(আজ হিরোশিমা দিবসের বার্তা : প্রতিশোধ নয়, স্মৃতিই আজও মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় শান্তির শিক্ষা।)
সঞ্জিত সাহা
পৃথিবীতে এমন অনেক শহর আছে, যাদের ইতিহাস জাদুঘরে বন্দি থাকে। আবার এমন কিছু শহর আছে, যাদের ইতিহাস কোনও প্রদর্শনীর কাচের বাক্সে নয়, মানুষের হাঁটার ভঙ্গিতে, নীরবতার ওজনে, নদীর জলের প্রতিফলনে, আর শিশুদের হাতে ধরা একটি ভাঁজ করা সাধারণ কাগজের পাখির মধ্যে প্রতিদিন নতুন করে বেঁচে ওঠে। হিরোশিমা সেই দ্বিতীয় শহরগুলোর একটি। এখানে পৌঁছালে প্রথম বিস্ময়টি এই নয় যে পৃথিবীর প্রথম পারমাণবিক বোমার স্মৃতি এখনও টিকে আছে। বিস্ময় এই যে, এত গভীর ক্ষত বুকে নিয়েও একটি শহর কী অসাধারণ সংযমে নিজেকে প্রতিদিন স্বাভাবিক মানুষের শহর হিসেবে বাঁচিয়ে রাখতে পারে।
সকালবেলা হিরোশিমার আলো তখনও পুরোপুরি তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠেনি। নদীর ওপর হালকা কুয়াশার মতো এক স্তর আলো ভেসে বেড়াচ্ছে। ট্রাম তার চিরচেনা ছন্দে শহরটিকে কেটে এগিয়ে চলেছে। অফিসগামী মানুষদের মুখে কোনও নাটকীয় বিষণ্ণতা নেই। পথের ধারে ফুটে থাকা ফুলগুলোকে দেখে বিশ্বাসই হয় না, এই শহরের মাটিই একদিন মানুষের ছায়াকে পাথরের গায়ে পুড়িয়ে আগুনের ছবি এঁকে রেখেছিল। যেন শহরটি নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সে তার ক্ষতকে প্রদর্শনী বানাবে না। সে নতুন করে বাঁচবে, কিন্তু ভুলবে না। শান্তি উদ্যানে পৌঁছালে পৃথিবীর নানা দেশের মানুষের ভিড়, অগাস্টের তপ্ত গরম, অসংখ্য পতাকা আর নানা ভাষার উচ্চারণের মধ্যেও সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে নীরবতার ভাষা। যুদ্ধের পরে মানুষ সম্ভবত এ ভাষাটিই সবচেয়ে আগে শেখে।
এই নীরবতার মাঝখানে আকাশের দিকে দু’হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছে একটি ছোট্ট ব্রোঞ্জের মেয়ে। তার মাথার ওপরে বিশাল কাগজের সারস। চারপাশে কাচঘেরা দীর্ঘ সারিতে স্তূপ হয়ে রয়েছে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা শিশুদের হাতে ভাঁজ করা লক্ষ লক্ষ রঙিন কাগজের সারস। মনে হয়, প্রতিটি শিশুই যেন জানত, তার ভাঁজ করা পাখিটি কেবল একটি স্মৃতিস্তম্ভে রাখা হবে না, পৌঁছে যাবে এক অসুস্থ মানবসভ্যতার কাছে।
প্রতি বছরের ৬ অগাস্ট এই প্রাঙ্গণ নতুন অর্থ পায়। সাদা পোশাক পরা স্কুল পড়ুয়া ছেলেমেয়েরা শত শত কাগজের সারস নিয়ে আসে। তারা গান গায়, প্রার্থনা করে, কবিতা পড়ে। পৃথিবীর নানা দেশের অতিথিরা ফুলের পাশাপাশি কাগজের সারসও রেখে যান। রাজপথে চেনা-অচেনা মানুষ একে অপরকে সারস বিলি করে, বুদ্ধের বাণী সংবলিত পুস্তিকা বিতরণ করে। এখানে কেউ কাউকে ঘৃণা করতে শেখায় না। কোনও বক্তৃতা প্রতিশোধের ভাষায় শেষ হয় না। এই শহর তার সবচেয়ে বড় শিক্ষাটি রক্ত দিয়ে শিখেছে। ঘৃণা আর একটি যুদ্ধের জন্ম দিতে পারে, কিন্তু শান্তির জন্ম দেয় না।
ব্রোঞ্জের মেয়েটির পাদদেশে উৎকীর্ণ কয়েকটি শব্দ পড়ে মনে হয়, এগুলো যেন কোনও ভাস্করের লেখা নয়, সেইসব মায়ের দীর্ঘশ্বাস, যাঁরা সন্তানকে কবর দিয়েও ঠিকমতো কাঁদার সময় পাননি। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেও প্রথমে বুঝতে পারিনি, কেন এই একটি মেয়ের জন্য পৃথিবীর এত শিশু প্রতি বছর কাগজের পাখি পাঠায়। উত্তরটি লুকিয়ে আছে সময়ের এমন এক নিষ্ঠুর পরিহাসে, যার তুলনা মানবসভ্যতার ইতিহাসে খুব কমই আছে।
১৯৫৫ সালের এক সাধারণ সকাল। যুদ্ধ শেষ হয়েছে প্রায় দশ বছর আগে। হিরোশিমা আবার স্কুলের ঘণ্টা শুনতে শিখেছে। সেই সকালেই স্কুলের ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় দৌড়াতে নেমেছিল এক কিশোরী। তার নাম সাদাকো সাসাকি। সহপাঠীরা বলত, একদিন সে নিশ্চয়ই বড় প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে। কিন্তু দৌড়োতে দৌড়োতেই পৃথিবী ঝাপসা হয়ে গেল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। অনেক পরীক্ষার পর ডাক্তাররা জানালেন, তার লিউকেমিয়া হয়েছে। তখন জাপানের বহু মানুষ একে চিনত ‘অ্যাটমিক বম্ব ডিজিজ’ নামে। ১৯৪৫ সালের ৬ অগাস্ট, মাত্র দুই বছর বয়সে সাদাকোর শরীরেও পারমাণবিক বিস্ফোরণের অদৃশ্য বিকিরণ আশ্রয় নিয়েছিল। দশ বছর পরে সেই যুদ্ধই ফিরে এল তার রক্তের ভেতরে। সেদিন থেকেই শুরু হয়েছিল সাদাকোর আরেকটি যাত্রা, যে যাত্রায় অস্ত্র ছিল না, ছিল শুধু কাগজ, আশা আর বেঁচে থাকার এক অসাধারণ জেদ।
হাসপাতালের জানলার বাইরে তখনও একটু একটু করে হিরোশিমা নতুন শহর গড়ছে। আর ভেতরে একটি শিশু প্রতিদিন একটু একটু করে ভেঙে যাচ্ছে। তার মা হাসিমুখে ফল কেটে দিতেন, বাবা কান্না চেপে গল্প বলতেন, ডাক্তাররা আশ্বাস দিতেন, নার্সরা যত্ন করতেন। কিন্তু সব আশ্বাসের মধ্যেই একটি অদৃশ্য ভয় বাসা বেঁধেছিল। মানুষ যখন কোনও প্রিয়জনকে বাঁচাতে পারে না, তখন সে অলৌকিকতায় বিশ্বাস করতে শুরু করে। একদিন স্কুলের এক বন্ধু এসে সাদাকোর হাতে একটি কাগজের সারস তুলে দিল। বলল, জাপানে বহুদিনের একটি বিশ্বাস আছে, যে এক হাজারটি কাগজের সারস ভাঁজ করতে পারবে, তার আন্তরিক প্রার্থনা পূর্ণ হবে। সাদাকো গল্পটির ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে ভাবেনি। অসুস্থ মানুষ আশার সত্যতা যাচাই করে না। সে আশাটুকুকেই আঁকড়ে ধরে। তারপর শুরু হল কাগজ ভাঁজ করে জীবনের ভাঁজ খোলার চেষ্টা। রঙিন কাগজ ফুরিয়ে গেলে ওষুধের মোড়ক, সেটাও শেষ হলে উপহারের মোড়ক, এমনকি ওষুধ লেখার কাগজও তার কাছে আগামীকালকে ধরে রাখার শেষ আশ্রয় হয়ে উঠল। আজও গবেষকেরা বলেন, সে এক হাজার সারসেরও বেশি ভাঁজ করেছিল, আবার জনপ্রিয় গল্পে অন্য সংখ্যাও প্রচলিত আছে। কিন্তু আজ সেই সংখ্যার আর কোনও মূল্য নেই। কারণ মৃত্যুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের হিসাব শুধু সংখ্যা দিয়ে হয় না। একটি সারসও যথেষ্ট, যদি তার প্রতিটি ভাঁজের মধ্যে একটি শিশুর বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছে লুকিয়ে থাকে।
১৯৫৫ সালের ২৫ অক্টোবর হাসপাতালের একটি বিছানা নিঃশব্দে খালি হয়ে গেল। সূর্য উঠল, ট্রাম চলল, দোকান খুলল। কিন্তু পৃথিবী একটি শিশুকে হারাল, যে কোনও দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেনি, কোনও সেনাবাহিনীতে নাম লেখায়নি, কোনও অস্ত্র স্পর্শও করেনি। তার অপরাধ ছিল, সে ভুল সময়ে ভুল শহরে জন্মেছিল এবং বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু ইতিহাসের অদ্ভুত নিয়ম, কখনো-কখনো কোনও কোনও মৃত্যু নিজেই একটি আন্দোলনের জন্ম দেয়। সাদাকোর সহপাঠীরা সিদ্ধান্ত নিল, এই মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের শোক হয়ে থাকবে না। তারা জাপানের বিভিন্ন স্কুলে চিঠি লিখল। শিশুরা সাড়া দিল, শিক্ষকরা এগিয়ে এলেন, অল্প অল্প করে জমল অর্থ। ১৯৫৮ সালে শান্তি উদ্যানে নির্মিত হল শিশু শান্তি স্মৃতিস্তম্ভ। পরমাণু বোমার গম্বুজের অনুষঙ্গে নির্মিত বেদির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সেই ব্রোঞ্জের মেয়েটি কেবল সাদাকো নয়, পৃথিবীর সমস্ত শিশুর প্রতীক, যাদের শৈশব বড়দের যুদ্ধের কাছে বন্ধক পড়েছিল।
আজ সেখানে দাঁড়ালে আর একটি বিষয় গভীরভাবে অনুভব করা যায়। মানুষ ফুল রেখে যায়, ফুল শুকিয়ে যায়। মানুষ মোমবাতি জ্বালায়, মোমবাতি নিভে যায়। কিন্তু কাগজের সারস রেখে যায় শিশুরা। কাগজ অমর নয়, এক ফোঁটা জলে নষ্ট হয়ে যায়, আগুনে মুহূর্তে পুড়ে যায়। তবু সেই এখানে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক। কারণ কাগজের সারসের ভেতরে লুকিয়ে থাকে মানুষের ভালোবাসা, বাঁচার আর্তি আর বিবেক। শান্তি উদ্যানের ভেতরে হাঁটতে হাঁটতে আমার মনে হয়েছিল, যুদ্ধের প্রকৃত স্মৃতিস্তম্ভ কখনও ট্যাংক, কামান কিংবা বিজয়ের স্তম্ভ নয়। যুদ্ধের প্রকৃত স্মৃতিস্তম্ভ একটি অসুস্থ শিশুর বিছানা, খালি বিমানের আসনের ওপর পড়ে থাকা একটি স্কুলব্যাগ, একজন অসহায় মায়ের নীরব কান্না, একজন বিধ্বস্ত বাবার দৃষ্টি, তা সে আজকের ইরানেই হোক বা গতকালের জাপানে। একটি অসমাপ্ত খাতা, আর কয়েকটি কাগজের সারস।
বিস্ময়করভাবে, হিরোশিমা আজও প্রতিশোধ শেখায় না। সে ঘৃণাও শেখায় না। সে কেবল স্মরণ করতে শেখায়। কারণ যে পৃথিবী স্মৃতি হারায়, সে খুব দ্রুত আবার অস্ত্র বানাতে শুরু করে। সাদাকো সাসাকি হয়তো কোনও দিন ভাবেনি, তার ছোট্ট আঙুলে ভাঁজ করা কাগজের পাখিগুলো একদিন মহাদেশ পেরিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয়ে উড়ে যাবে। আজও প্রতি বছরের ৬ অগাস্ট পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে শিশুরা সেই স্মৃতিস্তম্ভে তাদের হাতে তৈরি কাগজের সারস পাঠায়। তারা হয়তো সাদাকোর জীবনী পড়েনি, লিউকেমিয়ার চিকিৎসাবিজ্ঞান বোঝে না, ভূরাজনীতিও জানে না। তারা শুধু জানে, পৃথিবীতে এমন একটি মেয়ে ছিল, যে শেষপর্যন্ত বন্দুক হাতে নেয়নি, কেবল কাগজ হাতে নিয়েছিল। হয়তো সেই কারণেই, এত বছর পরও, যুদ্ধের কাছে পরাজিত হওয়া শিশুটিই শেষপর্যন্ত যুদ্ধের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে। হিরোশিমার আকাশে নয়, মানুষের বিবেকের ভেতরে, সভ্যতার ইতিহাসের পাতায়।
(লেখক শিল্পপতি।)

