অনিশ্চিত জীবন ও অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার

শিক্ষা
Spread the love


অঞ্জন বসু

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মদিন এলেই তাঁর জীবনী, উপন্যাসের তালিকা কিংবা জনপ্রিয়তার কথা নতুন করে মনে পড়ে। কিন্তু ১৫০তম জন্মবার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে আরও জরুরি একটি প্রশ্ন, কেন এত বছর পরেও শরৎচন্দ্র আমাদের পাঠের বাইরে চলে গেলেন না? ১৮৭৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর দেবানন্দপুরে জন্মেছিলেন তিনি। শৈশবের বড় অংশ কেটেছে ভাগলপুরে, আর্থিক অনটন তাঁর পড়াশোনার পথ বারবার থামিয়েছে। পরে রেঙ্গুনে চাকরি করেছেন, সাধারণ মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশেছেন। সেই জীবনই তাঁকে দিয়েছে এমন এক অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার, যা তাঁর সাহিত্যের মানুষগুলিকে কাগুজে চরিত্র হতে দেয়নি। জীবনের প্রতিটি বাঁকে ছিল অনিশ্চয়তা। কখনও পড়া থেমেছে, কখনও চাকরি গিয়েছে, কখনও ঘর ছাড়তে হয়েছে। তবু লেখার টান থামেনি। মানুষের জীবনকে কাছে থেকে দেখার সুযোগই ধীরে ধীরে তাঁর সাহিত্যকে দিয়েছে আলাদা মাটি, আলাদা গন্ধ এবং আলাদা বিশ্বাস।

শরৎচন্দ্রের পাঠকেরা তাঁর চরিত্রগুলিকে মনে রাখেন শুধু কাহিনীর জন্য নয়, তাঁদের অসহায়তা, অভিমান, প্রেম ও প্রতিবাদের জন্য। তাঁর নারী চরিত্রগুলি বিশেষভাবে মনে করিয়ে দেয়, সামাজিক নিয়ম আর ব্যক্তির ইচ্ছার সংঘাত নতুন কোনও বিষয় নয়। পরিণীতা, পল্লীসমাজ, চরিত্রহীন, গৃহদাহ কিংবা শেষ প্রশ্নে নারী শুধু কারও স্ত্রী, কন্যা বা প্রেমিকা নয়, নিজের সিদ্ধান্ত, সংকট ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ে উপস্থিত। প্রেমের পাশাপাশি শিক্ষা, বিয়ে, পরিবার এবং সামাজিক মর্যাদা নিয়েও তাঁদের প্রশ্ন আছে। আজ নারী স্বাধীনতা, সম্পর্কের স্বাধীনতা, সামাজিক বিচার এবং ব্যক্তিগত পছন্দ নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তার সব উত্তর শরৎচন্দ্রের লেখায় নেই। কিন্তু প্রশ্নগুলি যে নতুন নয়, সেই বোধ তিনি অনেক আগেই তৈরি করে দিয়েছিলেন।

শরৎচন্দ্রের আরেকটি বড় শক্তি ছিল প্রান্তিক ও অবহেলিত মানুষের দিকে তাকানোর ক্ষমতা। তাঁর নিজের জীবনও ছিল অভাব, অনিশ্চয়তা ও দেশান্তরের অভিজ্ঞতায় ভরা। রেঙ্গুনে তিনি শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশেছেন। তাঁদের দৈনন্দিন জীবন, সংকট ও সংগ্রাম কাছ থেকে দেখেছেন। তাঁর সাহিত্যেও তাই সমাজের তথাকথিত কেন্দ্রের বাইরে থাকা মানুষের জীবন বারবার সামনে এসেছে। এই কারণেই তাঁর লেখা পড়লে মনে হয়, তিনি দূর থেকে সমাজকে দেখছেন না, মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে দেখছেন। বর্তমানের দ্রুত বদলে যাওয়া সমাজেও এই দৃষ্টিটিই মূল্যবান। শহর বদলেছে, কাজের ধরন বদলেছে, অর্থনীতির ভাষা বদলেছে, তবু প্রান্তে থাকা মানুষের অস্বস্তি আজও সহজে শেষ হয়নি। উন্নয়ন, সাফল্য কিংবা সামাজিক মর্যাদার আলোয় যাঁরা সহজে দৃশ্যমান হন না, তাঁদের জীবনও যে সাহিত্যের বিষয় হতে পারে, শরৎচন্দ্র তার বড় উদাহরণ।

আজকের পাঠকের সঙ্গে শরৎচন্দ্রের যোগ আরও একটি জায়গায়। তিনি মানুষের নৈতিক বিচারকে সহজ করে দেননি। তাঁর চরিত্ররা ভুল করে, দ্বিধায় পড়ে, ভালোবাসে, আবার সেই ভালোবাসা থেকে সরে যায়। সমাজ যাকে অপরাধ বলে, ব্যক্তির কাছে তা সবসময় একই অর্থ বহন করে না। ফলে শরৎচন্দ্রকে পড়া মানে শুধু পুরোনো সময়ের গল্প পড়া নয়, নিজের সময়ের মানুষকেও নতুন করে দেখা। তাঁর মানুষগুলি নিখুঁত নয়, আর সেই অসম্পূর্ণতাই আজকের পাঠকের কাছে তাঁদের বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। সম্পর্কের ভাঙন, সামাজিক অসমতা, নারীর উপর চাপ, মধ্যবিত্তের সংকট কিংবা প্রতিষ্ঠিত নিয়মের বিরুদ্ধে ব্যক্তির নীরব প্রতিবাদ, এসব আজও আমাদের চারপাশে আছে। সময় বদলেছে, মানুষের পোশাক বদলেছে, যোগাযোগের মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু মানুষের ভিতরের টানাপোড়েন ততটা বদলায়নি।

এই কারণেই শরৎচন্দ্রের ১৫০তম জন্মবার্ষিকী শুধু স্মরণ করার দিন নয়, তাঁকে আবার পড়ার দিন। তাঁর জনপ্রিয়তা শুধু সহজ ভাষার কৃতিত্ব নয়, মানুষের প্রতি গভীর সহানুভূতিই তাঁকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে। যে লেখক সাধারণ মানুষের প্রেম, দুঃখ, অপমান, স্বপ্ন এবং ছোট ছোট আকাঙ্ক্ষাকে সাহিত্যের কেন্দ্রে এনেছিলেন, তিনি আজও আমাদের কাছে প্রয়োজনীয়। শরৎচন্দ্রের সময় আর আমাদের সময় এক নয়। কিন্তু মানুষকে বোঝার জন্য মানুষের কাছেই ফিরে যেতে হয়। তাঁর বই এখনও নতুন পাঠকের হাতে পৌঁছায়, নতুন করে পড়া হয়, নতুন প্রশ্নের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। ১৫০ বছর পরেও তাই শরৎচন্দ্র কেবল বাংলা সাহিত্যের অতীত নন, আমাদের বর্তমানেরও এক পরিচিত মুখ।

(লেখক অবসরপ্রাপ্ত সরকারি আধিকারিক। সোনারপুরের বাসিন্দা।)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *