঁর বাড়িতে যান ‘পশ্চিমবঙ্গ মাইগ্র্যান্ট ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন’-এর উত্তর দিনাজপুর জেলা কার্যনির্বাহী সভাপতি কার্তিক দাস সহ অন্য সদস্যরা। তাঁরা সোহরাব ও তাঁর পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দেন। এদিন রায়গঞ্জ পুলিশ জেলার সুপারকেও সোহরাব হোসেনের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাটি লিখিতভাবে জানিয়েছেন ওই সংগঠনের সদস্যরা। ইউনিয়নের সদস্য তথা সিটু নেতা বিপ্লব সেনগুপ্ত বলেন, ‘বাংলাভাষী শ্রমিক হলেই পুলিশি অত্যাচারের পাশাপাশি এ ধরনের দুষ্কৃতী কার্যকলাপ ঘটছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগের।’
শীতগ্রাম গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান পলি বিশ্বাস বর্মন বলেন, ‘আমাদের অঞ্চলের হাজার হাজার তরুণ পরিযায়ী শ্রমিক বাইরে আছেন। প্রতিদিন ৩০-৩৫ জনকে রেসিডেন্সিয়াল সার্টিফিকেট দিতে হচ্ছে। তাঁরা আতঙ্কে আছেন শুনেছি। তবে সোহরাবের ঘটনার বিষয়ে এখনও শুনিনি।’
এদিকে, ভিনরাজ্যে বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের ওপর হামলার প্রতিবাদে রবিবার পথে নামে অল ইন্ডিয়া ইমাম অ্যাসোসিয়েশনের উত্তর দিনাজপুর জেলা কমিটি। রায়গঞ্জের শিলিগুড়ি মোড় থেকে শুরু হয়ে ঘড়ি মোড়ে শেষ হয় এই প্রতিবাদ মিছিল। মিছিলে কয়েকশো ইমাম ও মোয়াজ্জিন অংশ নেন। কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেন সংগঠনের উত্তরবঙ্গ কনভেনার মহম্মদ বসিরুদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে নানা ধর্ম ও ভাষাভাষীর মানুষ একসঙ্গে বাস করে। কোনওদিন এমন ঘটনা শোনা যায়নি। কিন্তু এখন বাংলাভাষী মানুষকে বাংলাদেশি তকমা দিয়ে হেনস্তা করা হচ্ছে। এটা মানা যায় না। পশ্চিমবঙ্গের বহু তরুণ ভিনরাজ্যে কর্মরত। তারা যদি ফিরে আসে তবে গোটা পরিবার বিপদে পড়বে। তাই এই অত্যাচার বন্ধ করতে হবে। তা না হলে আমরা জোট বেঁধে আন্দোলনে নামব।’
