ভোট নিয়ে প্রশ্ন। সাম্প্রতিককালের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। লক্ষ্য কেন্দ্রীয় সরকার ও সর্বভারতীয় শাসকদল ঠিকই। তবে বিরোধীরাও এই প্রশ্নের মুখে। প্রশ্নটি করছে জেন জেড। শুধু নতুন প্রজন্মের দল ককরোচ জনতা পার্টি নয়। মূল ধারার দলের ছাত্র সংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (আইসা) এক সুরে প্রশ্নটি তুলছে। তাদের কথায়, নির্বাচনের নামে প্রহসন হচ্ছে। ভোটার তালিকা তৈরি থেকে সেই কারচুপির সূত্রপাত।
সেই প্রক্রিয়ায় সরকার, শাসকদল ও নির্বাচন কমিশন হাত মিলিয়ে চলছে বলে এদের অভিযোগ। নতুন করে কথাটা একইদিনে বললেন আইসা’র সভাপতি নেহা বোরা ও ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে। কলকাতায় এসে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের ভাষণে নেহার বক্তৃতার মোদ্দা কথাটি ছিল, বাংলায় ২০২৬-এর জনাদেশটিই ভুয়ো ছিল। যে জনাদেশের বলে শাসকদল হিংসার ছাড়পত্র পেয়ে গিয়েছে বলে মনে করছে। ভোটের নাম করে গণতন্ত্রের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছে শাসক শিবির।
সেদিনই অভিজিতের বক্তব্য ছিল, বিজয়ী কে হবে, তা ভোটের আগে ঠিক করা হয়ে থাকছে। ফলে এই ভোটের কোনও বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। একধাপ এগিয়ে তাঁর মতে, এমন ‘প্রহসন’-এর নির্বাচনে অংশগ্রহণ অর্থহীন। ভোট নিয়ে প্রশ্ন বিরোধী দলও তুলে থাকে। হেরে গেলে নির্বাচনকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো বহুদিন ধরে বিরোধীদের বহুদিনের দস্তুর। গত বিধানসভা ভোটে পরাজিত হওয়ার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচনি ফলাফলকে মানতেই চাননি।
কিন্তু এতদিন বিরোধীদের তোলা অভিযোগের সঙ্গে জেন জেড-এর তোলা বক্তব্যের কিছু মৌলিক পার্থক্য আছে। সেটা নেহা তেমনভাবে না স্পষ্ট করলেও চাঁছাছোলা ভাষায় বলেছেন ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর কথায়, স্বচ্ছতা না থাকলে সেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার কোনও মানে হয় না। এটাই হতে পারে শাসক শিবিরের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। পরবর্তী নির্বাচনগুলি যদি তরুণ প্রজন্ম বয়কটের সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে সেটা শাসকের কাছে বড় বিপদ হয়ে উঠবে।
মূল ধারার বিরোধীরাও এতে বিপন্ন বোধ করে। কেননা, এদেশের সমস্ত বিরোধী মূলত ভোটের কারবারে অভ্যস্ত। দলগুলির সমস্ত কাজকর্ম পরিচালিত হয় ভোটের লক্ষ্যে। জেন জেড ভোট বয়কটের পথে গেলে বিরোধীরাও তাই প্যাঁচে পড়তে পারে। ইতিমধ্যে অভিজিতের বক্তব্য বিরোধীদের কাছে অস্বস্তিকর হয়ে গিয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘প্রহসন’এর ভোটে অংশগ্রহণ মানে সেই ‘মিথ্যাচার’কে স্বীকৃতি দেওয়া।
ককরোচ জনতা পার্টি যে ভোট বয়কটের পথে যেতে পারে, তার আভাস ইতিমধ্যে মিলেছে। দলের প্রতিষ্ঠাতার কথায়, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত না হলে নির্বাচনে অংশগ্রহণ অর্থহীন। তিনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলেছেন, এসআইআর ফ্রিজ করে দিলে বোঝা যাবে আসলে কত আসনে বিজেপি জিতেছে। ভারতে ভোট বয়কটের ডাক নতুন নয়। ছয় ও সাতের দশক থেকে এই ডাক দিয়ে এসেছে নকশালপন্থীদের একাংশ। যদিও তাতে কখনও বিপুল সাড়া পড়েনি।
কিন্তু পরিস্থিতি বদলেছে। তরুণ প্রজন্ম সার্বিকভাবে ভোটের কারবারে প্রতি বীতশ্রদ্ধ। নৈতিক আগ্রহে কোনও দলে জেন জেড-এর যোগদান খুব কম। নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি ক্ষোভ ও হতাশা মারাত্মকভাবে বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ভোট বয়কটের ডাক নবীন প্রজন্মকে বিপুলভাবে আলোড়িত করতে পারে। এসআইআর সম্পর্কে সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি উজ্জ্বল ভুঁইয়ার বক্তব্য নিয়ে এখন জনপরিসরে জোর চর্চা চলছে।
তিনি বলেছেন, কারও ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া সংবিধানের হৃদয়ে আঘাতের শামিল। সুপ্রিম কোর্টের অনুমোদন ছাড়া ৬ নম্বর ফর্মে পরিবর্তনের বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টও সামনে নিয়ে এসেছে। দলীয় তকমা সরিয়ে তরুণ প্রজন্মের ভোটকে নস্যাৎ করতে এগিয়ে আসা তাই বৃহৎ পরিসরে চর্চার বিষয় হয়ে উঠতে পারে। সেক্ষেত্রে ভোটের মোড়কে মিথ্যাচার ঢাকা যাবে না। তেমন হলে শুধু শাসক নয়, বিরোধীদেরও সর্বনাশ।

