কবিতা

ব্লগ/BLOG
Spread the love


দশমীর খেয়া

রানা সরকার

সমূহ জীবনের কথায় বার্তাবহ আলাপ-বিলাপে এখনো মশগুল ভগ্ন বন্দর-

মধ্য দুপুরের আকাশে চিল ওড়ে, জাহাজের মাস্তুল দাঁড়িয়ে স্বর্ণালি নিঝুম বেলায়-

জলপথে বাড়ি ফেরার উৎসব এখন বর্ণময়, সোহাগে আপ্লুত ঢেউ ছোঁয় মুক্ত অন্তর…

এখানে দিগ নির্ণয়ের হাওয়া-মোরগ চঞ্চল হলে মোহনার তীরে জাগে বিপন্ন খোলায়!

নদী মানচিত্রের খেয়াপথ যাত্রীসহ নোঙর করেছিল, সখ্য ছিল তার মগ্ন উপকূলে…

এখানে সাবেকি বজরা ভেসে এসে মুখোমুখি দেখিয়েছিল অলস প্রহর-

 সহস্র নারিকেলের শিথিল গণনা শেষে বাণিজ্যের কর মুক্তি হয়েছিল শরৎ আশ্বিনে;

এই পারাপারে কতদিন এসেছে ফিরে সাঁঝের লগ্ন এক, ফিরেছে কখনো একা উদাস সদাগর।

দুধকুমার নামে যুবনদ প্রবাহের উদ্দাম দেখিয়েছিল বরষার অবুঝ বেলায়-

নদীও হারিয়ে যায়, শাখা নদে বিলীন হলে খেয়া ঘাট বড় হয় অজানা গহিনে-

এখানে প্রতিদিন জলদৌড় এনেছে কাছে দূরের পথ, ঢেউ ভাসে অচেনা মোহনায়,

ভাঙনের দুঃস্থ যাপনের স্মৃতি উলঙ্গ খেয়ায় এসে ফেরিঘাটজুড়ে থাকে আপাত সুদিন।

এখন উৎসব ফেরে কালের বোধনে, বাড়ি ফেরার আহ্লাদিত সুর উজানের গাঁয়ে-

নৌকাডুবির পর ভাসানের জল-রঙা ছবি সকরুণ গল্প নিয়ে চেয়ে আছে ভীত অজানায়-

ঋতু লাবণ্যের নদী সুন্দরী সেজে আছে নবমী তিথির রাতে, শিউলির ঘ্রাণ থাকে জোনাকির সাথে

দশমীর বিকেলে ভেসে গেছে দেবীর হাতের পদ্ম, মোহনায় ভাসানের অর্ঘ্য ভাসে বিসর্জনের জলে।

নামহীন গোত্রহীন অচেনা প্রবাসীকে পরিযায়ী জেনেছিল কেউ, নিশ্চিত স্বপ্নের ঘুমে…

পরবাসে সুজন ছিল না সেদিন, ঘর ছাড়া এখানের মানুষজন আজও আছে দৈবের রসে-

নদী জীবনের কথায় দুঃখ এসে ভিজিয়েছে এতকাল, আনমনা খেয়াঘর প্লাবন মরশুমে,

দখিনের কলতানে ফিরেছে নিশ্চুপ পরব, প্রাণিত জীবনের গান ভাসে চেনা আকাশে।

গজলডোবায় ভোর

প্রবাল বন্দ্যোপাধ্যায়

রাত গভীর হলে জলপরিরা

এসে বসে নদীর চড়ায়।

জল ভেসে থাকা চখাচখি যত

ঘাড় গুঁজে ঘুমিয়েছে

পরিদের ডানার শব্দে জেগে ওঠে

শোনে জলতরঙ্গ বেজে যায়

তাদের নরম বুকে,

সারাদিন তিস্তায় পাখিপ্রেমীদের দল,

কমলা ডানায় রোদ মেখে ওড়ে

শেলডাক, মালাডের দল উড়ে চলে

বৈকুণ্ঠপুরের জঙ্গলের দিকে-

শ্রীকৃষ্ণ এখনও কি রুক্মিণী নিয়ে রয়েছে সেখানে?

নৌকার গলুইয়ে গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছে ক্লান্ত মানুষ।

জলপরিরা নৌকার দিকে চেয়ে চোখ ওলটায়।

কোনো এক রাত জাগা পাখির শীৎকারে

জ্যোত্স্না ঢেকে দেয় পরিদের ডানা।

এরপর ভোর হবে গজলডোবায়…

ঝড়ের ধাক্কা

মাধবী দাস

মন-পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে

কত যে মনের সাথে দেখা হয় রোজ

গায়ে গায়ে ধাক্কা লাগে,  পাশ কাটিয়েও

চলে যায় কেউ…

কিছু ধাক্কা ঝড় তুলে, তছনছ করে

খড়কুটোর মতন উড়ে যায় জমানো সংস্কার

শিহরন থেকে বৃষ্টিপাত-

মুষলধারায় ঝরে পাপ!

সব পাপ শুষে নেয় বুভুক্ষু শরীর…

এভাবেই ধাক্কা খেয়ে, বেঁচে উঠি ফের একটু বেশি।

ভাতঘুম

প্রীতিলতা চাকী নন্দী

জল থেকে উঠে আসা কবিতারা

মানুষ চিনিয়ে দেয় বরাবর

দুর্বিপাকের শিকড়ে জমা নোংরা

অপার বৈধতা খোঁজে

স্নেহজলের ভেতর থিতিয়ে পড়া

অমায়িক অজস্র সান্নিধ্য

মোড় ঘুড়িয়ে নেয়

ক্লান্ত বাতাসকে জীবাণু মুক্ত হতে

অফুরান বিশুদ্ধতায় স্নাত হয়ে ওঠো

একরাশ মার্জিত  আবেগ ঢালো

জড়তার মুখোশ ভেঙে প্রবাহিত

বৈকালিক আড্ডায় সন্ধে নেমে এলে

ধরা পড়ুক সমুদ্রনাভির তত্ত্বকথা

আরো কিছুটা সময় এগিয়ে

জেগে উঠুক যন্ত্রণার ভাতঘুম।

বন্ধ দরজার ওপারে
সুকান্ত মণ্ডল

আমার সমস্ত প্রার্থনার ভেতরে আজ
একটি অনাহারী পাখি ডানা ঝাপটাচ্ছে।
তার ঠোঁটে জমে আছে অনুচ্চারিত কোনও মন্ত্র
আর আকাশের দিকে তাকালেই মনে হয়—

ঈশ্বর বুঝি দূরত্বের অন্য এক নাম,
কিংবা একটি বন্ধ দরজার ওপারের আলো।
আছে বলে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে
মানুষ নিজের ছায়াকে অন্ন ভেবে খেয়ে চলেছে।

সমস্ত ইচ্ছের উপরে একমুঠো নীরবতা ছড়িয়ে রাখি,
যেন ভোরের আগেই কোনও অচেনা নদী এসে
মুছে দিবে আমার শরীরের সমস্ত লিপি!

তবু ভিতরে ভিতরে একটি খিদে জন্ম নেয়।
যে খিদে ভাতের নয়; একবার যেন
সমস্ত অস্তিত্বের দরজায় কড়া নেড়ে আসতে পারি!

হে অদৃশ্য, তোমার দরজায় এসে দাঁড়িয়েছি।
আমার হাতে কোনও ভিক্ষার থালা নেই,
আছে শুধুই কয়েকটি জন্ম না-নেওয়া ভোর

আর চোখে ভেতরে লুকিয়ে রাখা নিষিদ্ধ আলো।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *