ভাষার সেতুতেই মজবুত জাতীয় সংহতি

ভাষার সেতুতেই মজবুত জাতীয় সংহতি

শিক্ষা
Spread the love


উত্তর-পূর্ব ভারতের বিদ্যালয়গুলোতে দক্ষিণী ভাষার পাঠ শুরু হলে দেশের বৈচিত্র্যের ভিত শক্ত হবে।

পঙ্কজকুমার ঝা

ভারত এক অনন্য বহুভাষিক দেশ। প্রতি কয়েক কিলোমিটার অন্তর এখানে যেমন আবহাওয়া বদলায়, তেমনই বদলায় ভাষার টান। সংবিধানে অষ্টম তফশিলে ২২টি প্রধান ভাষার স্বীকৃতি আমাদের বৈচিত্র্যের সবচেয়ে বড় শক্তি। তবে উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ ভারতের মধ্যে পারস্পরিক শিক্ষার অভাবে দীর্ঘকাল ধরে একটি অলিখিত দূরত্ব রয়ে গিয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকেই সংযোগকারী ভাষা নিয়ে নিরন্তর বিতর্ক চলেছে। জাতীয় স্তরে হিন্দির প্রসার বৃদ্ধির সময় দক্ষিণের রাজ্যগুলিতে নিজস্ব ভাষাগত অস্মিতা রক্ষার বিষয়টি বারবার উঠেছে। দক্ষিণের মানুষের কাছে তাঁদের ভাষা প্রাচীন ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মেরুদণ্ড। তাই দূরত্ব ঘোচাতে একতরফা সিদ্ধান্তের বদলে পারস্পরিক শ্রদ্ধার সেতুবন্ধন জরুরি।

উত্তর-পূর্ব ভারতের বিদ্যালয়গুলিতে ত্রি-ভাষা সূত্রের প্রয়োগ অনেক ক্ষেত্রেই ভারসাম্যপূর্ণ নয়। একাধিক ভাষার সমান গুরুত্ব ও সুযোগ দেওয়ার পরিবর্তে, অনেক সময় নির্দিষ্ট ভাষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, ফলে ত্রি-ভাষা সূত্রের মূল উদ্দেশ্য সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হয় না। বিদ্যালয়গুলিতে প্রথম ভাষা হিসেবে হিন্দি বা আঞ্চলিক ভাষা, দ্বিতীয় ভাষা ইংরেজি এবং তৃতীয় ভাষা হিসেবে সংস্কৃত, উর্দু বা নিকটবর্তী কোনও রাজ্যের ভাষা পড়ানো হয়। কিন্তু দ্রাবিড় ভাষা পরিবারের অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং প্রাচীন ভাষাগুলি— যেমন তামিল, তেলুগু, কন্নড় বা মালয়ালম— উত্তর–পূর্বের অধিকাংশ বিদ্যালয়ের পাঠক্রমে এখনও খুব সীমিত পরিসরে উপস্থিত। এর ফলে উত্তর–পূর্বের নতুন প্রজন্ম দক্ষিণ ভারতের বিপুল সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্পর্কে যথেষ্ট পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না, যা জাতীয় সংহতির পথে বড় অন্তরায়।

অথচ দক্ষিণের ভাষাগুলির সাহিত্যিক ও দার্শনিক মূল্য অপরিসীম। তামিল বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন জীবন্ত ধ্রুপদি ভাষা। এর ‘সংগম সাহিত্য’ এবং ‘তিরুক্কুরাল’ মানবজীবনের অমূল্য দলিল। পাশাপাশি কন্নড়, তেলুগু ও মালয়ালম ভাষারও নিজস্ব সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে। পম্পা, রন্ন কিংবা এজুথাচানের মতো মহাকবিদের সৃষ্টি ভারতীয় সাহিত্যভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে। এক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ নিজেও বহুভাষিক ভারতের এক গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। বাংলা ভাষা যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ থেকে মহাশ্বেতা দেবীর সাহিত্যধারাকে বহন করে চলেছে, তেমনই বাংলার শিক্ষার্থীদের কাছেও দক্ষিণের সাহিত্য পরিচিত হওয়া প্রয়োজন। এই ভাষাগত বিনিময় একমুখী নয়, পারস্পরিক হওয়াই বাঞ্ছনীয়।

নতুন জাতীয় শিক্ষানীতিতে বহুভাষিকতা ও নিজস্ব ভাষার প্রসারে জোর দেওয়া হয়েছে। এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করছে সঠিক বাস্তবায়নের ওপর। দক্ষিণের শিক্ষার্থীরা যেমন যোগাযোগের সুবিধার্থে হিন্দি বা ইংরেজি শেখে, উত্তর–পূর্বের শিক্ষার্থীদের জন্যও দক্ষিণের অন্তত একটি ভাষা শেখা আকর্ষক বিকল্প হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। দুই অঞ্চলের মধ্যে শিক্ষক আদানপ্রদান কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে, যা সংস্কৃতির জীবন্ত মেলবন্ধন ঘটাবে। বর্তমান ডিজিটাল যুগে ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাপ, অনলাইন কোর্স এবং প্রযুক্তির সাহায্যে ভাষাশিক্ষাকে আরও সহজ ও আকর্ষণীয় করে তোলা সম্ভব।

বিশ্বায়ন ও অভ্যন্তরীণ পরিযানের যুগে এই মেলবন্ধন অর্থনৈতিক দিক থেকেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ বা চেন্নাইয়ের মতো শহরগুলি প্রযুক্তি ও বাণিজ্যের মূল কেন্দ্র। দক্ষিণের ভাষা জানা থাকলে উত্তর–পূর্বের যুবসমাজের পেশাদারি যোগ্যতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। উন্নত অনুবাদের মাধ্যমে এই বিনিময় সাহিত্যের স্তরেও নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। ‘এক ভারত, শ্রেষ্ঠ ভারত’ স্লোগানকে বাস্তব রূপ দিতে হলে চাই অপরের ভাষার প্রতি আন্তরিক সম্মান। এক অঞ্চল অন্য অঞ্চলের ভাষা ও সাহিত্যকে যত বেশি করে জানবে, ভারতের বৈচিত্র্যের ভিত ততই শক্ত হবে।

(লেখক শিক্ষক, শিলিগুড়ি বাসিন্দা)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *