কাপের মুঠোয় বিশ্ব, যুদ্ধ আবহে ফুটবলের মহারণ, শুরু রাতজাগা

কাপের মুঠোয় বিশ্ব, যুদ্ধ আবহে ফুটবলের মহারণ, শুরু রাতজাগা

রাজ্য/STATE
Spread the love


বিফোর শাভালালা’জ রকেট ফ্রম লেফট ফুট, বিফোর পিটার ড্রুরি’জ আইকনিক কমেন্ট্রি, বিফোর শাকিরা’জ ওয়াকা ওয়াকা, দেয়ার ওয়াজ ফিলিপ। 

আজ থেকে ষোলো বছর পূর্বের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম‌্যাচ নিয়ে বুধবার অপূর্ব একখানা লেখা বেরিয়েছে বিলিতি কাগজে। ভদ্রলোক ব্রিটিশ সাংবাদিক। তা, ফিলিপ বলে যাঁর নাম লেখায় বারবার ফিরে এসেছে, পুরোটা পড়ে তাঁকে জলজ‌্যান্ত মনুষ‌্য বলে মনে হল না। যদ্দূর বুঝলাম, ফিলিপ নামটা দক্ষিণ আফ্রিকার আত্মার রূপকার্থে ব‌্যবহৃত! শাভালালার গোলের পর যাঁর কানে ফিসফিসিয়ে লেখক বলেছিলেন, ‘‘ফিল ইট। ইট ইজ হিয়ার!’’

আরও পড়ুন:

ফিল ইট, ইটস হিয়ার এগেইন! মানবসভ‌্যতা, পারলে অনুভব করে। অনুধাবন করো তার মায়া। অপার সৌন্দর্য। কুহক। ব‌্যস্ততার দোর খুলে দেখো, সে এসেছে, এসেছে আবার, বছর চার পর। ফিল ইট, ইফ ইউ ক‌্যান!

এ লেখার ‘সূচিপত্রে’ ষোলো বছরের পুরনো দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম‌্যাচের স্মৃতি-বাক্স ঝেড়েঝুড়ে টেনে বার করার প্রয়োজন আছে। প্রথমত, সেবারের মতো এবারও বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম‌্যাচ একই, সেই দক্ষিণ আফ্রিকা বনাম মেক্সিকো! ফুটবল বিশ্বকাপের ছিয়ানব্বই বছরের ইতিহাসে যা কখনও হয়নি, বিষ‌্যুদবার তাই হচ্ছে। হবে। পুরনো এক ফুটবল বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম‌্যাচ ফিরে আসছে নতুন এক ফুটবল বিশ্বকাপে। পার্থক্যের মধ্যে জোহানেসবার্গের বদলে খেলাটা শুধু ইতিহাসের অ‌্যাজটেকা স্টেডিয়ামে।

ফুটবল বিশ্বকাপের ছিয়ানব্বই বছরের ইতিহাসে যা কখনও হয়নি, বিষ‌্যুদবার তাই হচ্ছে। হবে। পুরনো এক ফুটবল বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম‌্যাচ ফিরে আসছে নতুন এক ফুটবল বিশ্বকাপে। পার্থক্যের মধ্যে জোহানেসবার্গের বদলে খেলাটা শুধু ইতিহাসের অ‌্যাজটেকা স্টেডিয়ামে।

ষোলো বছর এপার-ওপারের দুই বিশ্বকাপের পারিপার্শ্বিকেও কি তার বাইরে কোনও সাযুজ‌্য নেই (উঁহু, শাকিরার থিম সং-টংয়ের কথা বলছি না। তবে তথ্যের খাতিরে লিখি, এবারও তিনিই গাইছেন। গানের নাম ‘দাই, দাই’)? গা সেঁটে নেই ষোলো বছরের পুরনো ছমছমে অনিশ্চয়তা? আছে, আছে, আলবাত আছে! সাউথ আফ্রিকার নাম ২০১০ বিশ্বকাপ আয়োজক হিসেবে ঘোষণার পর, সমগ্র পৃথিবী ফিফার সিদ্ধান্তের পাশে একটা বদখত প্রশ্নচিহ্ন সজোরে বসিয়ে দিয়েছিল। উদ্বিগ্ন ভাবে বলেছিল, যে দেশে অপরাধ এক জনপ্রিয় ‘পেশা’, যে দেশে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট দুর্দশাগ্রস্ত, যে দেশের স্টেডিয়াম পাতে দেওয়ার মতো নয়, তারা আয়োজন করবে বিশ্বকাপ?

আমেরিকার সে চিন্তা নেই। প্রথম বিশ্বের ‘বড়দা’ তারা। তারাই আইন। তারাই আদালত। তারাই দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। ভুবনের অর্ধেক চলে তাদের ‘অঙ্গুলিহেলনে’। ঝঞ্ঝাট অন‌্যত্র। বিশ্ব-রাজনীতির যে ন‌্যক্কারজনক নাগপাশে প্রতিনিয়ত বন্দি হচ্ছে আমেরিকা, শেষ পর্যন্ত তারা পারবে ফুটবলের ‘আতর’-কে রক্ষা করতে? পারবে তারা বিশ্বব‌্যাপী ফুটবল-জনতাকে খেলার মন্দিরে নিয়ে আসতে? ষোলো বছর আগে বিশ্বকাপ আয়োজন করে দেশ হিসাবে জিততে পারেনি দক্ষিণ আফ্রিকা। কিন্তু নানা প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে লড়ে ফুটবলকে জিতিয়ে দিয়েছিল। আমেরিকা দেশ হিসাবে জিতে গিয়েছে বহু, বহু আগে। কিন্তু ট্রাম্পের দেশ পারবে ফুটবলকে জেতাতে?

ষোলো বছর আগে বিশ্বকাপ আয়োজন করে দেশ হিসাবে জিততে পারেনি দক্ষিণ আফ্রিকা। কিন্তু নানা প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে লড়ে ফুটবলকে জিতিয়ে দিয়েছিল। আমেরিকা দেশ হিসাবে জিতে গিয়েছে বহু, বহু আগে। কিন্তু ট্রাম্পের দেশ পারবে ফুটবলকে জেতাতে?

অথচ এবার কাপ-মন্দিরে দেবতা কত! শত-শত। নতুন। পুরনো। নবীন। প্রবীণ। লিওনেল মেসি। মাইকেল ওলিসে। ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। লামিন ইয়ামাল। ফ্লোরিয়ান উইর্ৎজ। নেমার। লুইস দিয়াজ। আর্লিং হালান্ড। জামাল মুসিয়ালা। কিলিয়ান এমবাপে। এনড্রিক। আশরাফ হাকিমি। হ‌্যারি কেন। কোচদের দ‌্যুতিও চোখধাঁধানো। লিওনেল স্কালোনি। দিদিয়ের দেশঁ। লুইস দে লা ফুয়েন্তে। জুলিয়ান নাগেলসম‌্যান। টুমাস টুখেল। এবং ‘দ‌্য ডন’! মিস্টার কার্লো আন্সেলোত্তি। প্রথম, এই প্রথম ব্রাজিল বিদেশি কোচের অধীনে বিশ্বকাপ খেলতে নামছে! কিন্তু কোথায়, এঁরা সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেও আমেরিকা বিশ্বকাপকে রাজনীতি-মুক্ত করতে পারছেন না!

ওহ্, সরি। বৃহস্পতিবার থেকে কাগজে-কলমে তিন দেশে শুরু হচ্ছে ফুটবল বিশ্বকাপ। আমেরিকা। মেক্সিকো। কানাডায়। আজ প্রথম খেলা মেক্সিকোয়। ঝুটঝামেলা মেক্সিকোতেও চলছে। বুধবারই ‘প্রোটেস্ট’ হয়ে গেল একদফা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় তা নগণ‌্য মাত্র। যুদ্ধের ময়দানে ইরান-আমেরিকা শুম্ভ-নিশুম্ভ দশা, কহতব‌্য নয়। এ দিন দেখলাম, ইরানি সেনারা মার্কিনি অ‌্যাপাচে হেলিকপ্টার উড়িয়ে দেওয়ার পর কেমন নত‌ুন উদ‌্যমে পারস্যের উপর যুদ্ধাস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে ওয়াশিংটন। এবং নিউটনের ‘থার্ড ল’ অনুসরণ করে তার প্রত‌্যুত্তরও চলছে। ইরানের ক্রীড়ামন্ত্রী আহমেদ দোঞ্জামালি স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, আগামী ১৫ জুনের লস অ‌্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়ামে নিউজিল‌্যান্ড ম‌্যাচের সময় যদি সরকার-বিরোধী কাউকে স্লোগান দিতে দেখেন, সোজা খেলা বন্ধ! টিম বেরিয়ে যাবে! শুধু তাই নয়, লস অ‌্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়ামে ইরানি সমর্থকদের ইসলামি পতাকা নিয়ে ঢুকতে দিতে হবে। পুরনো পার্সিয়ান পতাকায় অনুমতি দিলে চলবে না! ফিফাকে নাকি সমস্ত জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা শর্তাবলি মানলে ভালো। নইলে নিকুচি করেছে বিশ্বকাপের!

ইরানের ক্রীড়ামন্ত্রী আহমেদ দোঞ্জামালি স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, আগামী ১৫ জুনের লস অ‌্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়ামে নিউজিল‌্যান্ড ম‌্যাচের সময় যদি সরকার-বিরোধী কাউকে স্লোগান দিতে দেখেন, সোজা খেলা বন্ধ! টিম বেরিয়ে যাবে!

আর একা ইরানি আস্ফালনে আমেরিকা যে ব‌্যতিব‌্যস্ত, মোটেও নয়। সোমালিয়ার রেফারি ওমর আরতানকে ‘অর্ধচন্দ্র’ দেওয়ার পরিণতি রন্ধ্রে-রন্ধ্রে টের পাচ্ছে তারা। মোগাদিসু জনতা মার্কিন-বিতাড়িত ঘরের ছেলেকে নায়কের মর্যাদায় বরণ করে নিয়েছে। জার্মানির জনৈক এক ফুটবল-কর্ত্রী দেখলাম, ওমর-কাণ্ড নিয়ে তীব্র আক্রমণ করেছেন আমেরিকাকে। বলেছেন, ‘‘ফুটবলের ঘোর অপমান করে ছাড়ল ওরা।’’ আনুষঙ্গিক হিসাবে, অমুকের ভিসা ব‌্যান, তমুকের হাঁটায় বারণ– এ সমস্ত খুচরো বিষয় না হয় ছেড়েই দেওয়া গেল।

তবু দিন শেষে খেলাটার নাম যে ফুটবল। যা প্লেয়ারের পায়ে-পায়ে ঘোরার ফাঁকে অজান্তে হৃদয়হরণে সিদ্ধহস্ত। তাই কোথাও গিয়ে আস্থা আছে। বিশ্বাস আছে। ভরসা আছে। আচ্ছা, ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো মাঠে নামলে সবুজ গালিচায় আগুন ধরবে না? বল নিয়ে লিওনেল মেসি ছুটলে দুনিয়া দুলবে না? নেইমার খেললে সৃষ্টি হবে না ছোট-ছোট পদ‌্য, বিশ্ব-রাজনীতির গদ‌্যকে হারিয়ে? এঁরা যে প্রত্যেকে এক-একজন ‘শেষের কবিতা’। বিশ্বমঞ্চে যাঁদের ফুটবল-স্ফূরণের এবারই শেষ। শেষ বারের মতো।

অগত‌্যা, রাজনীতিকে মারো গুলি, চালাও টিভি। আজ থেকে রাতে জাগো, ভোরে ওঠো। প্রাণভরে নাও ফুটবলের ঘ্রাণ। হে বিশ্ব, আবার সে সময় আগত। আজ থেকে দেড় মাস ফুটবলই তোমার ‘ঈশ্বর’, ফুটবলই পৃথিবী, ফুটবলই ভালোবাসা!

আজ বিশ্বকাপে
মেক্সিকো বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা
অ‌্যাজটেকা স্টেডিয়াম, রাত ১২.৩০
ইউনাইট এইট স্পোর্টস

আরও পড়ুন:

সর্বশেষ খবর

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *