এত ঘনঘন সিদ্ধান্ত বদলে মুখ পুড়ছে সরকারেরই

ব্লগ/BLOG
Spread the love


রূপায়ণ ভট্টাচার্য

অনেকদিন পর গড়িয়াহাট মার্কেটে গিয়েছি সেদিন। দেখি, ফুলের দোকানগুলো খুব ছোট হয়ে গিয়েছে হঠাৎ। কী ব্যাপার? চেনা দোকানদাররা হইচই শুরু করে দিলেন। সোচ্চার ক্ষোভে। পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল এসে দোকানপাট ছোট করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। রাস্তার মধ্যে ঢুকে পড়েছিল বলে।

তো ভালো কথা। চমৎকার কথা। তার পাশেই দেখি নার্সারির দোকানগুলো, মনিহারির দোকানগুলো একই রকম বড় রয়েছে। একই রকমভাবে রাস্তা দখল করে। এখনও কিছু হয়নি। মার্কেট থেকে বেরিয়ে চারদিকের ফুটপাথে ঘোরাঘুরি করি। সেখানেও দেখি একই ব্যাপার। কোনও বদল নেই। ফুটপাথ এমনভাবে দখল, হাঁটার উপায় নেই।

অগ্নিমিত্রা মাঝে মাঝেই কথার আগুন ছড়াচ্ছেন নানা জায়গা পরিদর্শন করে। ইতিমধ্যেই নাম হয়ে গিয়েছে জরিমানামন্ত্রী। নিয়ম না মানলে জরিমানা। সত্যিই পিক, থুতু, অবৈধ নির্মাণে জরিমানা দরকার। তবে তা হচ্ছে কোথায়! সবই যে কথার কথা!

বেঠিক দাঁড়াচ্ছে আরেক জায়গায়। গড়িয়াহাটের ফুলের দোকানগুলো একটা বড় উদাহরণ। নতুন সরকার মাঝে মাঝেই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছে। দু’তিনদিন কাজ হচ্ছে। তারপর আবার অখণ্ড নীরবতা রাজ্যজুড়ে। সরকার আসার পরেই হাওড়া-শিয়ালদা সহ কলকাতার শহরতলির রেলস্টেশনগুলোতে হকার উচ্ছেদ হল। আমরা ইঙ্গিত পেলাম, সর্বত্র এ জিনিস হবে। কোথায়! কলকাতার দিকে রেলস্টেশনগুলোতে হকার উঠল। নিউ কোচবিহার স্টেশনের কাছেও দোকান ভাঙল। অথচ শিলিগুড়ির তিনটে স্টেশনের কাছের কোনও ছবি বদলাল না। একই রকম থেকে গেল।

কারণটা আমজনতার কাছে দুর্বোধ্য। সরকার ক্ষমতায় আসার একদিনের মধ্যে নিউমার্কেটে বুলডোজার দিয়ে ভাঙা হল বেআইনি পার্টি অফিস। ভালো, ভালো। ওদিকে ধর্মতলা, নিউমার্কেট সংলগ্ন হকারদের বাজার একই থেকে গেল। রাস্তা দিয়ে হাঁটা কঠিন। নিউমার্কেট একেবারে অবরুদ্ধই থাকল। গত তিন মাসে বরং হকার বেড়ে গিয়েছে, বললেন এক দোকানদার।

এক যাত্রায় পৃথক ফল এভাবে হয়। যাদের রাতারাতি তুলে দেওয়া হল তাদের কী অপরাধ ছিল তাহলে? তপসিয়া অঞ্চলে দুটো ফ্ল্যাটের ধ্বংসস্তূপ দেখা গেল বেআইনি বলে। নামল বুলডোজার। চারদিকে কোথাও ধন্য ধন্য রব। কোথাও সমালোচনা। তারপর তো আর কোথাও কিছু হল না।

প্রথমে মনে হয়েছিল নতুন সরকার সাহস নিয়ে কিছু কাজ করবে। অন্তত প্রথম এক বছর তো করবেই। এবার দেখলাম, একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরেই দু’দিন পরে পালটে যাচ্ছে তা। যেমন সব মেয়েদের বাসে ফ্রি টিকিটের প্রতিশ্রুতি। যেমন অন্নপূর্ণা যোজনার প্রতিশ্রুতি। যেমন মিড-ডে মিলে ডিমহীন খাবারের প্রতিশ্রুতি। যেমন নবান্নের বদলে রাইটার্সে প্রশাসন চালানোর কথা ঘোষণা। কিছুদিন একটা নিয়ম চলার ক’দিন পরে যদি আরেকটা নিয়ম চলে, বুঝতে হবে মন্ত্রী-আমলাদের নিজেদের মধ্যেই তীব্র সমস্যা আছে। এঁরা ঠিক করে উঠতে পারছেন না কী করবেন। সিদ্ধান্তের আগে ভালো করে চুলচেরা বিচার কি হয়নি তাহলে?

উত্তরবঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিকের হাত থেকে দেড় মাসের মধ্যেই ক্রীড়া বিভাগের দায়িত্ব কেড়ে নেওয়াটা ওরকমই এক দোদুল্যমান দশার পরিচয়। মন্ত্রী হয়ে নিশীথ অনেক বড় বড় কথা বলেছিলেন ময়দানে ঘুরতে ঘুরতে। এক কথায় ভেঙে দিয়েছিলেন যুবভারতীর সামনে একটি ফুটবলারের স্থাপত্য। বিকল্প কিছু না করে। তাঁকে চূড়ান্ত লজ্জায় ফেলে নিশীথের দপ্তরই কেড়ে নেওয়া হল ক’দিন পর।

অথচ অমিত শা’র দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী নিশীথ কেন্দ্রের ক্রীড়া দপ্তরের দায়িত্বে ছিলেন অনেকদিন। খতিয়ে দেখলে তিনি হচ্ছেন রাজ্যে আদর্শ ক্রীড়ামন্ত্রীর দাবিদার। তিনি বাদ। কেন বাদ সেটাও কেউ জানে না। কলকাতার সংবাদমাধ্যমে তাঁর কথাবার্তাও বন্ধ।
বিজেপির এই মন্ত্রীসভায় দেখছি মুখ্যমন্ত্রী বাদে দুজনে শুধু কথা বলে যাচ্ছেন। মর্নিং ওয়াকে গিয়ে প্রতিদিনই কিছু না কিছু বলে প্রচার নিচ্ছেন দিলীপ ঘোষ। শহর পরিদর্শনে বেরিয়ে কিছু বলে ‌ প্রচারে থাকছেন অগ্নিমিত্রা। অনেক মন্ত্রী গান গাইছেন, অভিনয় করছেন অনেকে, অনেকে নিজের লেখা কবিতাও বলছেন মঞ্চে। বক্তৃতায় কথায় কথায় ‘মাননীয়’ শব্দ। যেন চতুর্থ তৃণমূল ফিরে এল রাজ্যে। ওখানেও তো তাই হত।

তসলিমা নাসরিনের মঞ্চে জয় গোস্বামীর অপমান নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হয়েছে গত কয়েকদিন। যে প্রশ্নটা কেউ করেনি, তা হল জয়ের মঞ্চ থেকে নেমে যাওয়ার সময় মঞ্চে হাজির ছিলেন এক মন্ত্রী, দুই সাহিত্যিক সহ কয়েকজন বিশিষ্ট। মন্ত্রী বা কবি কেউই কিন্তু জয়ের অপমানের সময় একটি কথাও বলেননি। যেন কিছুই দেখেননি।

তসলিমা যেমন নিজের দায় ঝেড়ে ফেলেছেন জয়ের অপমানে। নিজের ভাষণে একবারও দুঃখ প্রকাশ করেননি সেখানে। সমালোচনাও করেননি উগ্র দর্শকদের। একেবারে চুপ ছিলেন। তাহলে আর তিনি কীসের প্রতিবাদী? পরে দুঃখপ্রকাশ অর্থহীন।

আসলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে যা হত, এখনও দেখছি এই স্টাইলই চলছে। তা বুঝতে পেরে সাহিত্য, সিনেমা, খেলার একদল ধান্দাবাজ মানুষ বিজেপির নৌকোয় পা বাড়িয়েছেন। এঁরা তৃণমূলের পরমান্ন হাপুসহুপুস খেয়েছেন অনেকেই। একজন দক্ষিণপন্থী কবি তাঁর দাদাকে ধরে ভালোই গুরুত্ব পেয়েছেন মমতার আমলে। ক্ষীর খেয়ে এখন মুছে নিয়েছেন মুখ। তিনিই দাদা হতে চান পদ্মপুকুরে। তসলিমার সম্মানে এক বিশিষ্ট মন্ত্রী সেদিন আয়োজন করেছিলেন নৈশভোজের। একেবারে তৃণমূলের স্টাইলেই। এমন কিছু পরিচালক, অভিনেতা-অভিনেত্রী, গায়ক-গায়িকাদের দেখা পাওয়া গেল, যাঁরা মমতার আমলে তাঁর পাশাপাশি ঘুরতেন। বহুবার যৌন কেলেঙ্কারিতে জড়িত পরিচালকও হাসিমুখে সেখানে হাজির। রং দে গেরুয়া বললেই সব অপরাধ সাফ, এঁরা সবাই বুঝে গিয়েছেন। প্রচুর সাহিত্যিকও দ্রুত দল বদলে এখন অন্য কথা বলছেন। আগের সরকারের বাপবাপান্ত করছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখকরা রাজনীতির কথা লিখে চলেছেন নিজের সৃষ্টিশীলতা ভুলে। বোঝাতে হবে তো, রাতারাতি তৈরি বিজেপির সাহিত্য ক্যাম্প, আমরাও দায়িত্ব নিতে পারি।

ময়দানে মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল-সিএবি-আইএফএ’র ধুরন্ধর ধান্দাবাজ কর্তারা রাতারাতি শিবির পালটে ফেলেছেন। ইস্টবেঙ্গল তো কথা নেই বার্তা নেই মোদির ঘনিষ্ঠ অর্থনীতিবিদ সঞ্জীব সান্যালকে ভারত গৌরব পুরস্কার দিয়ে দিয়েছে। দেশে যেন আর কোনও খেলোয়াড় নেই। সঞ্জীব অচিরে আরও ক্ষমতা পাবেন বুঝে তাঁকে তৈলমর্দনের প্রবল চেষ্টা ইস্ট কর্তাদের। এ ব্যাপারে ইস্ট-মোহন-সিএবি’র জুড়ি নেই। মমতার কাছে প্রচুর সাহায্য নিয়ে এখন দিদি অতীত। কর্তারা দাদাকে চান। বছরের পর বছর ক্ষমতা নিয়ে বসে থাকবেন। ইস্টবেঙ্গলের বড় কর্তা তো নির্বাচনের আগেই আরএসএস নেতার বাড়ি চলে গিয়েছিলেন। ক্ষমতা ধরে রাখতে তিনি তুলনাহীন।

এবার দেখুন, কলকাতা-শিলিগুড়ির মতো অনেক জায়গাতেই আর কোনও মেয়র নেই। প্রশাসন বলে কিছু নেই। বেআইনি নির্মাণ বন্ধ হয়নি। তোলাবাজি তো নয়ই। এটা বিজেপির রাজ্য সভাপতিও সোচ্চারে স্বীকার করে নিয়েছেন। দুটো শহরেই উন্নয়নের বহু কাজ বন্ধ। শিলিগুড়ি নিয়ে সব প্রতিশ্রুতি আজ লকার-বন্দি।

কিছুদূর একভাবে যাচ্ছি, তারপরেই আবার রাস্তা বদল। নতুন সরকারের এই প্রবণতা রীতিমতো ভয়ংকর। এর মধ্যে আমরা দেখে ফেলেছি উত্তরপ্রদেশসুলভ এনকাউন্টারে অভিযুক্তের হঠাৎ মৃত্যু। এক ধর্ষিত শিশুর মৃত্যু, তদন্তের এক মাসের পরেও যা স্পষ্ট নয়। মুখ্যমন্ত্রীর আত্ম সহায়কের রহস্যজনক মৃত্যুর একই পরিস্থিতি তিন মাস পর। গুন্ডা দমন আইন চালু হতে বহু দেরি জেনেও ঘোষণা করে দেওয়া হয়, তা চালু হচ্ছে। শ্যামনগরে প্রকাশ্যে নাট্যকর্মীকে প্রশ্ন করা হয়, তুই হিন্দু না মুসলিম! মুসলিম হলেই কী, উত্তর দিলে জোটে বেধড়ক মার! রেড রোডে ইদের নমাজ যে অজুহাতে বন্ধ হয়, সেই অজুহাত উড়িয়ে হয় প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠান। কোনওদিন আবার শুনতে হয় মুসলিমরা ‘শুক্রবারি’।

খারাপ কথার বন্যা কবে বন্ধ হবে এই বাংলায়!



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *