যেভাবে হোক ক্ষমতা দখল মূল লক্ষ্য হয়ে উঠলে দেউলিয়াপনা বেআব্রু হয়। কোচবিহারের সাংসদ জগদীশচন্দ্র বর্মা বসুনিয়া তার বড় প্রমাণ। তিনি কোন দলের সাংসদ- বলা কঠিন। তাঁর নিজের দাবি, তিনি তৃণমূলে ছিলেন। মাস চারেক আগে এনসিপিআই-এ যোগ দিয়েছিলেন। নিজেই কবুল করছেন, এনসিপিআই তাঁর ঘোর অপছন্দের। এখন বিজেপিতে যোগ দেওয়ার জন্য শুরু হয়েছে তাঁর হ্যাংলামি। কোচবিহারের সাংসদ তিনি। তবে শুধু কোচবিহার জেলা নয়, নিজের গ্রাম সিতাই তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছে।
মাঝে দু’বার ব্যর্থ চেষ্টার পর সদ্য চুপিচুপি ফের বাড়ি ফিরেছেন পাখিডাকা ভোরে ব্যাপক পুলিশি পাহারায়। নিরাপত্তার এই বন্দোবস্তের জন্য কম হ্যাংলামি করতে হয়নি সস্ত্রীক জগদীশকে। কখনও উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিকের সঙ্গে দেখা করেছেন। বিজেপিতে তাঁর অন্তর্ভুক্তির আপত্তিকারীদের অন্যতম নিশীথ। দেখা করে চিঁড়ে ভেজাতে না পেরে জগদীশ সস্ত্রীক কাঁথিতে গিয়ে শুভেন্দু অধিকারীর বাবা শিশির অধিকারীর সঙ্গে দেখা করে এসেছেন।
নবান্নে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর হাতে উপহারও তুলে দিয়ে এসেছেন। কিন্তু এলাকায় এখন বিজেপির প্রভাব যথেষ্ট হলেও স্থানীয়দের ক্ষোভ এড়াতে পারছেন না। তাই গায়ে বিজেপির তকমা সেঁটে নেওয়ার জন্য শুরু হয়েছে হ্যাংলামির আরেক পর্ব। বিজেপি তাঁকে গ্রহণ করবে- এমন ঘোষণা করেনি। বিজেপির কর্মী-সমর্থকরা জগদীশের প্রবল সমালোচক। অথচ তিনি প্রচার শুরু করে দিয়েছেন যে, বিজেপিতে তাঁর যোগদান তো এখন সময়ের অপেক্ষা।
তৃণমূল ত্যাগী ২০ সাংসদের মধ্যে তিন মুসলিমকে বাদ দিয়ে বাকিদের পুজোর আগে বিজেপিতে যোগদান নাকি পাকা। ক্ষমতার কারবারে নীতি, মতাদর্শের ধার-কাছ দিয়ে কখনও হেঁটেছেন বলে জগদীশের সুনাম নেই। নেতাদের অতি ঘনিষ্ঠ হয়ে বিভিন্ন দলে জনপ্রতিনিধির পদ বাগিয়ে নিতে তিনি সিদ্ধহস্ত বলে প্রচার আছে। অতীতে ছিলেন ফরওয়ার্ড ব্লকে। পঞ্চায়েত ও পঞ্চায়েত সমিতি স্তরে ক্ষমতার ক্ষীর চেটেপুটে খেয়েছেন।
বাম জমানা বদল হতেই তিনি তৃণমূলে আশ্রয় নিয়ে ফেলেন দ্রুত। নেতাদের তোষামোদে চরিত্র থাকার সুবাদে দ্রুত ক্ষমতার কাছাকাছি চলে যান। হয়ে যান তৃণমূল সাংসদ। যাঁকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূলের রাজবংশী মুখ হয়ে ওঠার সুযোগ দিয়েছিলেন, তৃণমূল হারতেই তিনি চলে গেলেন বিজেপির বলয়ে। এ যেন এবেলা-ওবেলা দল পালটানোর পারদর্শিতা। ভোটের কারবারে আয়ারাম-গয়ারামদের সাক্ষাৎ উত্তরসূরি যেন। যাঁর কাছে ক্ষমতাই মোক্ষ।
কিন্তু বিজেপি সরাসরি তাঁকে ও বাকি ১৯ সাংসদকে গ্রহণ করেনি। কিন্তু তাঁদের এনসিপিআই-এ অন্তর্ভুক্তি যে বিজেপির চিত্রনাট্য মেনে, তা প্রকাশ্যে আসছে জগদীশের কথায়। কোচবিহারের সাংসদ কবুল করছেন, এনসিপিআই-এ তাঁদের অন্তর্ভুক্তির ব্যবস্থা করে দিয়েছে বিজেপিই। কিন্তু তাতে ক্ষমতার ধারে-কাছে যাওয়া যাবে না বা বাড়িতে নিশ্চিন্তে থাকা অসম্ভব বুঝে সরাসরি বিজেপির কোলে ওঠার জন্য শুরু হয়েছে মরিয়া প্রয়াস।
হ্যাংলার মতো প্রচার করছেন, প্রধানমন্ত্রী যাঁর সঙ্গে ডিনার করেন, মুখ্যমন্ত্রী যাঁর সঙ্গে বৈঠক করেন, তাঁকে বুঝতে ভুল করছেন বিজেপির স্থানীয় কর্মী-সমর্থকরা। একবার গায়ে গেরুয়া ছাপটা সরাসরি মেখে এই বাধাটা দূর করার জন্য যা নয় তাই প্রচার শুরু করেছেন। তাতে কখনো-কখনো সতীর্থদের সঙ্গে মতানৈক্য হলেও ভ্রূক্ষেপ নেই ক্ষমতালোভী সাংসদের। তাঁর সতীর্থ শতাব্দী রায় ইতিমধ্যে পুজোর আগে তাঁদের বিজেপিতে যোগদানের খবর জানা নেই বলেছেন।
মুসলিম তিন সাংসদের অন্যতম আবু তাহের তাঁদের বাদ দিয়ে বাকি ১৭ সাংসদের পদ্মে অন্তর্ভুক্তি বা তাঁদের তিনজনের বাইরে থেকে এনডিএ-কে সমর্থন ইত্যাদি জগদীশের প্রচারকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাতে অবশ্য জগদীশের কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। তিনি নিজের স্বার্থ গোটাতে এতই মরিয়া যে প্রয়োজনে সতীর্থদের বাদ দিয়ে চলতেও রাজি কার্যত। ক্ষমতার কারবারের দেউলিয়াপনার চূড়ান্ত উদাহরণ যেন কোচবিহারের সাংসদ।

