গৌতম সরকার
‘আজ খেলা ভাঙ্গার খেলা…।’ তবে আজ খেলাটা শুধু ভাঙানোর নয়, ভেঙে দেওয়ারও। অপারেশন লোটাস শুধু দল ভাঙায় না, ভেঙেও দেয়। চিত্রনাট্যটি নিখুঁত। রাজপাটে বসার পর থেকে শুভেন্দু অধিকারীর মুখে বারবার আস্ফালন ছিল- তৃণমূলের নাম-নিশান রাখব না। সেই আস্ফালন কার্যকর হল জ্ঞানেশ কুমারের নির্দেশিকায়। তৃণমূলের না রইল আসল নাম, না থাকল নিশান। নাম ও প্রতীক- দুই-ই চলে গেল নির্বাচন কমিশনের ঠান্ডাঘরে।
‘না রহে বাঁশ, না বাজে বাঁশরী…।’ মণিহারা ফণী যেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নির্বাচনি খেলায় তাঁর অস্তিত্বের প্রতীক ‘জোড়াফুল’টাই আর নেই। মমতা ও জোড়াফুল সমার্থক ছিল বাংলায় ভোটের কারবারে। ২৮ বছর আগে নিজের হাতে আঁকা এই প্রতীকটি ছিল তৃণমূল নেত্রীর আবেগের ধন। সেটা শুধু নয়, দলের প্রকৃত নামটাও নির্বাচন কমিশনের সিন্দুকবন্দি করে রেখে দিলেন জ্ঞানেশ কুমার।
শুভেন্দুর মনোবাঞ্ছা ও ‘শপথ’ পূর্ণ হল নির্বাচন কমিশনের কার্যকলাপে। তৃণমূলের আদত নাম ও নিশান রইল না। এর আগে শিবসেনাকে দু’ভাগ করার পর প্রকৃত প্রতীক শিন্ডেদের দিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি (এনসিপি) বিভাজনের পর শারদ পাওয়ারের হাত থেকে ঘড়ি কেড়ে তাঁর ভাইপো প্রয়াত অজিত পাওয়ারকে দেওয়া হয়েছিল। তৃণমূলের কোনও শিবিরের সেই সৌভাগ্য হল না।
সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস শব্দটি থেকে গেলে যে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নাম ও নিশানা মুছে দেওয়ার সাধ পূর্ণ হয় না। প্রায় ৪২ শতাংশ ভোট যাদের ঝুলিতে, তাদের নাম ও প্রতীক- দুটিই ভয়ের বিষয়। ফলে নাম-নিশান উধাও করে দেওয়ার এই চিত্রনাট্য ছিল বাংলার অপারেশন লোটাস-এ। তাতে কমিশনের জড়িয়ে পড়াটা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। নরেন্দ্র মোদির জন্মদিনে বাংলায় হল দল ভেঙে দেওয়ার সফল অপারেশন।
প্রশ্ন জাগবে, ভাঙানো ও ভেঙে দেওয়ার মধ্যে কী আর ফারাক! দুটি তো একই। সূক্ষ্ম মনে হলেও বাস্তবে ফারাকটা মারাত্মক। ভাঙানো হলে বদনাম কুড়োনোর ঝুঁকি থাকে। ভাবমূর্তি হারানোর আশঙ্কা থাকে। এমনকি নিজের শিবিরে ক্ষোভ, অসন্তোষ তৈরির সম্ভাবনা তৈরি হয়। যে কারণে দলের দরজায় এসে হত্যে দিয়ে বসে থাকলেও লোকসভার ২০ জন তৃণমূলছুট সাংসদকে সরাসরি গ্রহণ করছে না বিজেপি নেতৃত্ব। এই ২০ জনকে নিলে পদ্মের অন্দরে ক্ষোভ সামাল দেওয়া মুশকিল হবে।
তাই তাঁদের গোপন উদ্দেশে আগাম তৈরি করে রাখা নাম-গোত্রহীন এনসিপিআই-এ ঠাঁই করে দেওয়া হয়েছে। গোদা বাংলায় যাকে বলে এঁটো করে রাখা। না ঘরকা, না ঘাটকা। এমন পরিস্থিতি তৈরি করা যাতে এঁদের যাওয়ার কোনও জায়গা না থাকে। ‘এমনি করেই যায় যদি দিন যাক না। মন উড়েছে উড়ুক না…।’ কখনও প্রধানমন্ত্রী প্রাতরাশে ডাকছেন বলে, কখনও নবান্নের ডাক পেয়ে নিজেদের কেউকেটা ভাবার সুযোগ তো দেওয়া হল।
শমীক ভট্টাচার্য তাঁদের বিজেপিতে নেওয়া হবে না বলে যতই চ্যাঁচান, এই ২০ জনের অধিকাংশ জােনন, পদ্মাশ্রয়ী না হলে তাঁদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। ২০২৯-এর লোকসভা নির্বাচন এসে গেলে এই ২০ জন ‘শের বন যায়গা চুহা।’ তখন এঁদের না থাকবে একা জেতার ক্ষমতা, না থাকবে অন্য দলে যাওয়ার সুযোগ। এঁদের বিশ্বাসযোগ্যতা তলানিতে ঠেকিয়ে দেওয়া তৃণমূলকে ভেঙে দেওয়ার আরেক লক্ষ্য।
বিজেপিতে না হোক, দিল্লিতে ২০ সাংসদকে এনডিএ-তে ঠাঁই দেওয়া হয়েছে। এনডিএ-র মিটিংয়ে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রথম সারিতে বসার সুযোগ পেয়ে কাকলি ঘোষদস্তিদাররা সমাজমাধ্যমে সেই ছবি দিয়ে আত্মশ্লাঘা অনুভব করেন। অপারেশন লোটাসের ফাঁদে বন্দি সাংসদদের এভাবে হয়তো সান্ত্বনা বোধ হয়। বাংলায় অবশ্য দল ভাঙানোর ছকটা অন্যরকম। তৃণমূল ভেঙে দিতে এখানে কাউকে বিজেপি দূরে থাক, এনডিএ-তে জায়গা দেওয়া হয়নি।
মমতার বেছে দেওয়া লোকদের বদলে বাংলার প্রায় ৬০ জন বিধায়ককে বিরোধী আসনে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুভেন্দুর মন্ত্রীসভা গঠনের পরপরই নয়াদিল্লিতে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ‘সৌজন্য সাক্ষাৎ’ এবং তারপর অসম্ভব দ্রুততার সঙ্গে অধ্যক্ষের কাছে মমতা শিবিরের সই জালের অভিযোগ ঋতব্রতের পৌঁছানো এবং ৬০ জন বিধায়কের গোষ্ঠীকে বিধানসভায় স্বীকৃতি- সবই নাম ও নিশানা মুছে ফেলার চিত্রনাট্য।
কাগজে-কলমে পক্ষে নয় ঠিকই, কিন্তু আদতে বিপক্ষেও নয় এই বিরোধী শিবির। ট্যাঁ-ফোঁ করলে ববি হাকিমকে বিধানসভাতেই হুমকি দিতে পিছুপা হন না মুখ্যমন্ত্রী। দল ভাঙানোর খেলায় বাইরে থেকে লোভ ও টোপ দিয়ে বা ভয় দেখিয়ে কাজ হাসিল হয়। ভেঙে দেওয়ার লক্ষ্যে টার্গেটের দলটির ভেতরে এজেন্ট ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। যাঁদের কেউ দুর্নীতিতে অভিযুক্ত, কারও বিরুদ্ধে অসততার অভিযোগ। কারও বেআইনি সম্পত্তি বাঁচানোর তাগিদ।
এসব কারণে গ্রেপ্তারির খাঁড়া তাঁদের মাথার ওপর। সেজন্য এজেন্ট পেতে অসুবিধা হয়নি অপারেশন লোটাসে। অনিয়ম, কেলেঙ্কারি, অপরাধ ইত্যাদিকে প্রশ্রয় দিয়ে গত ১৫ বছরে নিজের দলের অবলুপ্তির এই মৃত্যুফাঁদটা অবশ্য তৈরি করে রেখেিছলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই। সেই অর্থে অপারেশন লোটাসে পরোক্ষে তাঁরও ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। অপারেশন লোটাসের ভয়ংকর কৌশলী ধাক্কায় নিজের হাতে গড়া দল, নিজের হাতে আঁকা প্রতীক মমতার হাতছাড়া।
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী পর্বে ও নির্বাচনি প্রচারে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ভ্যানিশ কুমার বলে বিদ্রুপ করতেন মমতা। জ্ঞানেশ শেষপর্যন্ত মমতার দলের নাম ও প্রতীকই ভ্যানিশ করে দিলেন। শুভেন্দুর ইচ্ছা ও জ্ঞানেশের কর্মকাণ্ড একবিন্দুতে মিলে গেল।

