নিট কাণ্ড এবং শিক্ষায় দুর্নীতির প্রতিবাদে ভারতেও জেন জেড বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ল। ককরোচ জনতা পার্টির ব্যানারে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার দাবিতে এই বিক্ষোভের ঢেউ দিল্লির যন্তরমন্তর ছাপিয়ে পৌঁছে গিয়েছে মুম্বই, পাটনা, রাঁচি, গুয়াহাটি, কলকাতা সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। কাতারে কাতারে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা রাস্তায় নেমে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন।
পুলিশের লাঠি, কাঁদানে গ্যাস, ছররা গুলির আঘাতে আহত হয়েও জলকামানের সামনে তাঁরা বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছেন। জলবায়ু আন্দোলনকর্মী সোনম ওয়াংচুক অনশন প্রত্যাহার করায় সরকারের আশা, পড়ুয়ারা হয়তো সুর নরম করবেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকে ককরোচ পার্টির নেতৃত্ব স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে ধর্মেন্দ্র প্রধান ইস্তফা না দেওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
কেন্দ্রীয় সরকার দাবি করছে, প্রশ্নপত্র ফাঁসে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ফাস্ট ট্র্যাক আদালত গঠন করে দোষীদের বিচারের বার্তা দিয়েছেন। কঠোর আইন আনার কথাও বলা হয়েছে। কেন্দ্রীয় শিক্ষাসচিব সহ একাধিক আধিকারিককে সরানো হয়েছে। তাতেও বিক্ষোভ না থামায় মধ্যরাতে পড়ুয়াদের উদ্দেশে বার্তা দিয়েছেন মোদি।
ককরোচ পার্টির সঙ্গে আলোচনায় দুটি দাবি কেন্দ্রীয় সরকার মেনে নিলেও ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার বিষয়টি এখনও অমীমাংসিত। জেন জেড বিক্ষোভে চিন-পাকিস্তান কলকাঠি নাড়ছে বলে অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে। সরকারের সমর্থকরা বিশেষ করে হিন্দুত্ববাদীদের একাংশ দাবি করছে, দেশবিরোধী অশুভ শক্তি ভারতের সর্বনাশ করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে।
আবার দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়, জেএনইউ কর্তৃপক্ষের যন্তরমন্তরে গেলে পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছে। কিন্তু জেন জেড অকুতোভয়। রাষ্ট্রের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তারা নতুন নতুন স্লোগান দিচ্ছে। তাদের জন্য বিভিন্ন মহল থেকে পাঠানো খাবার, পানীয় জল পুলিশ ও র্যাফের আধিকারিকদের দিকে এগিয়ে দিচ্ছে।
সাধারণত পুলিশি দমনপীড়নের পর আন্দোলনের তীব্রতা কমে। কিন্তু বছর খানেক আগে কৃষক আন্দোলনের পর তরুণ প্রজন্মের বিক্ষোভেও স্পষ্ট, স্পর্ধার পরিসর বাড়ছে। সেই স্পর্ধার সামনে অসহায় পুলিশবাহিনী। মুম্বইয়ে বিক্ষোভরত পড়ুয়াদের আটক করে নিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশ ভ্যানের সামনে একা রুখে দাঁড়ান বছর ২৪-এর তরুণী রিয়া আহির। রিয়ার নাছোড় মানসিকতায় শেষমেশ পড়ুয়াদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয় পুলিশ।
যে জাতপাত, ধর্ম, বর্ণের বিভাজন দেশের বিশাল অংশের মানুষকে গ্রাস করেছে, পড়ুয়াদের আন্দোলনে তার গুরুত্ব নেই। ধর্মীয় মেরুকরণ বা আমরা-ওরার বাইরে এই নবীনের দল শেষপর্যন্ত লড়তে মরিয়া। এই প্রজন্মকে অনেকে গালমন্দ করেন। আত্মকেন্দ্রিক, স্বার্থপর বলে কথা শুনতে হয় তাদের। অনেকে বলে থাকেন, নতুন প্রজন্ম শুধু নিজের পড়াশোনা আর কেরিয়ার ছাড়া কিছু বোঝে না। তারা দেশ, সমাজ নিয়ে চিন্তিত নয়।
কিন্তু যন্তরমন্তর থেকে বাড়তে থাকা আন্দোলনের ঢেউয়ে ওই অভিযোগ কানাগলিতে পথ হারাচ্ছে। এই প্রজন্ম আর শুধু সমাজমাধ্যমে রিল বন্দি হয়ে থাকছে না। শুধু নতুন প্রজন্ম নয়, তাদের বাবা-মায়েরা, এমনকি সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনকে সমর্থন জানাতে শুরু করেছেন। কার আমলে কত প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে, কোন সরকারের জমানায় কতগুলি পরীক্ষায় দুর্নীতি হয়েছে- সেসব আর বড় কথা নয়।
পড়ুয়াদের দাবি, সামগ্রিক পরীক্ষা তথা শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটানো জরুরি। সেই প্রসঙ্গে উঠছে ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা। পড়ুয়াদের এই দাবিগুলিকে রাজনীতিবিদ থেকে সেলেব্রিটি, ক্রীড়াবিদ থেকে আইনজীবী সমাজ সমর্থন জানিয়েছে। পড়ুয়াদের পাশে দাঁড়িয়েছেন শচীন তেন্ডুলকার, নাসিরুদ্দিন শা, অরিজিৎ সিং, জিতের মতো তারকারা।
দিনের পর দিন পরীক্ষায় দুর্নীতি চলবে আর কারও কোনও দায়বদ্ধতা থাকবে না- এটা মেনে নেওয়া যায় না। কেন্দ্রের উচিত, পড়ুয়াদের দাবিগুলি বিবেচনা করে অবিলম্বে সিদ্ধান্ত নেওয়া। রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগ কিংবা দেশবিরোধী তকমা সেঁটে কোনও লাভ নেই।

