শুভময় মুখোপাধ্যায়
বাংলার রাজনীতিতে একটা অলিখিত নিয়ম যেন তৈরি হয়ে গিয়েছিল— সংখ্যালঘুরা যার, নবান্ন তার। কিন্তু ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন সেই চিরাচরিত সমীকরণটাকে একেবারে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। একসময়ের অপ্রতিরোধ্য তৃণমূল কংগ্রেস আজ মাত্র ৮০টি আসনে এসে ঠেকেছে। এই পতন কিন্তু একদিনে হয়নি বা এটি কোনও আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়। গত পনেরো বছর ধরে চলতে থাকা একপেশে তোষণ, লাগামহীন দুর্নীতি এবং কেবল ভোটব্যাংককে পুঁজি করে টিকে থাকার রাজনীতির এটা এক অনিবার্য পরিণতি। বাংলার বুকে দাঁড়িয়ে শাসকদলের একাংশ যেভাবে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে রাজ্যটার সার্বিক ভাবমূর্তি গোটা দেশের সামনে নষ্ট করেছে, সাধারণ মানুষ এবার ইভিএমের বোতামে তারই কড়া জবাব দিয়েছেন। শুধু তোষণ দিয়ে যে সব অংশের মানুষকে চিরকাল আটকে রাখা যায় না, নির্বাচনের এই ফলাফল সেটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।
তৃণমূলের এই টিকে থাকার লড়াইয়ে কারা আসলে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেটা বুঝতে গেলে আমাদের একটু গভীরে গিয়ে নিখাদ পরিসংখ্যানের দিকে তাকাতে হবে। এইবারের নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস রাজ্যের ২৯৪টি আসনের মধ্যে মাত্র ৪৭ জন মুসলিম প্রার্থীকে টিকিট দিয়েছিল। ফলতা কেন্দ্রের নির্বাচন বাতিল হওয়ায়, শাসকদলের মোট মুসলিম প্রার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৬। শতাংশের বিচারে যা তৃণমূলের মোট প্রার্থীর মাত্র ১৬ শতাংশ। কিন্তু চমকে দেওয়ার মতো বিষয় হল, এই ৪৬ জনের মধ্যে ৩৩ জনই অনায়াসে জয় ছিনিয়ে এনেছেন! অর্থাৎ, মুসলিম প্রার্থীদের ক্ষেত্রে তৃণমূলের স্ট্রাইক রেট প্রায় ৭২ শতাংশ। এবার বিধানসভার সার্বিক ছবির দিকে তাকানো যাক। তৃণমূলের মোট বিধায়ক সংখ্যা যেখানে ৮০, সেখানে ৩৩ জনই হলেন সংখ্যালঘু। সহজ কথায়, তৃণমূলের মোট শক্তির ৪১ শতাংশই এখন মুসলিম বিধায়কদের দখলে। এই তথ্য স্পষ্ট বুঝিয়ে দিচ্ছে, রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ ভোটাররা শাসকদলের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেও, যেটুকু মানরক্ষা হয়েছে, তা ওই নির্দিষ্ট ভোটব্যাংকের দৌলতেই। যারা ডেলিভার করার, তারাই করেছে; বাকিরা তৃণমূলকে কার্যত ছুড়ে ফেলেছে।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়, আসল চমক লুকিয়ে আছে অন্য পরিসংখ্যানে। তৃণমূলের এই ৮০টি জয়ের মধ্যে ৭৩টি আসনেই সংখ্যালঘু ভোটারের হার ২৫ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ, তৃণমূল যে আসনগুলোতে জিতেছে, তার ৯১ শতাংশই সংখ্যালঘু অধ্যুষিত। এই তথ্যগুলো কিন্তু শাসকদলের জন্য কোনও স্বস্তির খবর নয়, বরং গভীর উদ্বেগের। কারণ, প্রশ্ন ওঠা খুবই স্বাভাবিক যে, ওই ৭৩টি আসনে যদি সংখ্যালঘু ভোটারের সংখ্যা ২৫ শতাংশের কম হত, তাহলে কি তৃণমূল খাতা খুলতে পারত? রাজ্যজুড়ে এমন ১৪৬টি আসন রয়েছে যেখানে সংখ্যালঘু ভোটারের হার পঁচিশ শতাংশ বা তার বেশি। ২০২১ সালের নির্বাচনে তৃণমূল এর মধ্যে ১২৯টি আসন নিজেদের পকেটে পুরেছিল। আর এবার সেই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৭৩-এ। উলটোদিকে, গতবার এই আসনগুলোতে বিজেপি জিতেছিল মাত্র ১৬টিতে, এবার তারা অভাবনীয় ফল করে ৬৬টি আসন ছিনিয়ে নিয়েছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা তৃণমূল খেয়েছে সেই ১৭টি আসনে, যেখানে সংখ্যালঘু ভোটারের হার ৪০ শতাংশেরও বেশি, অথচ সেখানে পদ্মফুল ফুটেছে। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করছে যে, সংখ্যালঘু ভোট আর শাসকদলের একচেটিয়া পৈতৃক সম্পত্তি নয়।
মুর্শিদাবাদ, মালদা এবং উত্তর দিনাজপুরের মতো জেলাগুলো, যেগুলো একসময় তৃণমূলের অভেদ্য দুর্গ বলে পরিচিত ছিল, সেখানে এবার রীতিমতো ধস নেমেছে। মুর্শিদাবাদের কথাই ধরা যাক। মুসলিম অধ্যুষিত এই জেলায় ২২টি আসনের মধ্যে গতবার তৃণমূল পেয়েছিল ২০টি আসন। আর এবার তারা পেয়েছে মাত্র ৯টি। ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলে বিজেপিও পেয়েছে ৯টি আসন। মালদাতেও ১০টি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত আসনের মধ্যে তৃণমূল পেয়েছে ৬টি আর বিজেপি ৪টি। এই ধসের পেছনের মূল কারণ হল বিরোধী ভোটের বিভাজন। মানুষ বুঝে গিয়েছে, শুধু ধর্মীয় সুড়সুড়ি দিয়ে আর কতদিন চিঁড়ে ভিজবে! শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থানের মতো জ্বলন্ত ইস্যুগুলোকে দিনের পর দিন এড়িয়ে গিয়ে, সিন্ডিকেট আর তোলাবাজির দৌরাত্ম্যে রাজ্যে শিল্পের পরিবেশ নষ্ট হয়েছে। আর তারই ফলস্বরূপ, একদিকে যেমন হিন্দু ভোটের এক অভূতপূর্ব মেরুকরণ ঘটেছে, ঠিক তেমনই সংখ্যালঘু ভোটও ভাগ হয়েছে কংগ্রেস, সিপিএম, আইএসএফ এবং হুমায়ুন কবীরের মতো স্থানীয় নেতাদের দলের মধ্যে। ভাঙড়ে নৌশাদ সিদ্দিকী বা মুর্শিদাবাদে হুমায়ুন কবীরের জয় বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, মানুষ এখন অন্ধের মতো শাসকদলকে ভোট দিতে রাজি নয়। তাঁরা বিকল্প খুঁজছেন, তাঁরা নিজেদের রুটিরুজির কথা বলছেন।
গত এক দশক ধরে তৃণমূল কংগ্রেস যে মডেলের ওপর ভিত্তি করে রাজনীতি করে আসছিল, তার মেয়াদ যে ফুরিয়ে এসেছে, সেটা আজ দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। শুধু সংখ্যালঘু ভোটের ওপর নির্ভর করে, তাদের মধ্যে একটা কাল্পনিক ভয়ের সঞ্চার করে রাজনীতি করার দিন বোধহয় শেষ। নির্বাচনের ঠিক মুখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মন্তব্য করেছিলেন, ‘একটা কমিউনিটি যখন খেপে যাবে না, তেরোটা বাজিয়ে দেবে।’ এই মন্তব্যটিকে অনেকেই এই নির্বাচনের অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট বলে মনে করছেন। সাধারণ মানুষ, দলমতনির্বিশেষে এই ধরনের প্রচ্ছন্ন হুমকি বা ভয়ের রাজনীতিকে ভালোভাবে নেননি। উলটে এই মন্তব্য সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে এবং মেরুকরণের আগুনে ঘি ঢেলেছে। অন্যদিকে, সংখ্যালঘু সমাজও এখন অনেক বেশি বাস্তববাদী। তারা দেখছে যে, ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পরও তাদের আর্থসামাজিক অবস্থার কোনও বাস্তব উন্নতি হয়নি। শিক্ষা বা সরকারি চাকরিতে তাদের প্রতিনিধিত্ব সেই তিমিরেই রয়ে গিয়েছে। তাই নৌশাদ সিদ্দিকীর মতো তরুণ নেতারা যখন ধর্মের বাইরে বেরিয়ে অধিকার আর কর্মসংস্থানের কথা বলেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই সেইদিকে মানুষের ঝোঁক বাড়ে। আর ঠিক এখানেই তৃণমূলের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। তারা মানুষকে স্বাবলম্বী করার বদলে, চিরকাল ভাতা আর অনুদানের ওপর নির্ভরশীল করে রাখতে চেয়েছে।
যে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনাকে তৃণমূলের সবচেয়ে সুরক্ষিত গড় বলে মনে করা হত, সেখানেও এবার ফাটল ধরেছে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লোকসভা কেন্দ্র ডায়মন্ড হারবারের অন্তর্গত সাতগাছিয়া সহ মোট চারটি আসনে জয়লাভ করেছে বিজেপি। আইএসএফ গতবারের মতোই ভাঙড়ে তাদের জমি ধরে রেখেছে। এই সমস্ত ঘটনা প্রমাণ করছে যে, তৃণমূলের পায়ের তলার মাটি কতটা আলগা হয়ে গিয়েছে। একদিকে যেমন শাসকদলের ওপর থেকে সংখ্যালঘু সমাজের একাংশের মোহভঙ্গ হয়েছে, তেমনই অন্যদিকে রাজ্যের সার্বিক আইনশৃঙ্খলার অবনতি, নারী নির্যাতনের ঘটনা এবং লাগামহীন তোলাবাজিতে বীতশ্রদ্ধ হয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু ভোট একজোট হয়ে বিজেপির বাক্সে পড়েছে। রাজ্যের বেশকিছু এলাকায়, যেখানে মুসলিম ভোটের হার চল্লিশ শতাংশের কাছাকাছি, সেখানেও বিজেপির জয়লাভ এটাই প্রমাণ করে যে, শুধুমাত্র ধর্মীয় অঙ্কে আর নির্বাচন জেতা সম্ভব নয়। সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ আজ ব্যালট বাক্সে সুনামির আকার ধারণ করেছে।
এটা বলাই যায় যে, ২০২৬ সালের এই নির্বাচন বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক মোড় ঘোরানো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এটা শুধু তৃণমূল কংগ্রেসের একটা পরাজয় নয়, এটা অহংকার, দুর্নীতি, কর্মসংস্থানহীনতা এবং তোষণনীতির বিরুদ্ধে বাংলার মানুষের এক গর্জন। যে রাজ্য একসময় গোটা দেশকে নবজাগরণের পথ দেখিয়েছিল, সেই রাজ্যের নাম আজ নানা দুর্নীতির কারণে কালিমালিপ্ত হয়েছে— এই কলঙ্ক মোছার একটা মরিয়া চেষ্টা এই নির্বাচনের ফলাফলের মধ্যে দিয়ে প্রতিফলিত হয়েছে। শাসকদলের কাছে এই ফলাফল একটা চরম সতর্কবার্তা। তাদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ভোটব্যাংক আজ তাদের দিক থেকে মুখ ঘোরাতে শুরু করেছে। এই ক্ষরণ যদি তারা আটকাতে না পারে, তবে আগামী ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে তাদের জন্য যে আরও বড় রাজনৈতিক বিপর্যয় অপেক্ষা করে আছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলার মানুষ বুঝিয়ে দিয়েছে, তারা পরিবর্তন চায়, এবং সেই পরিবর্তনটা শুধুই কথার কথায় নয়, বরং কাজের মাধ্যমে। এখন দেখার বিষয়, শাসকদল এই ধাক্কা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের ভুলগুলো শোধরায়, নাকি সেই পুরোনো অহংকারের ঘেরাটোপেই নিজেদের রাজনৈতিক কবর খোঁড়া চালিয়ে যায়।
(লেখক রাজনৈতিক বিশ্লেষক)
