ছেলেখেলার ছড়ায় যুদ্ধযাত্রার বিস্মৃত ইতিহাস

খেলাধুলা/SPORTS
Spread the love


অর্থহীন মনে হওয়া ছন্দের ভিতরেই লুকিয়ে থাকতে পারে বাংলার পুরোনো ইতিহাসের টুকরো।

সৌভিক পাঁজা

লড়াই করে বেঁচে থাকার আর এক নাম জীবন। অরণ্যচারী, গৃহবাসী, গোষ্ঠীবদ্ধ জীবন, এই পালাবদলেও ছিল সংগ্রাম। সাম্রাজ্য থেকে দেশ, প্রতিটি ক্ষেত্রেই আছে যুদ্ধের জয় ও পরাজয়ের কাহিনী। যার অন্তরালে থেকে যায় কত ইতিহাস। আমরা দিনে-দিনে সেই ইতিহাস ভুলে যাই। কিন্তু সাহিত্য তার সাক্ষ্য বহন করে। এমনই এক লুপ্ত যুদ্ধযাত্রার সন্ধান মেলে ছেলেখেলার ছড়ায়। শিশুর মনোরঞ্জনে রচিত সেই আপন ছড়াতেই শিশুশিক্ষার হাতেখড়ি। ছড়ার ছত্রে ছত্রে উঠে আসে সমাজ ও মানুষের কথা। একসময় আমরা সেই সব কথা ভুলে যাই। লোকসাহিত্যের ধর্ম মেনে ছড়া পেতে থাকে নবরূপ। ইতিহাসের পলি সরিয়ে গভীরে অনুসন্ধান করলে পাওয়া যায় বিস্মৃত ইতিহাসকে।

এমনই এক প্রচলিত ছড়া ‘আগডুম বাগডুম ঘোড়াডুম সাজে, ঢাক মৃদং ঝাঁঝর বাজে।’ ছড়াটি নিয়ে গবেষকদের আলোচনার অন্ত নেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘ছেলেভুলানো ছড়া : ২’ প্রবন্ধে প্রথম ছত্রটির কোনও পরিষ্কার অর্থ খুঁজে না পেলেও পরের ছত্রগুলিতে বিবাহযাত্রার বর্ণনা আছে বলে অনুমান করেছেন। এই মতের সঙ্গে যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি ‘পৌরাণিক উপাখ্যান’ বইয়ে এ বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। অন্যদিকে, লোকসাহিত্য গবেষক নির্মলেন্দু ভৌমিক মনে করেন, ‘আগডুম বাগডুম’ অর্থ যুক্তিহীন কথা বা বাক্য। তারই অনুকরণে ‘আগড় বাগড়’ ও ‘আগড়ম বাগড়ম’ শব্দবন্ধের ব্যবহার হয়েছে। এই ব্যাখ্যা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এই অর্থহীন শব্দ এত জনপ্রিয় হল কী করে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। জনপ্রিয়তার নিরিখেই শব্দের মধ্যে লুকিয়ে থাকা অতীতের কোনও ইতিহাসের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

‘আগ’ অগ্র বা সামনে এবং ‘বাগ’ পাশ বা দিক বোঝাতে পারে, এমন ব্যাখ্যা রয়েছে। শিশুমনের আদরের টানে ডোম ‘ডুম’ হয়ে থাকতে পারে বলেও কেউ কেউ মনে করেন। যেমন জুতো শিশুর মুখে ‘জুতুয়া’ হয়, তেমনই শব্দ বদলাতে পারে ছন্দে। তবে ‘আগডুম বাগডুম’-এর শব্দ ব্যুৎপত্তি নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নেই।

আমরা আমাদের জীবনের অনুকরণ করি শিশুখেলার মধ্য দিয়ে। শৈশবে পুতুল খেলা যেন সংসার জীবনের সহজপাঠ। ছেলেরা কোদাল হাতে মাটি খোঁড়ে, অজান্তেই অনুশীলন করে কৃষিকাজের। প্রাগৈতিহাসিক মানবজীবনের অনুকরণেই খেলায়, বিশেষত ছেলেদের খেলায়, পৌরুষের ভাব লক্ষ করা যায়। ‘আগডুম বাগডুম’ খেলার একটি প্রচলিত ভঙ্গিতে গোল হয়ে বসে ছড়া কাটতে কাটতে প্রত্যেকে হাঁটুতে হাত ছোঁয়। যে হাঁটুর ওপর ছড়া শেষ হয়, সেই হাঁটু মুড়ে দেওয়া হয়। সবার হাঁটু মুড়ে গেলে খেলা শেষ হয়। এই কারণেই অনেকে ‘আগডুম বাগডুম’ বলতে দুই হাঁটুর কথাও মনে করেন। কিন্তু খেলার সময় তাদের বসার ভঙ্গি অনেকের চোখে যুদ্ধের ভঙ্গির মতো মনে হয়েছে।

‘আগডুম বাগডুম’ ছড়াটি যে মেয়ে ও ছেলে উভয়ের খেলার ছড়া ছিল, পাঠ করলেই তা বোঝা যায়। তাই ছড়ার শুরুতে যে বর্ণনা, তাকে শুধু আবোলতাবোল কথা বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ছড়ার প্রথম ছত্রটি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আশুতোষ ভট্টাচার্য একে ডোম চতুরঙ্গের বর্ণনা বলে মনে করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় আগডুম অর্থ অগ্রবর্তী ডোম সৈন্যদল, বাগডুম অর্থ পার্শ্ববর্তী ডোম সৈন্যদল এবং ঘোড়াডুম অর্থ অশ্বারোহী ডোম সৈন্যদল। এই ব্যাখ্যায় ছড়ার প্রথম অংশে একটি সমর অভিযানের ছবি ফুটে ওঠে।

ছড়ার বিভিন্ন পাঠ পাশাপাশি রাখলে সেই ছবিটি আরও স্পষ্ট হয়। কোথাও ঢাক, মৃদঙ্গ, ঝাঁঝর বা অন্য বাদ্যযন্ত্রের উল্লেখ আছে, কোথাও সূর্য অস্ত যাওয়ার পরে হাটে বিশ্রাম নেওয়া, কোথাও পান বা গুয়া কেনার কথা আছে। খেলার এই ছড়ায় সমর অভিযানের একটি সামগ্রিক ছবি খুঁজে পাওয়া যায় বলে গবেষকদের একাংশ মনে করেন। অনেকে শেষের অংশটিকে বিবাহযাত্রার বর্ণনা বলেছেন। বিবাহযাত্রাও অনেক সময় যুদ্ধযাত্রার অনুরূপ ছিল। জোর করে কন্যাকে নিয়ে আসার মতো প্রাচীন সামাজিক প্রথার ছায়া বরযাত্রার আড়ম্বরেও এসে পড়েছিল বলে ব্যাখ্যা রয়েছে। ফলে সময় ও সভ্যতার পরিবর্তনে ছড়ার অর্থের স্তর বদলালেও এর মধ্যে যুদ্ধযাত্রার স্মৃতি থাকার সম্ভাবনাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ‘বেনের মেয়ে’ উপন্যাসে এই ছড়ার একটি অন্য পাঠ পাওয়া যায়। সেখানে আছে, ‘আগডোম, বাগডোম, ঘোড়াডোম সাজে। ডাল মৃগল ঘাঘর বাজে, বাজতে বাজতে পড়লো সাড়া, সাড়া গেল বামনপাড়া।’ একাদশ পরিচ্ছেদের দ্বিতীয় অংশে রূপা রাজার বাহিনীতে বাগদি ও ডোম সৈন্যের উল্লেখ আছে। রূপা রাজার পাঁচ হাজার ডোম সৈন্য ঘোড়ায় চড়ে বাজনা বাজাতে বাজাতে রাস্তা তৈরি করে এবং শত্রুপক্ষের গতিবিধির ওপর নজর রাখে বলে বর্ণনা পাওয়া যায়। ফলে লোকছড়ার কয়েকটি শব্দের সঙ্গে সেই সামরিক সংগঠনের যোগসূত্রের প্রশ্নটি একেবারে কল্পনাপ্রসূত নয়।

ছড়াটির মোট বারোটি পাঠান্তরের কথা গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। পূর্ণপাঠগুলিতে ডোম, সূর্যমামা, হাট ও পান খাওয়ার কথা রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে সংগৃহীত দুটি পাঠে ডোম শব্দটি না থাকলেও একটিতে ডুলির উল্লেখ আছে। সেই ডুলিকেও কোনও কোনও ব্যাখ্যায় ডোমের বিকল্প পাঠ হিসেবে দেখা হয়েছে। ময়মনসিংহ থেকে সংগৃহীত আর একটি পাঠে শব্দগত সাদৃশ্য কম হলেও সুরের মিল থেকে অনুমান করা হয়েছে যে তা আমাদের দেশ থেকেই ওই অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল। লোকসাহিত্যের মুখে মুখে চলার ধর্মেই ছড়া এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে গিয়ে শব্দ বদলায়।

‘আগডুম বাগডুম’-এর ছন্দের সঙ্গে বিশ্বের নানা প্রান্তের শিশুদের গণনার ছড়ার তালগত সাদৃশ্যও কৌতূহল জাগায়। ইংরেজি ভাষার বহুল প্রচলিত ‘ইনি, মিনি, মাইনি, মো’-তে একইভাবে অর্থহীন ধ্বনি ও ছন্দের ওপর খেলার কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে। তবে এই সাদৃশ্যের ভিত্তিতে দুই ছড়ার প্রত্যক্ষ ঐতিহাসিক সম্পর্ক দাবি করা যায় না। ভারতীয় সেনাবাহিনীর পথসঞ্চালনের ছন্দের সঙ্গেও ‘আগডুম বাগডুম’-এর তালের মিল মনে হতে পারে। সেটিও ঐতিহাসিক যোগের প্রমাণ নয়। ছড়ার শরীরে শব্দের পাশাপাশি ছন্দও পুরোনো স্মৃতি বহন করে।

ইতিহাস অনুসন্ধানে জানা যায়, মল্লরাজাদের সেনাবাহিনীতে পদাতিক ও অশ্বারোহী ডোম সৈন্য থাকার কথা বিভিন্ন আলোচনায় এসেছে। মাণিকলাল সিংহ তাঁদের ‘আঁকুড়ে ডোম’ বলে উল্লেখ করেছেন বলে উদ্ধৃত হয়েছে। বিষ্ণুপুরের মন্দিরগাত্রে যুদ্ধযাত্রার ভাস্কর্য দেখে ডোমদের যুদ্ধকৌশল নিয়েও নানা অনুমান করা হয়েছে। বৌদ্ধতন্ত্রের ডোম্বিনী দেবীর প্রভাব ও গেরিলা যুদ্ধের কৌশলের সঙ্গে তাঁদের যোগের কথাও বলা হয়েছে। তবে এগুলি গবেষণার ব্যাখ্যা ও অনুমান, সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নয়।

ধর্মঠাকুরের উপাসনার সঙ্গেও ডোমদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ধর্মমঙ্গল কাব্যে কালু ডোমের বীরত্বের কথা রয়েছে। বিষ্ণুপুরের দলমাদল কামানের নামের সঙ্গেও ধর্মশিলার ‘দলমাদল’ নামের যোগের একটি প্রচলিত ব্যাখ্যা আছে। দলমর্দন থেকে ‘দলমাদল’ নামের উৎপত্তির কথাও বলা হয়। একসময় ডোম সৈন্যরা বাংলার বিভিন্ন রাজ্য ও সামন্তশক্তির সামরিক ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও কালের পরিবর্তনে তাদের সেই প্রয়োজন কমে যায়। পেশা বদলাতে বাধ্য হন অনেকে। কেউ বাঁশের কাজে নিজেকে অভ্যস্ত করেন, কেউ যুদ্ধ ভুলে বাজনাকেই জীবিকার পথ করে নেন।

তবু ইতিহাসের পাতা থেকে তাঁদের স্মৃতি একেবারে মুছে যায়নি। রাঢ়ের লোক ঐতিহ্যে ধর্মমঙ্গল, সীমান্তবঙ্গের লোকনাট্য ‘ডোমিনী’ এবং নানা প্রবাদে তাঁদের বীরত্বের প্রতিধ্বনি রয়ে গিয়েছে। কালু ডোমের কথা, ডোমদের যুদ্ধযাত্রার কথা কিংবা শিশুর মুখে মুখে ফিরতে থাকা ‘আগডুম বাগডুম’ একই সূত্রে আমাদের সামনে এনে দেয় এক বিস্মৃত সময়কে। হয়তো ছড়ার শরীরে আজ অর্থহীন মনে হওয়া শব্দগুলির ভিতরেই চাপা পড়ে আছে কোনও একসময়ের মানুষের জীবন, যুদ্ধ ও যাত্রার পদশব্দ।

(লেখক গবেষণামূলক কাজে যুক্ত।)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *