মিঠুন ভট্টাচার্য, শিলিগুড়ি : মাসির পরিচিত এক মহিলা বলেছিল, শিলিগুড়িতে কাপড়ের দোকানে কাজ দেবেন। সেই কথা সরল মনে বিশ্বাস করেছিল অরুণাচল প্রদেশের ফুলবাড়ির বছর ১৭-র এক কিশোরী। সেটার কারণে যে তার ঠাঁই হবে যৌনপল্লিতে, তা কল্পনা করেনি। যদিও শেষমেশ নিজের বুদ্ধি এবং এক শিশুর সাহায্যে অন্ধকার কুঠুরির জাল কেটে বেরিয়ে আসতে পেরেছে সে। মুক্তির সেই গল্প হার মানাবে কোনও সিনেমার চিত্রনাট্যকেও। এনজেপি থানার পুলিশ কিশোরীকে উদ্ধার করেছে। শিলিগুড়ি পুলিশ কমিশনারেটের এক আধিকারিক বলেছেন, ‘ঘটনার তদন্ত চলছে।’
এদিকে, কিশোরী পুলিশকে জানিয়েছে, তার বাবা-মা গত হয়েছেন বেশ কয়েকবছর আগে। এরপর থেকে মাসির বাড়িতে থাকছে সে। সপ্তম শ্রেণির পর আর পড়াশোনা করা হয়ে ওঠেনি। সংসারে অভাবের কারণে সে কাজের খোঁজে অঞ্জলি নামে এক মহিলার সঙ্গে শিলিগুড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়। সোমবার সকালে এখানে এসে পৌঁছায়। কিন্তু ওই মহিলা যে তাকে কাজের টোপ দিয়ে শহরের যৌনপল্লিতে বিক্রি করে দেবে, তা ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি কিশোরী। তাকে বিক্রি করে দেওয়া হয় খালপাড়ার যৌনপল্লিতে। ছিনিয়ে নেওয়া হয় ফোন। ভেঙে দেওয়া হয় সিম কার্ড। এক ঘণ্টা তাকে আটকে রাখা হয় অন্ধকার একটি ঘরে। বাড়ি ছেড়ে এসে এভাবে অথই জলে পড়বে, তা সে ভাবতে পারেনি। যদিও ভাগ্য সহায় থাকায় এ যাত্রায় অতলে হারিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছে মেয়েটি।
কুঠুরিতে বসে বসেই কিশোরী আঁটছিল সেখান থেকে পালানোর ফন্দি। কিন্তু পালাবে কীভাবে, দরজা যে বাইরে থেকে আটকানো। বারবার ধাক্কিয়েও তা খুলছিল না। চিৎকার করেও মিলছিল না কারও সাড়া। এক পর্যায়ে এসে হাল ছেড়ে দেয়। কিন্তু ওই যে রাখে হরি মারে কে! সেই সময় আচমকাই দেবদূতের মতো বন্ধ দরজার সামনে এসে হাজির হয় ৪-৫ বছরের যৌনপল্লির বাসিন্দা এক শিশু। খানিকটা খেলার ছলেই সে হুড়কা খুলে দেয়। প্রথমে কিশোরী ভেবেছিল, হয়তো পল্লিরই কোনও ‘মাসি’ বা ‘হোমড়াচোমড়া’ কেউ দরজা খুলেছে। কিন্তু বাইরে বেরিয়ে এসে দেখে, এক শিশু দাঁড়িয়ে। এরপর কিশোরী পা টিপেটিপে কিছুটা এগিয়ে দেখে নেয় আশপাশে কেউ আছে কিনা। পরিস্থিতি বুঝেই দে ছুট। সেখান থেকে কোনওরকমে পালিয়ে কিশোরী পথচলতি লোকজনকে জিজ্ঞেস করে করে পৌঁছে যায় এনজেপিতে।
এদিন ওই কিশোরী বিকেল পর্যন্ত এনজেপি স্টেশনের পার্কিং চত্বরে বসেছিল। সন্ধ্যায় স্থানীয় কয়েকজন তাকে বসে থাকার কারণ জিজ্ঞেস করতেই সে কান্নায় ভেঙে পড়ে। ধীরে ধীরে মেয়েটি ঘটনার কথা তাঁদের সামনে তুলে ধরে। এরপর স্থানীয়রা তাকে পাশের আইএনটিটিইউসি অফিসে নিয়ে যান। সেখানে তখন উপস্থিত ছিলেন তৃণমূলের শ্রমিক নেতা সুজয় সরকার। তিনি পুলিশকে খবর দেন। পরে এনজেপি থানার পুলিশ এসে কিশোরীকে উদ্ধার করেছে।
নাবালিকার কথায়, ‘অঞ্জলি নামে এক মহিলা আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে। সুযোগ বুঝে পালিয়ে এসেছি।’ অন্যদিকে সুজয়ের বক্তব্য, ‘যারা এই ধরনের কাজে যুক্ত তাদের কঠিন শাস্তি হওয়া উচিত।’ পুলিশ ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে।
