Nishith Pramanik | অঙ্ক কষেই ‘ফার্স্টবয়’ নিশীথ, সোশ্যাল মিডিয়ায় চর্চা শিলিগুড়ির শংকরকে নিয়ে

Nishith Pramanik | অঙ্ক কষেই ‘ফার্স্টবয়’ নিশীথ, সোশ্যাল মিডিয়ায় চর্চা শিলিগুড়ির শংকরকে নিয়ে

শিক্ষা
Spread the love


শুভঙ্কর চক্রবর্তী

শনিবার ব্রিগেডে রাজ্য মন্ত্রীসভার শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে উত্তরবঙ্গ থেকে একমাত্র মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন নিশীথ প্রামাণিক (Nishith Pramanik)। তারপরই উত্তরের রাজনৈতিক মহলে নতুন চর্চা শুরু হয়েছে। ভোটের ফল ঘোষণার পর জল্পনা ছড়িয়েছিল, শিলিগুড়ির জয়ী প্রার্থী শংকর ঘোষ (Shankar Ghosh) পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেতে চলেছেন। গত দু’দিনে সম্ভাব্য মন্ত্রীসভার একাধিক ভুয়ো তালিকা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। প্রতিটি তালিকাতেই শংকরকে মন্ত্রী হিসাবে দেখানো হয়েছে। তাঁর মতো সুবক্তা ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতা প্রথম দিনেই মন্ত্রীসভায় জায়গা করে নেবেন, এমনটাই ধরে নিয়েছিলেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশও। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে প্রথম দফার শপথ থেকে শংকরকে বাদ রেখে নিশীথের ওপর ভরসা রেখেছে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব। কেন অগ্রাধিকার পেলেন নিশীথ, কেন প্রথম শপথে বাদ পড়লেন শংকর তা নিয়ে শনিবার সকাল থেকেই সরগরম ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ। যদিও রাজ্য বিজেপি নেতারা বলছেন, বাস্তবসম্মত রাজনৈতিক অঙ্ক কষে উত্তরের সামাজিক সমীকরণ এবং ভোটব্যাংকের নিরিখেই এগিয়ে গিয়েছেন নিশীথ।

রাজ্য ও কেন্দ্রীয় বিজেপি নেতৃত্বের মতে, নিশীথকে বেছে নেওয়ার প্রধান কারণটি লুকিয়ে রয়েছে উত্তরবঙ্গের জাতিগত সমীকরণের মধ্যে। কালিম্পং বাদে উত্তরের সাত জেলার ভোটব্যাংকের রাজনীতিতে রাজবংশী সম্প্রদায় একটি বড় এবং নির্ণায়ক শক্তি। নিশীথ সেই সম্প্রদায়ের একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী মুখ। ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে উদয়ন গুহকে হারিয়ে রাজবংশী ভোটব্যাংকের ওপর তাঁর মজবুত নিয়ন্ত্রণের প্রমাণ দিয়েছেন নিশীথ। বিজেপি নেতৃত্ব খুব ভালো করেই জানে, উত্তরবঙ্গে নিজেদের জমি ধরে রাখতে গেলে রাজবংশী সম্প্রদায়কে ক্ষমতায়নের বার্তা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। রাজবংশী ভোটের কথা মাথায় রেখে নগেন রায়কে রাজ্যসভায় পাঠিয়েছিল দল। তবে নগেন তৃণমূলের সঙ্গে সখ্য রেখে চলছিল। বিজেপির হয়ে ভোট প্রচারেও তাঁকে নামানো যায়নি। তাই নগেনকে বার্তা দেওয়া এবং রাজবংশী সমাজের কাছে নগেনের বিকল্প তৈরি করাও জরুরি ছিল। সেদিক থেকে নিশীথের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, শংকর ঘোষ মূলত শিলিগুড়ি শহরকেন্দ্রিক এবং শহুরে মধ্যবিত্ত শিক্ষিত বাঙালির প্রতিনিধি। বৃহত্তর গ্রামীণ ও জাতিগত ভোটব্যাংকের নিরিখে তিনি নিশীথের থেকে পিছিয়ে পড়াতেই প্রথম মন্ত্রী হিসেবে কোচবিহারের দাপুটে নেতাকে বেছে নিয়েছে দল।

প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার দিক থেকেও নিশীথ এই দৌড়ে অনেকটাই এগিয়ে ছিলেন। তিনি এর আগে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র এবং যুবকল্যাণ ও ক্রীড়া দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে কাজ করেছেন। কেন্দ্রীয় স্তরে কাজ করার সুবাদে প্রশাসন পরিচালনা এবং আমলাতন্ত্রের সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়ে তাঁর সম্যক ধারণা রয়েছে। রাজ্যে নতুন সরকার গঠনের পর এমন নেতার প্রয়োজন যিনি প্রশাসনিক গুরুদায়িত্ব পালনে পারদর্শী। শংকর ঘোষ বিধায়ক হিসেবে অত্যন্ত সফল হলেও তাঁর মন্ত্রিত্ব সামলানোর অভিজ্ঞতা নেই। এই অভিজ্ঞতার অভাবেই হয়তো প্রথম দিন তাঁকে অপেক্ষার তালিকায় রাখল দল।

রাজ্যে পালাবদলের অন্যতম কান্ডারি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শা। তাঁর তৈরি করা ব্লু প্রিন্টেই যে সাফল্য মিলেছে সেকথা স্বীকার করে নিয়েছেন সব বিজেপি নেতাই। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভায় অমিতের ডেপুটি হিসাবেই কাজ করেছেন নিশীথ। দুজনের মধ্যে সুসম্পর্ক রয়েছে। লোকসভা ভোটে হেরে প্রায় দু’বছর কার্যত অজ্ঞাতবাসে থাকার পর রাজনীতিতে নিশীথের দ্বিতীয় সুযোগ পাওয়ার পেছনেও অমিতের হাত রয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সুসম্পর্ক মাথাভাঙ্গার বিধায়ককে একধাপ এগিয়েই রেখেছিল।

আরএসএস-এর রাজ্য স্তরের এক নেতা অবশ্য অন্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, বর্তমান রাজনীতির আগ্রাসন এবং সাংগঠনিক দক্ষতার বিষয়টিও এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করেছে। কোচবিহার ও সংলগ্ন অঞ্চলের মানুষজন যথেষ্ট রাজনীতি সচেতন। ওই এলাকায় রাজনৈতিক জমি ধরে রাখতে যে ধরনের আগ্রাসী এবং তৃণমূল স্তরের লড়াইয়ের প্রয়োজন, নিশীথ তাতে পরীক্ষিত। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মোকাবিলা করে কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা রাখার ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতা প্রমাণিত। অন্যদিকে, শংকরের পরিচিতি মূলত তাঁর মেধা ও যুক্তিপূর্ণ বক্তব্যের জন্য। কমিউনিস্ট সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা শিলিগুড়ির বিধায়ক বৌদ্ধিক রাজনীতিতে যতটা মানানসই ততটাই বেমানান আগ্রাসী রাজনীতিতে। কিন্তু বর্তমান রাজ্য রাজনীতির রূঢ় বাস্তবতায় বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব এমন কাউকে সামনে রাখতে চেয়েছে যার মধ্যে ‘স্ট্রিট ফাইটার’ সুলভ আগ্রাসন রয়েছে। সেক্ষেত্রে নিশীথ নিঃসন্দেহে শংকরের চাইতে বেশি নম্বর পেয়েছেন।

এছাড়াও ভৌগোলিক ভারসাম্য রক্ষার একটি সূক্ষ্ম অঙ্ক  কাজ করেছে বিজেপির অন্দরে। নিম্ন অসম এবং উত্তরবঙ্গকে নিয়ে পৃথক কোচবিহার রাজ্যের দাবিতে দীর্ঘদিন থেকে আন্দোলন চলছে। সেই আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ করা বা পরবর্তীতে উত্তরবঙ্গকে বিশেষ কোনও কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনায় আনতে হলে রাজবংশী সমাজের সমর্থনও প্রয়োজন। সেই সমীকরণেও নিশীথের হাতে ক্ষমতা থাকা জরুরি। শিলিগুড়ির বিধায়ক হিসেবে শংকর ঘোষ এমনিতেই যথেষ্ট প্রভাবশালী।  প্রথম দিন শংকরকে বাদ দেওয়া মানেই তাঁর গুরুত্ব কমে যাওয়া নয়। পদ্ম শিবিরের ভেতরের যা খবর তাতে মন্ত্রীসভার পরবর্তী সম্প্রসারণে তিনি হয়তো জায়গা পাবেন। কিন্তু প্রথম দিনে একমাত্র নিশীথকে শপথগ্রহণ করিয়ে শাসকদল পরিষ্কার বুঝিয়ে দিল, এই মুহূর্তে শহুরে বুদ্ধিজীবী ভাবমূর্তির চেয়ে জাতিগত ভোটব্যাংক সুনিশ্চিত করা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং লড়াকু মানসিকতাই তাদের কাছে অগ্রাধিকার পাচ্ছে।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *