গ্রাম হাতে রইলেও শহর হারাচ্ছে তৃণমূল

গ্রাম হাতে রইলেও শহর হারাচ্ছে তৃণমূল

ব্লগ/BLOG
Spread the love


রূপায়ণ ভট্টাচার্য

আলো, আলো এবং আলো। বিকেলকে সরিয়ে কলকাতার রাস্তায় সন্ধে হাজির হলে চারদিকে এখন আলো। এই ঔজ্জ্বল্য সব সময় আলোর রিভলভার হাতে নির্জনতাকে চড়া গলায় বলে চলে, ‘হ্যান্ডস আপ। দূর হটো।’ তার আলো চাই, আলো।

শহরকে আলোর মালা পরিয়ে দেওয়ার পেছনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) পুরপিতাদের হাত রয়েছে অনেকটাই। নদীতীর জেগে উঠেছে আলোয়, হাসপাতালের গেটে আর আগের মতো শবদেহ বহনের খাটের পাহাড় নেই। বুক ছ্যাঁৎ করে ওঠে না আগের মতো। বিশাল গেট মনে করায় কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশদ্বারগুলোকে।

এবং এই ঝকঝকে দৃশ্যাবলিই শেষকথা নয় ভোটের বঙ্গ-রঙ্গবাজারে। যেখানে সবকিছু ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠছে হিন্দু-মুসলিম, বাঙালি-অবাঙালি লড়াই, যার তীব্রতা আগে দেখেনি বাংলা। এই বাংলা আর সেই বাংলা নেই। যে ধর্ম না মানা, জাতপাত না মানা, সব সম্প্রদায়কে সমান গুরুত্ব দেওয়া আধুনিকমনস্ক বাংলাকে সমীহ করত বাকি ভারত।

এসবের মাঝে পরিস্থিতি মনে করিয়ে দিচ্ছে বামফ্রন্ট সরকারের শেষ দিকের পরিস্থিতি। যখন কলকাতা সমেত অধিকাংশ শহর ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল শাসকদের উপরে। শাসকের ঔদ্ধত্য, দুর্নীতি এবং দলবাজি ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল জনতাকে। অথচ বাম শাসক রাজ্যের ক্ষমতায় থেকে যেত গ্রামের ভোটের জোরে। গ্রাম দিয়ে শহর ঘিরে ফেলার কথা প্রথমে বলতেন নকশাল নেতারা। এখন বলছেন অনেকেই। অনেকটা ওই স্টাইলেই বিমান বসু বা অনিল বিশ্বাসরা বাংলা শাসন করতেন।

সোশ্যাল মিডিয়ায় (Social Media) শহুরে মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখলে বোঝা যায়, তৃণমূলের নেতা-মন্ত্রীদের ওপর কতটা ক্ষুব্ধ জনতার একটা বড় অংশ।

বাম আমলে বিরক্ত মানুষের হাতে বিকল্প অস্ত্র ছিল মমতা। এখন সমস্যা হল, মমতার নির্দিষ্ট বিকল্প বলে কিছু নেই। বিজেপি এক যুগ কেন্দ্রে থেকেও নতুন কোনও আলো দেখাতে পারেনি দেশকে। বরং চারদিকে ঘৃণার বাতাবরণে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি শব্দটি উধাও রাতারাতি। বাংলাতেও বিজেপি এবং তৃণমূল নেতাদের মধ্যে কোনও ফারাক নেই।

দ্বিতীয় বিকল্প সিপিএম নেতৃবিহীন, সংগঠনবিহীন‌। এখন দ্বিতীয় অঙ্কের সংখ্যার আসন পেলেই নিজেদের ধন্য মনে করবে। সিপিএম নেতা এবং সমর্থকরা মিডিয়ার ওপর প্রচণ্ড অসন্তুষ্ট, তারাই নাকি বাইনারি তত্ত্ব চালু করেছে! শুধু তৃণমূল এবং বিজেপিকে (BJP) রেখেই চলছে নির্বাচনের অঙ্ক, এই প্রশ্নটা সোশ্যাল মিডিয়ায় বারবার তুলে ধরছেন বাম সমর্থকরা।

অথচ মনে মনে তাঁরা জানেন, বিধানসভার লড়াইটা সত্যি সত্যি দ্বিপাক্ষিক। সেই লড়াইয়ে অস্তিত্ব নেই সিপিএম বা কংগ্রেসের। তাই বামের বহু সমর্থকই ভোটটা দিয়ে আসবেন রামে, শুধু তাদের ১৫ বছর আগে ক্ষমতাচ্যুত করে ফেলা মমতাকে ক্ষমতা থেকে সরানোর স্বপ্নে। চুলোয় যাক ইন্ডিয়া জোটের তত্ত্ব। এবং এঁদের ৯০ ভাগ শহুরে ভোটার। যাঁরা সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘চটি চাটা’ এবং ‘পিসি-ভাইপো’ লিখে ভরিয়ে দেন বারবার। তাতেই যত রাজ্যের আত্মতৃপ্তি! পাশাপাশি হিন্দুত্বের ভাবনাও তাঁদের মনে বাসা বেঁধেছে!

দিল্লির রাজনীতি ধরলে তৃণমূল (TMC) ও সিপিএম একদিকে, ইন্ডিয়া জোটে। কিন্তু বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি দেখলে তা মনে হওয়ার উপায় নেই। আপনি চূড়ান্ত বিভ্রান্ত হয়ে পড়বেন, হচ্ছেটা কী?

অবশ্যই এমনিতে ইন্ডিয়া জোট এক বিভ্রান্ত, ভাঙা, ফুটো নৌকার মতো। যেখানে শারদ পাওয়ারই বিজেপির দিকে ঝুঁকে পড়েছেন নিজস্ব স্বার্থে।

তিনি লালুপ্রসাদ যাদবের মতো আজীবন সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরোধী হতে পারলেন না। কেজরিওয়াল বেপাত্তা। কংগ্রেস-এসপি মসৃণ বোঝাপড়াও নেই আর।

এখনও পর্যন্ত মনে হচ্ছে, ইন্ডিয়া জোট শুধু নামেই। এবং সেটা খরচের খাতায়। গঙ্গা-যমুনার জলে ভেসে গিয়েছে কোথায়! স্থপতিরাই ভুলে গিয়েছেন সন্তানকে! বাংলার নির্বাচনে এই শব্দটির হদিসও পাবেন না আর। সেই ঘুরেফিরে আসছে দিদি বনাম মোদি। গত দশ বছরের মতো।

বিজেপি আবার আরেকটা নির্বাচন লড়তে চলেছে নরেন্দ্র মোদিকে সামনে রেখেই। এখনও তাদের মুখ্যমন্ত্রিত্বের নিশ্চিত কোনও মুখ উঠে আসেনি।

শুভেন্দু, শমীক, দিলীপ বা সুকান্তরা যত এই পদের জন্য লড়বেন, ততই একেবারে অনামী কারও মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে বিজেপি জিতলে। এটাই মোদি-শা’র নতুন পছন্দের খেলা। ওডিশা বা ছত্তিশগড় বা রাজস্থানের ক্ষেত্রে যা দেখা গিয়েছে। বা একেবারেই হাল আমলে বিজেপির জাতীয় সভাপতি বাছার ক্ষেত্রেও তো এক ব্যাপার। কথা বললে এক ঝলকে বোঝা যায়, আম বিজেপি কর্মীরা এ ব্যাপারে মারাত্মক বিভ্রান্ত। তৃণমূলের ক্ষেত্রে যা একেবারে উলটো। কর্মীরা জানেন, দিদি আছেন।

দিদি, দিদি।

দুটো পার্টিরই নীচুতলার নেতারা চুরিবিদ্যা থেকে সরে আসেননি। ক’দিন আগে চোখে পড়ল, বিজেপির এক নেতা ট্রেন থেকে কম্বল চুরি করে চলে যাচ্ছেন। দু’দিন পরেই আবার দেখা গেল, তৃণমূলের এক নেতা শীতে কষ্ট পাওয়া গরিবদের জন্য বরাদ্দ কম্বল থেকে কম্বল চুরি করছেন। নির্বাচন এগিয়ে আসছে, কোথায় সতর্ক হবেন, তা নয়! এঁদের চুরিচামারি, অসততা আরও খুল্লম খুল্লা।

নির্বাচনের আগে যা হয়ে থাকে, দুই বড় পার্টিতে শুরু হয়ে গিয়েছে ইতিমধ্যেই। প্রার্থী হতে ইচ্ছুক অনেকেই টাকা ছড়াতে শুরু করেছেন এলাকায়। আমি প্রার্থী হব, আমি প্রার্থী হব— এই স্লোগানটা এলাকায় ছড়াতে শুরু করেছেন অনুগতদের মাধ্যমে। চেষ্টা চলছে পার্টির সর্বোচ্চ স্তরে নিজের ইচ্ছেটাকে পৌঁছে দেওয়ার।

সেখানেও চলছে টাকার খেলা। অনেক নেতা এই লোকগুলোর টাকা নিয়ে কলকাতা বা দিল্লিতে তাঁবেদারি করতে যাচ্ছি বলে নিজেই মেরে দিচ্ছেন টাকা। হঠাৎ ভ্যানিশ। তলে তলে অনেক খেলাই চলছে, নিজের পার্টির লোককে বেকুব বানানোর জন্য। সর্বত্র। ঠিক এই জায়গাতে এসে গ্রাম এবং শহর একাকার হয়ে যাচ্ছে আবার।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *