অর্থনৈতিক অগ্রগতির পাশাপাশি মানুষ ও বন্যপ্রাণীর নিরাপদ সহাবস্থান নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।
হর্ষবর্ধন শ্রিংলা
২০৪৭ সালের ‘বিকশিত ভারত’-এর স্বপ্নপূরণের পথে দেশ এগোচ্ছে দুরন্তগতিতে। বড় বড় রাস্তাঘাট, ফ্লাইওভার আর ১৪০ কোটি মানুষের এই বিপুল উন্নয়নের মাঝে একটা প্রশ্ন খুব বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে— অর্থনীতির চাকার তলায় কি বন্যপ্রাণীরা পিষে যাবে? নাকি উন্নয়নের সঙ্গেই সগর্বে বেঁচে থাকবে বাঘ, সিংহ বা হাতির পাল? গত ত্রিশ বছরের হিসেব বলছে, এই অসাধ্যসাধন করার ক্ষমতা ভারতের আছে। তবে শুধু বন্যপ্রাণী বাঁচিয়ে রাখার সেই প্রথম ধাপটা পেরিয়ে আমরা এখন এক নতুন যুগে পা দিয়েছি— যাকে বলে ‘সহাবস্থান’, অর্থাৎ মানুষ ও বন্যপ্রাণের একসঙ্গে বেঁচে থাকা।
‘প্রোজেক্ট টাইগার’ থেকে শুরু করে ‘প্রোজেক্ট চিতা’— সঠিক রাজনৈতিক সদিচ্ছার জোরে বন্যপ্রাণী বাঁচানোর লড়াইয়ে ভারত বাজিমাত করেছে। আর এই সাফল্যের ওপর ভর করেই ‘ইন্টারন্যাশনাল বিগ ক্যাট অ্যালায়েন্স’ তৈরি করে ভারত আজ গোটা বিশ্বকে পথ দেখাচ্ছে। কিন্তু মুদ্রার উলটোপিঠের ছবিটা বেশ ভয়ের। বন্যপ্রাণী বাঁচানোর ফলে তাদের সংখ্যা বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু উন্নয়নের ঠেলায় জঙ্গলের আয়তন ক্রমশই কমছে। খাবার ও আশ্রয়ের খোঁজে হাতি বা চিতাবাঘ লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। নষ্ট হচ্ছে ফসল, প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ। এটা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। আশ্চর্যের বিষয় হল, এই সংঘাত আসলে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে আমাদের সাফল্যেরই এক করুণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। তাই আজকের দিনে আসল চ্যালেঞ্জ শুধু বন্যপ্রাণী বাঁচানো নয়, বরং মানুষ আর বন্যপ্রাণী যাতে বছরের পর বছর শান্তিতে পাশাপাশি থাকতে পারে, সেই ব্যবস্থা করা।
এই একসঙ্গে থাকার পথ মোটেও সহজ নয়, তবে সঠিক পরিকল্পনা করলে মুশকিল আসান হতে পারে। প্রথমেই রাস্তা বা রেললাইন তৈরির নকশাতেই পরিবেশের ভারসাম্যের কথা মাথায় রাখতে হবে। হাইওয়ের নীচে বন্যপ্রাণীদের নিরাপদে রাস্তা পার হওয়ার জন্য আন্ডারপাস বা ওভারপাস তৈরি করাকে ঐচ্ছিক না ভেবে, জাতীয় সড়ক তৈরির আবশ্যিক অংশ করে তুলতে হবে। পাশাপাশি, আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নিতে হবে। কৃত্রিম মেধা বা এআইচালিত ক্যামেরা, স্যাটেলাইট নজরদারি এবং বিপদ বুঝলে ‘এসএমএস অ্যালার্ট’ পাঠানোর প্রযুক্তি এখন বেশ সফল। এই ব্যবস্থাকে গোটা দেশে ছড়িয়ে দিতে একটি বিশেষ ‘জাতীয় মিশন’ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।
এর চেয়েও জরুরি কাজ হল, বন্যজন্তুর হামলায় যাঁদের ক্ষতি হচ্ছে, তাঁদের দ্রুত এবং ন্যায্য ক্ষতিপূরণ দেওয়া। ক্ষতিপূরণের পুরো ব্যবস্থাটাকে ডিজিটাল করতে হবে। এর অঙ্কটা বাজারের বর্তমান দরের সঙ্গে মিল রেখে ঠিক হওয়া উচিত, যাতে জঙ্গল লাগোয়া গরিব মানুষগুলো নিজেদের এই পুরো প্রক্রিয়ার নীরব শিকার না ভেবে, গর্বিত অংশীদার মনে করতে পারেন। তাছাড়া, এত বড় কর্মযজ্ঞ শুধু সরকারি টাকার ভরসায় চলতে পারে না। বিশ্ব অর্থনীতির অনেকটাই যেহেতু সুস্থ পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল, তাই পরিবেশবান্ধব পর্যটন বা ইকো-ট্যুরিজম এবং কর্পোরেট বিনিয়োগ টেনে আনা খুব দরকার।
আজকের দিনে উন্নয়নশীল দেশগুলো প্রায় একই সংকটের মুখোমুখি। ভারত যদি সফলভাবে দেখাতে পারে যে— অর্থনৈতিক উন্নয়ন, পরিবেশ রক্ষা এবং সাধারণ মানুষের কল্যাণ— এই তিনটে জিনিস একসঙ্গে চলতে পারে, তবে তা গোটা বিশ্বের কাছে এক দারুণ উদাহরণ হয়ে উঠবে। বন্যপ্রাণীর সঙ্গে সহাবস্থান শুধু পরিবেশ রক্ষার আদর্শ নয়, এটা আসলে সুশাসনের এক চরম পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় ভারতের সাফল্যই ঠিক করে দেবে আগামীদিনে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ভবিষ্যৎ।
(লেখক রাজ্যসভার সাংসদ)

