Alipurduar | শূন্য থেকে ৭০ কোটির সাম্রাজ্য গড়েছেন চন্দন, আলিপুরদুয়ারের এক রূপকথার লড়াই

Alipurduar | শূন্য থেকে ৭০ কোটির সাম্রাজ্য গড়েছেন চন্দন, আলিপুরদুয়ারের এক রূপকথার লড়াই

শিক্ষা
Spread the love


সায়ন দে, আলিপুরদুয়ার: শূন্য থেকে ৭০ কোটি। শুনলে মনে হতেই পারে বুঝিবা জাদুকর পিসি সরকারের ম্যাজিক। আদতে ম্যাজিক নয়, আসলে রীতিমতো দাঁতে দাঁত চেপে তৈরি এক ‘রূপকথা’ (Success Story)।

চারপাশে কান পাতলে একটাই কথা, পশ্চিমবঙ্গে (West Bengal) শিল্প নেই, বাণিজ্য নেই। অগত্যা বাড়ি ছেড়ে কর্মসংস্থানের খোঁজে বাংলার তরুণ প্রজন্ম মহারাষ্ট্র, তামিলনাডু কিংবা গুজরাটে পাড়ি দেয়। তবে চোখে স্বপ্ন আর মনে জেদ থাকলে যে মরুভূমিতেও শিল্পের ফুল ফোটানো যায় তা আলিপুরদুয়ারের চন্দন ঘোষকে দেখলেই স্পষ্ট হয়ে যায়। আলিপুরদুয়ারের (Alipurduar) মতো প্রান্তিক শহর থেকেই তিনি অবিশ্বাস্য এক উপন্যাস গড়েছেন। শূন্য থেকে লড়াই করে চন্দন আজ ৭০ কোটির বিশাল ব্যবসার মালিক।

নিউ আলিপুরদুয়ারে চন্দনের অত্যাধুনিক অটোমোটেড ফার্নিচার কারখানা, এক লক্ষ বর্গফুট এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে। সেই কারখানায় তৈরি স্টিলের খাট, আলমারি, চেয়ার–টেবিল স্থানীয় এলাকা তো বটেই, রাজ্যের সীমানা ছাড়িয়ে অসম, মেঘালয় সহ গোটা উত্তর-পূর্ব ভারতের বাজারে রাজত্ব করছে। ৭০ কোটির ব্যবসা দ্রুত ১০০ কোটির ঘরে পৌঁছাবে বলে চন্দন আশাবাদী।

বিশাল সাফল্যের ইমারত কিন্তু একদিনে তৈরি হয়নি। ১৯৮৩ সাল, চন্দন তখন মাত্র ১৪। আচমকাই হৃদরোগে বাবার মৃত্যু। তার আগে চিকিৎসার বিপুল খরচে গোটা পরিবার সর্বস্বান্ত হয়ে পথে বসে পড়েছিল। মাধ্যমিক পাশ করা কিশোর চন্দনের আর পড়াশোনা হল না। সংসারের হাল ধরতে, ভাইদের পড়াশোনা ও দিদিদের বিয়ের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে ট্রাংক তৈরির পৈতৃক ব্যবসায় তিনি নামেন। তবে প্রথম পদক্ষেপেই প্রবল বাধা। উন্নত মানের টিন কিনে ট্রাংক বানানোর মতো পুঁজিটুকুও তখন হাতে নেই। অগত্যা নিজেই সাইকেল নিয়ে ঘুরে ঘুরে বাজার থেকে বাতিল তেলের টিন কিনে আনতেন। সেই টিন কেটে, পিটিয়ে তিনজন শ্রমিকের সঙ্গে নিজেও দিনরাত ঘাম ঝরাতেন। এভাবে একটু একটু স্বপ্নের ভিত তৈরি হচ্ছিল। ১৯৯১ সাল থেকে ট্রাংক তৈরির পাশাপাশি বালতি বানানোর ব্যবসাও শুরু করেন। কিন্তু ভাগ্য যেন নাছোড়বান্দা। ফের কঠিন পরীক্ষা নিতে চাইল। ১৯৯৩ সালের ভয়াবহ বন্যা সব ভাসিয়ে নিয়ে গেল। চরম ক্ষতির মুখে পড়ে সেই ব্যবসায় তালা।

চন্দন তবুও হাল ছাড়ার পাত্র নন। ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়েই বড় ফার্নিচারের কারখানা খোলার স্বপ্ন দেখলেন। কিন্তু আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনার টাকা কই? ভরসা কেবল ব্যাংকঋণ। ১৯৯৯ সালের ডিসেম্বরে ওয়েস্ট বেঙ্গল ফিন্যান্স কর্পোরেশন থেকে প্রথম সরকারি ঋণ পেলেন। তবে মাত্র ১৮ হাজার টাকা। আর সেই সামান্য টাকাটা মঞ্জুর করাতেও তাঁকে অন্তত ৩০ বার ব্যাংকের দরজায় কড়া নাড়তে হয়েছিল। ওই টাকায় কারখানা করা যে একপ্রকার অসম্ভব, তা বুঝেই পরে ভাইকে সঙ্গে নিয়ে এক লক্ষ টাকার কম্পোজিট ঋণ পান। নতুন মেশিনের দাম অনেক, তাই নিলামে ওঠা পুরোনো যন্ত্রপাতি কিনেই স্বপ্নের কারখানার কাজ শুরু হয়।

সেই কারখানায় আজ জার্মানি, জাপান ও ইতালির অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মেশিনের ছড়াছড়ি। নির্দিষ্ট রঙের কোড ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে অন্তত ২৫ রকমের চোখধাঁধানো আসবাবপত্র। মালপত্র পরিবহণের জন্য নিজস্ব গাড়ির বহর রয়েছে। শুধু কি তাই, চৌপথি এবং নিউ আলিপুরদুয়ারে রয়েছে পাঁচটি নিজস্ব শোরুম। শিলিগুড়ির বাণেশ্বর মোড় ও আশিগড় এলাকাতেও তাঁর বিশাল দোকান। আজ চন্দনের কারখানায় প্রত্যক্ষভাবে ১০০ জন এবং পরোক্ষভাবে ৪০০-র বেশি মানুষ কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন। তবে কোটিপতি হলেও চন্দন কর্মীদের নিজের পরিবার ভাবেন। কর্মীদের নিয়ে পিকনিক, পুজোয় ঘোরা থেকে বিদেশ ভ্রমণ- সবই করেন। তাই কর্মীদের কাছে তিনি ‘বড়দা’। নিজের পড়াশোনা না হলেও বিভিন্ন স্কুলে আর্থিক অনুদান দেন। ক্ষুদ্র জায়গায় এমন শিল্প গড়ার অনন্য লড়াইয়ের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০১ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রক তাঁকে ‘ভারতীয় উদ্যোগ রত্ন’ পুরস্কারে ভূষিত করেছে। আগামীদিনে হোটেল ও পর্যটন শিল্পে পা রাখার স্বপ্ন দেখছেন। শিলিগুড়িতে ইতিমধ্যেই পার্টনারশিপে একটি ঝাঁ চকচকে হোটেল তৈরির কাজ শুরু হয়েছে।

নতুন উদ্যোগপতিদের জন্য চন্দনের পরামর্শ, ‘শূন্য থেকে শুরু করে এখানে এসেছি। বহুবার নানা বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয়েছে। তবে আমি কখনও হাল ছাড়িনি।’ হাল না ছাড়ার মন্ত্রই যে সাফল্যের মূলে, সেটাই তিনি সবাইকে বারে বারে মনে করিয়ে দিতে চান।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *