অটলজির সেই রাজধর্ম পালন করতে হবে

অটলজির সেই রাজধর্ম পালন করতে হবে

আন্তর্জাতিক INTERNATIONAL
Spread the love


মাখনলাল সরকার

জীবনের আটানব্বইটা বসন্ত পেরিয়ে আজ যখন স্মৃতির পাতায় চোখ রাখি, তখন মনে হয়, শুধু এই একটা দিন দেখার জন্যই বোধহয় ঈশ্বর আমায় বাঁচিয়ে রেখেছেন!

১৯৫২ থেকে ২০২৬- সুদীর্ঘ সাতটা দশকের এক ক্লান্তিকর অথচ রোমাঞ্চকর পথচলা। আজ সেই অপেক্ষার বৃত্ত যেন সম্পূর্ণ হল। বাংলায় প্রথমবার ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি, অবসান ঘটেছে দীর্ঘ অপশাসনের। কী যে এক অনাবিল আনন্দ আজ বুকের ভেতর উথালপাতাল করছে, তা ভাষায় প্রকাশ করার সাধ্য এই বৃদ্ধের নেই।

আজ যখন মুখ্যমন্ত্রীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে দেশের ২০টি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গে একই মঞ্চে বসে আছি, বারবার নিজেকে যেন চিমটি কেটে দেখছি, এ স্বপ্ন নয় তো!

যে মানুষটার দিকে আজ গোটা দেশ তাকিয়ে, সেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যখন এই অশীতিপর বৃদ্ধকে পরম শ্রদ্ধায় বুকে টেনে নিলেন, নতজানু হয়ে প্রণাম জানালেন, তখন দু’চোখ আর বাঁধ মানেনি। আমার জীবনের এক পরম প্রাপ্তি এই ক্ষণটি। আমাকে জড়িয়ে ধরে তিনি অকপটে বললেন, ‘আপনাদের মতো মানুষদের ঘাম আর পরিশ্রমের বুনিয়াদেই আজ আমরা দেশ শাসন করছি। এবার বাংলাও দলের দখলে এল।’ আনন্দে আপ্লুত হয়ে আমিও তাঁকে অভিনন্দন জানালাম। তবে দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার নির্যাস থেকে একটা কথা স্মরণ করিয়ে দিতে ভুলিনি, অটলজি যে ‘রাজধর্ম’-এর কথা বলতেন, সেই রাজধর্ম যেন এখানে অক্ষরে অক্ষরে পালিত হয়। আমার এই কথা শুনেই বিজেপির প্রথম মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজে এসে বিনীতভাবে কথা দিলেন, তিনি সর্বতোভাবে রাজধর্ম পালনে ব্রতী হবেন।

মঞ্চে বসে আজ বারবার স্মৃতির পর্দায় ভেসে উঠছে ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সেই তেজোদ্দীপ্ত মুখখানা। ১৯৫২ সাল। ওঁর সঙ্গেই কাশ্মীরে জাতীয় পতাকা তুলতে গিয়েছিলাম। ফলস্বরূপ গ্রেপ্তার হতে হল। কিন্তু আরএসএস নেতা পণ্ডিত প্রেমনাথ ডোগরার তীব্র প্রতিবাদের জেরে আমাকে ৩৯ দিন কাশ্মীরে নজরবন্দি করে রাখা হয়, ছিলাম তাঁর বাড়িতেই। সেখান থেকে দিল্লি ফিরে জাতীয়তাবাদী গান গাওয়ার অপরাধে ফের পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হলাম। পরদিন আদালতে চালান। আমার আইনজীবীর অকাট্য যুক্তি ছিল, আরএসএস যখন নিষিদ্ধ নয়, তখন তাদের গান গাওয়া অপরাধ হবে কেন? স্বয়ং বিচারপতির নির্দেশে ভরা এজলাসে আমাকে সেই গান গাইতে হল। গান শুনে মুগ্ধ বিচারপতি উলটে পুলিশকেই একশো টাকা জরিমানা করে সেই টাকা আমাকে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। সসম্মানে পুলিশ আমাকে হাওড়াগামী ট্রেনে তুলে দিল। সেই জেলযাত্রা, সেই লড়াইয়ের দিনগুলো আজ বুকের ভেতর এক অদ্ভুত নস্টালজিয়ার ঢেউ তুলছে।

কয়েক দশক ধরে শিলিগুড়ির ডাবগ্রামেই আমার আস্তানা। ১৯৮০ সালে যখন বিজেপি আত্মপ্রকাশ করল, আমাকে পশ্চিম দিনাজপুর, জলপাইগুড়ি ও দার্জিলিংয়ের কনভেনার করা হল। মাত্র এক বছরের মধ্যে ১০ হাজার সদস্যকে দলে যুক্ত করেছিলাম, যা সেই সময় রাজ্যে এক নজিরবিহীন ঘটনা। ১৯৮১ থেকে টানা সাত বছর জেলা সভাপতির দায়িত্ব সামলেছি। দলে দু’বছরের বেশি সভাপতি থাকার নিয়ম না থাকলেও, অটলবিহারী বাজপেয়ীর বিশেষ নির্দেশে রাজ্য কমিটি আমাকে ওই পদে রেখে দেয়। অটলজি শিলিগুড়িতে সভা করতে এসেছিলেন আমি সভাপতি থাকাকালীন। সুষমা স্বরাজ আমৃত্যু প্রতি বছর পরম স্নেহে আমাকে রাখি পাঠাতেন। আজও শমীক ভট্টাচার্য বা সুকান্ত মজুমদারের মতো নেতারা এলে এই বৃদ্ধকে অন্তত একবার ছুঁয়ে যান।

সবার মতো আমিও একটা পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখতাম। স্বাধীনতা পরবর্তী এতগুলো দশকে সেই স্বপ্নটাকে বুকের গভীরে সযত্নে লালন করেছি। তৃণমূলের অপশাসনকে দুরমুশ করে বিজেপি যখন ২০৭ আসনে জয় হাসিল করল, তখন বারবার চোখের কোণ চিকচিক করে উঠছিল। তখনও ভাবিনি, শপথগ্রহণের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হওয়ার ডাক পাব।

শুক্রবার সন্ধ্যার বিমানে বাগডোগরা থেকে যখন কলকাতায় পাড়ি দিচ্ছি, জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। সন্ধ্যার আকাশে কালো মেঘের বুক চিরে আমাদের উড়োজাহাজ যেমন আপন গন্তব্যে স্থির হচ্ছিল, ঠিক তেমনই যেন এই বাংলার যাবতীয় অপশাসনের ঘনঘটা কাটিয়ে সুশাসনের আলো নিশ্চিত করল বিজেপি। আর বেশি দূরে নেই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের স্বপ্নের সেই কাঙ্ক্ষিত ‘সোনার বাংলা’।

 



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *