Atomic bombs dropped on Hiroshima and Nagasaki modified the course of human civilization

Atomic bombs dropped on Hiroshima and Nagasaki modified the course of human civilization

জীবনযাপন/LIFE STYLE
Spread the love


হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে নিক্ষিপ্ত দু’টি পারমাণবিক বোমা শুধু দু’টি শহরকে ধ্বংস করেনি; বদলে দিয়েছিল মানব সভ্যতার ইতিহাস। সেই ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষদের– ‘হিবাকুশা’– দেহ ও জীবন এখনও পারমাণবিক যুদ্ধের সবচেয়ে শক্তিশালী সাক্ষ্য বহন করে। লিখেছেন অর্ণবকুমার রায়।

‘হিবাকুশা’ একটি জাপানি শব্দ, যার আক্ষরিক অর্থ– ‘বোমা-আক্রান্ত ব্যক্তি বা তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত ব্যক্তি’। এটি বিশেষভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক হিরোশিমা-নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা হামলায় বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের বোঝায়। এই শব্দটির একটি গভীর ঐতিহাসিক এবং চিকিৎসাগত তাৎপর্য রয়েছে, যা কেবল তাৎক্ষণিক বিস্ফোরণে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদেরই নয়, বরং যারা রেডিয়েশনজনিত অসুস্থতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অন্যান্য স্বাস্থ্যগত প্রভাবে ভুগছিল, তাদেরও অন্তর্ভুক্ত করে।

আরও পড়ুন:

১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট হিরোশিমায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের পর ৯ আগস্ট নাগাসাকিতে নিক্ষিপ্ত হয় প্লুটোনিয়াম সমৃদ্ধ পারমাণবিক বোমা ‘ফ্যাট ম্যান’। বোমা হামলার আগে হিরোশিমার আনুমানিক জনসংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৫০ হাজার। বোমা হামলায় মৃত্যুবরণ করে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার জন, অর্থাৎ ৪০ শতাংশ মানুষ। আহত হয় ৮০ হাজার অর্থাৎ ২২ শতাংশ মানুষ। নাগাসাকির আনুমানিক জনসংখ্যা ছিল ২ লাখ ৫০ হাজার। এখানে পারমাণবিক বোমা হামলায় নিহত হয় ৭৪ হাজার জন অর্থাৎ প্রায় ৩১ শতাংশ মানুষ। আর আহত হয় ৮০ হাজার জন অর্থাৎ ৩২ শতাংশ মানুষ। রেড ক্রসের তথ্য অনুযায়ী, হিরোশিমার ৯০ শতাংশ চিকিৎসক ও নার্স পারমাণবিক বিস্ফোরণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নিহত হয় অথবা অক্ষম হয়ে পড়ে। তাই আহতদের ন্যূনতম চিকিৎসাও দেওয়া সম্ভব হয়নি।

হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা হামলার স্বাস্থ্যগত প্রভাব অধ্যয়নের জন্য মার্কিন পরমাণু শক্তি কমিশন বা ‘অ‌্যাটমিক এনার্জি কমিশন’-র মাধ্যমে জাতীয় বিজ্ঞান অ‌্যাকাডেমির অর্থায়নে ১৯৪৭ সালের নভেম্বরে ‘অ্যাটমিক বোমা ক্যাজুয়ালটি কমিশন’ (এবিসিসি ) প্রতিষ্ঠিত হয়। এর পরিচালনার দায়িত্বে ছিল ‘সুপ্রিম কমান্ডর ফর দ্য অ্যালাইড পাওয়ার্স’ বা ‘দখলদার মার্কিন কর্তৃপক্ষ’ (১৯৪৫-১৯৫২)। কিন্তু এটি জাপানের কোনও আইনের দ্বারা সমর্থিত ছিল না। অনেক সমালোচক এটিকে ‘গবেষণা উপনিবেশ’ বলে অভিহিত করেছিলেন, কারণ পারমাণবিক বিস্ফোরণে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা বা ‘হিবাকুশা’-রা তীব্র গবেষণার বিষয় হয়ে ওঠে, অথচ তাদের জন্য এতে কোনও চিকিৎসা সহায়তা বা কর্মসূচি ছিল না।

উপরোক্ত কমিশনের গবেষণা থেকে জানা যায় যে, পারমাণবিক বোমা হামলার পর তাৎক্ষণিকভাবে যারা নিহত হয়, তাদের মৃত্যুর কারণ ছিল– ‘ব্লাস্ট’ বা বিস্ফোরণ, তাপ এবং তেজস্ক্রিয় বিকিরণ। ব্লাস্টের ফলে যে সুপারসনিক শকওয়েভ সৃষ্টি হয়েছিল, তা উভয় শহরের ভবনগুলোকে সমতল করে দিয়েছিল, ধ্বংসাবশেষ চতুর্দিকে নিক্ষেপ করেছিল, গাছগুলোকে বর্শায় পরিণত করেছিল, মানুষকে– বিশেষত শিশুদের আকাশে ছুড়ে মেরেছিল এবং তাদের দেহ ছিন্নভিন্ন করে ফেলেছিল। একটি পরিসংখ্যান মতে, ১৯৪৫ সালের শেষ নাগাদ পারমাণবিক হামলায় নিহতদের মধ্যে ছিল ৩৮ হাজার শিশু ও কিশোর। হিবাকুশাদের (এবং স্পষ্টতই প্রাথমিকভাবে হতাহতদের) একটি উল্লেখযোগ্য জনসংখ্যাতাত্ত্বিক ধারণা হল– বোমা হামলার সময় শহরগুলোতে ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সি পুরুষদের উপস্থিতি কম ছিল।

এর কারণ হিসাবে অনেকে সামরিক দায়িত্ব বা যুদ্ধকালীন কাজের জন্য তাদের বাইরে থাকার কথা বলে থাকে। এর অর্থ, আনুপাতিকভাবে শহরগুলোতে উপস্থিত বেসামরিক হতাহতের সংখ্যার একটি বড় অংশ ছিল নারী, শিশু-কিশোর এবং প্রবীণ পুরুষ। ‘এবিসিসি’ ও ‘আরইআরএফ’-এর গবেষণা কার্যক্রমের একটি প্রধান উপাদান হচ্ছে ‘লাইফস্প্যান স্টাডি’ অর্থাৎ ব্যক্তির সমগ্র জীবনজুড়ে তার তথ্য সংগ্রহ করা। তাৎক্ষণিকভাবে যারা মৃত্যুবরণ করেছিল, তার ১৫ শতাংশের কারণ ছিল রেডিয়েশন বা তেজস্ক্রিয় বিকিরণ। রেডিয়েশন ডোজের তীব্রতা বোঝার জন্য একটি এক্স-রে-র উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। বুকের এক্স-রের প্রতি ছবিতে ০.০২-০.১ মিলি-গ্রে রেডিয়েশন ব্যবহৃত হয়ে থাকে। টোকিও থেকে নিউ ইয়র্ক একবার যাওয়া-আসা করলে একজন বিমানযাত্রী ০.১-০.২ মিলি-গ্রে রেডিয়েশন ডোজের সংস্পর্শে আসে।

পক্ষান্তরে, পারমাণবিক বিস্ফোরণের ১ কিলোমিটারের ভিতরে খোলা আকাশের নিচে থাকা হিবাকুশারা একটি এক্স-রে-র চেয়ে ২০ হাজার গুণ বেশি রেডিয়েশন ডোজের শিকার হয়েছিল। ‘এলএসএস’ ছাড়াও ‘আরইআরএফ’ স্বতন্ত্র নমুনা জনসংখ্যা নিয়ে অন্যান্য গবেষণা পরিচালনা করে। তাতে দেখা যায় ‘কৃষ্ণবৃষ্টি’ বা ‘ব্ল্যাক রেন’-এর শিকার প্রায় ৯,৫০০ জনের অনেকেই কয়েক দশক পরেও লিউকিমিয়া, থাইরয়েড, ক্যানসার এবং বিরল জেনেটিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়। পারমাণবিক বিস্ফোরণের পর হিরোশিমার বাইরের গ্রামগুলিতে এই তেজস্ক্রিয় ‘কৃষ্ণবৃষ্টি’ পড়েছিল।

পারমাণবিক বিস্ফোরণের কয়েক দশক পরেও হিবাকুশা পরিবারগুলিকে কলঙ্কিত মনে করা হয়েছিল। তবে ১৯৪৫ সাল থেকে শুরু করে এর তীব্রতা ও প্রকাশভঙ্গিতে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছু পরিবর্তন এসেছে। তেজষ্ক্রিয় বিকিরণের ভয়ে কেউ তাদের বিয়ে করতে চায়নি, এমনকী তাদের সন্তানের কাছেও নিজ সন্তানদের বিয়ে দিতে চায়নি।

অন্যদিকে, গর্ভবতী হিবাকুশারা পরে এমন শিশুদের জন্ম দিয়েছিল, যাদের চোখ ছিল না, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বা মস্তিষ্ক ছিল না, বা মস্তিষ্কের আর বিকাশ ঘটেনি। ধাত্রীরা ফিসফিস করে বলেছিল ‘দানব শিশু’। অনেককে পরিত্যক্ত করা হয়। অন্যদের লুকিয়ে রাখা হয়েছিল, তাদের বাবা-মা তাদের অস্তিত্ব স্বীকার করতে লজ্জা পেয়েছিলেন। ফলে একসময় হিবাকুশাদের সামাজিক বৈষম্যের ভারী বোঝাও বহন করতে হয়েছে। তাদের প্রায়ই করুণা এবং ভয়ের মিশ্রণের সঙ্গে দেখা হত, বা কোনও অদৃশ্য সংক্রামকতার বাহক হিসাবে। যা তাদের সহ‌্য করতে হত নীরবে। তাদের শারীরিক রোগগুলি বিচ্ছিন্নতার একটি বিস্তৃত অনুভূতির দ্বারা আরও জটিল আকার ধারণ করে। হিবাকুশাদের ত্বকের কেলয়েডের দাগ পারমাণবিক সহিংসতার প্রতীক হয়ে ওঠে। ১৯৫২ সালে ‘লাইফ’ ম্যাগাজিন হিবাকুশাদের পোড়া দেহের গ্রাফিক ছবি প্রকাশ করে, যা বিশ্বকে হতবাক করে দেয়। নোবেল কমিটি অবশেষে হিবাকুশাদের সম্মানিত করেছে। ২০২৪ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার গিয়েছে হিবাকুশাদের হাতে– তাদের সংগঠন ‘নিহন হিদানকিও’-এর করকমলে। ফলে বিশ্বজুড়ে হিবাকুশাদের দীর্ঘ সাত দশকের ত‌্যাগ, লড়াই এবং পারমাণবিক অস্ত্রবিরোধী প্রচারণার এক ঐতিহাসিক ও সর্বোচ্চ বৈশ্বিক স্বীকৃতি পেয়েছে।

সংগঠনটির আইনজীবী সেতসুকো থার্লো নোবেল গ্রহণের বক্তৃতায় বলেন, ‘ভুক্তভোগী হিসাবে আসিনি। আমরা এমন কিছুর সাক্ষী হয়ে এসেছি, যা মানবজাতি অবশ্যই আর কখনও পুনরাবৃত্তি করবে না।’
পারমাণবিক বোমার জনক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পদার্থবিদ জে. রবার্ট ওপেনহাইমার ব্যক্তিগতভাবে পরমাণু বোমা তৈরির পর গভীর অনুশোচনা, মানসিক দ্বন্দ্ব এবং তীব্র অপরাধবোধে ভুগেছিলেন। ইউরোপে মিত্রবাহিনীর অভিযান বাহিনীর সুপ্রিম কম্যান্ডর ডোয়াইট ডি. আইজেনহাওয়ার বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, তিনি দু’টি কারণে জাপানে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের বিরুদ্ধে ছিলেন।
প্রথমত, জাপানিরা আত্মসমর্পণ করতে প্রস্তুত ছিল, এবং তাদের উপর সেই ভয়াবহ জিনিস দিয়ে আঘাত করার প্রয়োজন ছিল না বলে তিনি মনে করেন। দ্বিতীয়ত, আমেরিকাকে এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করতে প্রথম দেখা তার ঘৃণার বিষয় ছিল। ১৯৫৫ সালে তঁার মৃত্যুর মাত্র কয়েক দিন আগে অ‌্যালবার্ট আইনস্টাইন বন্ধু লিনাস পলিংয়ের কাছে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, লিও সিলার্ডের সঙ্গে মিলে ১৯৩৯ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে পারমাণবিক গবেষণার অনুরোধ জানিয়ে চিঠিতে স্বাক্ষর করাটাই ছিল তঁার ‘জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল’। হিরোশিমা ও নাগাসাকির ট্র্যাজেডি তিনি কখনওই চাননি, আর সেই তীব্র অনুশোচনা থেকেই তিনি নিজেকে একজন সাধারণ ‘ঘড়ি প্রস্তুতকারক’ হিসাবে কল্পনা করতে চেয়েছিলেন।

পারমাণবিক বোমা হিবাকুশাদের দেহকে যন্ত্রণাদায়ক আর্কাইভে রূপান্তরিত করেছিল, যা থেকে তাদের মন মরিয়া হয়ে পালাতে চেয়েছিল, কিন্তু রক্তমাংস কখনওই সত্যিকার অর্থে তা ভুলতে দেয়নি। হিবাকুশার নোবেল শেষকথা নয়, এটি একটি দাবি। তাদের দেহ প্রমাণ বহন করে যে, এখন বিশ্বকে পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ যত দিন একটি বোমাও থাকবে, তত দিন নতুন হিবাকুশা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।

(মতামত নিজস্ব)

আরও পড়ুন:

সর্বশেষ খবর

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *