যোগ-বিয়োগ
- মনীষিতা নন্দী
তখন বিকেল হয়ে এসেছে। আলতো আদর মাখিয়ে লুকোচুরি খেলছে শেষ বেলার আশ্বিন রোদ। তিস্তাকে বামে রেখে কাশবন ভেদ করে হেঁটে যাচ্ছে দিদি আর ভাই। বছর পাঁচেক ব্যবধান। রক্তের যোগাযোগ আছে কি নেই, জানা নেই। তবু এই হেঁটে যাওয়াটুকু সত্যি। বেশ কয়েকমাস পর দেখা। ভাই জানাল, হারিয়েছে তার সূর্যোদয়ের গান। দিদি জানে, এই সূর্যোদয় আর কিছু নয়, প্রেমিকার সমনাম। সে স্বাভাবিকভাবেই কারণ শুনতে চেয়ে, জেনেছিল, প্রেমিকা বিষয়হীনতার ভারে ক্লান্ত। সহজ কথায় গরিব, লক্ষ্যভ্রষ্ট, শুধু শিল্পী হয়ে বাঁচতে চাওয়া প্রেমিকের ‘ভরসা’ হতে হতে ক্লান্ত।
এবার ভাই শুনবে দিদির কথা। সে মেয়ে আবার বড্ড অভিমানী, বিরহিনী। সদ্য সে মা হয়েছে। মা দুর্গার মা। ছুঁয়ে নেবার আগেই দুর্গা ভেসে গেছে বাঁশির সুরে। ভাই বুঝেছে, ‘কন্যাভ্রূণ’ হবার অপরাধে পৃথিবীর আলো-হাওয়া দেখা হয়নি তার। সমস্ত বিসর্জন শেষে, শারদ বিকেলের মিঠে রোদে দিদি আর ভাই হাতে হাত রাখল। দূরে কাশঝাঁকের বুক ফেটে বেরিয়ে আসছে রেলগাড়িটা। ওধারের লুকোনো রেলের রাস্তাটা ওদের পরিচিত। বিকেল গড়িয়ে রাত। তারপর রাতভোর। এই শেষটায় বিচ্ছেদ ছিল না। ততক্ষণে দেখা মিলেছে অপু-দুর্গার, আবারও বছর কুড়ি পর। চোখের পাতা স্থির। অসাড় দুটো শরীর সম্পূর্ণ ক্ষতবিক্ষত। রক্তাক্ত।
অদৃশ্য দশভুজা
- কাকলি ভদ্র
ষোল বছর বয়স পর্যন্ত টুপুরের পৃথিবীটা ছিল স্নিগ্ধ এক কাচের খেলনার মতো… নিটোল, সুরক্ষিত এবং মখমলে মোড়া। কিন্তু নিয়তির এক নির্মম অমোঘ ঝড়ে তাদের সেই সুখের আলপনা-আঁকা সংসার নিমেষে চুরমার হয়ে গেল। বাবা-মায়ের আকস্মিক প্রয়াণের অবর্ণনীয় শোকের ছায়া কাটতে না কাটতেই নিজের কাকারা সূক্ষ্ম চালে কেড়ে নিল তাদের পৈতৃক স্নেহের শেষ আশ্রয়টুকু। আট বছরের অনুজ রিদমের হাত ধরে কলকাতার রুক্ষ রাজপথে এসে দাঁড়াল সে।
কিন্তু নিয়তির এই রুদ্র প্রাঙ্গণে কান্নার অবকাশ কোথায়? যে কোমল হাত দুটিতে একসময় কেবল অলীক রূপকথার বই শোভা পেত, সেই হাতগুলো জীবনসংগ্রামের তাগিদে হয়ে উঠল দশ হাতের সমান অপ্রতিরোধ্য। ভোর চারটের আলো-আঁধারিতে উঠে মানুষের ঘরে ঘরে টিফিন ক্যারিয়ার পৌঁছে দেওয়া, দুপুরের হাড়ভাঙা খাটুনির ফাঁকে সময় বাঁচিয়ে সান্ধ্যকালীন ল’ কলেজের ক্লাস করা, বিকেলের টিউশনির ক্লান্তি আর গভীর রাতে কম্পিউটারের পর্দায় অনলাইনে কাজ… সব প্রতিকূলতার অসুরকে সে একা হাতে বধ করতে লাগল। নিজের নবযৌবন, সুনিদ্রা আর ব্যক্তিগত স্বপ্নকে যজ্ঞের সমিধের মতো আহুতি দিয়ে তিলে তিলে সে আগলে রাখল রিদমকে।
কেটে গেছে পনেরটা বছর… আজ রিদমের এক বহুজাতিক সংস্থায় যোগ দেওয়ার প্রথম মাস পূর্ণ হয়েছে। জীবনের প্রথম উপার্জনের অর্ঘ্যটি দিদির জীর্ণ হাতে সমর্পণ করে রিদম ডুকরে কেঁদে উঠল। ফিসফিস করে বলল, ‘দিদি… লোকে বলে দেবীর মৃন্ময়ী রূপ কেবল মণ্ডপেই বন্দি থাকে, কিন্তু আমার জীবনের দশভুজা তুমিই!’
টুপুর রিদমের মাথায় স্নেহের হাত রেখে একটি পুরোনো চাবির গোছা আর ফাইল তুলে দিল।
-এটা কি দিদি?
– এই পনেরো বছরে আমি অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মোক্ষম অস্ত্রটা শানিয়েছি। তোর দিদি আজ হাইকোর্টের রেজিস্টার্ড অ্যাডভোকেট। কাকাদের হারিয়ে আমাদের বাড়ি উদ্ধার করেছি। কালই আমরা সেখানে ফিরছি!
চাবির গোছা স্পর্শ করে রিদমের মনে হল, যে দিদির আঁচল ধরে সে একদিন পথ হারিয়েছিল, সেই দিদির কালো কোট যেন তাদের হারিয়ে যাওয়া রাজপ্রাসাদ পুনরুদ্ধার করার এক জাদুকরি বর্ম!
The put up অণুগল্প appeared first on Uttarbanga Sambad.
