সংসদীয় ময়দান থেকে দূরে থাকা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শা’র স্বভাব নয়। সেই তিনি সংসদ ভবনে গেলেও আজকাল অধিবেশনে যোগ দিচ্ছেন না। এরকম ঘটনা এর আগে কখনও দেখা যায়নি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বহু সময়ে অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে না চাইলেও অমিত শা-কে তেমনভাবে বিতর্ক এড়িয়ে থাকতে দেখা যায় না। সেই অমিত শা দিনের পর দিন যন্তরমন্তরে ছাত্রদের ওপর পুলিশি হামলা সম্পর্কিত যাবতীয় বিতর্ক থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছেন।
বিরোধীরা বারবার ওই বিষয়ে সংসদে তাঁর বিবৃতি দাবি করছেন। সরকার সেই দাবি না মানায় সংসদের উভয় কক্ষে দীর্ঘ অচলাবস্থা চলছে। সেইসময় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদ ভবনে উপস্থিত থেকেও অধিবেশনে হাজির না হওয়ায় বিরোধীদের বিতর্কটি জিইয়ে রাখতে সুবিধা হচ্ছে। লোকসভার অধিবেশনে তাঁর অনুপস্থিতি যত বাড়ছে, তত বিরোধীদের পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে চাপ সৃষ্টি করার সুযোগ জোরদার হচ্ছে।
ইতিমধ্যে ছাত্র আন্দোলনের জেরে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। তারপর বিরোধীদের এই কৌশল নিঃসন্দেহে কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর বিরাট চাপ সৃষ্টি করছে। ২০১৯ সালে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পদে তাঁর অভিষেকের পর থেকে অমিত শা বিরোধীদের বিরুদ্ধে বরাবর আক্রমণাত্মক থেকেছেন সংসদে। আজ তিনি রক্ষণাত্মক ভূমিকা নেওয়ায় তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। এনিয়ে নানা জল্পনা ছড়াচ্ছে রাজনৈতিক মহলে।
গত ২০ জুলাই নয়াদিল্লিতে ছাত্র বিক্ষোভ সামলাতে পুলিশ লাঠিচার্জ করেছিল, কাঁদানে গ্যাস ছুড়েছিল এবং পেলেট গান তাক করেছিল। দেশজুড়ে ধিক্কার ফেটে পড়তে শুরু করে, ছররা গুলির আঘাতে একাধিক ছাত্র আহত হলেও, প্রথমে পুলিশ ছররা গুলির ব্যবহার স্বীকার করেনি। কিন্তু পরে দিল্লি পুলিশের রেকর্ডে ধরা পড়ে যে, ছাত্রদের সংসদ অভিযান রুখতে এক পদস্থ আধিকারিকের নির্দেশে পেলেট গান চালানো হয়েছিল।
লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধি এক আহত ছাত্রকে পাশে নিয়ে সাংবাদিক বৈঠকে সেই ছাত্রের শরীরে ছররা গুলির ক্ষতচিহ্ন দেখিয়ে এই কাজের জন্য সম্পূর্ণভাবে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রককে দায়ী করেন। এরপর বিরোধীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাবি করে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে সংসদে বিবৃতি দিয়ে জানাতে হবে, পুলিশ কার নির্দেশে এই ছররা গুলি চালিয়েছিল। তিনি সংসদে উপস্থিত হয়ে বিবৃতি না দেওয়ায় তাঁর পদত্যাগের দাবিও ওঠে। একে কেন্দ্র করে লোকসভা ও রাজ্যসভায় দিনের পর দিন অচলাবস্থা চলছে। সংসদের দুই কক্ষে স্বাভাবিক কাজকর্ম বিঘ্নিত হচ্ছে।
অমিত শা ক্রমাগত বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ায় সমাজমাধ্যমে ভিন্ন রাজনৈতিক ভাষ্যও সৃষ্টি হচ্ছে। বিরোধীদের একাংশের দাবি, জনমানসে পরিবর্তন টের পেয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেকে খানিক গুটিয়ে নিয়েছেন। অপর রাজনৈতিক ভাষ্যকারদের ব্যাখ্যা, দলীয় নির্দেশে তিনি আপাতত কিছুদিন যাবতীয় বিতর্ক থেকে দূরে সরে থাকছেন। বিরোধীদের সমালোচনার পাশাপাশি তাঁর অস্বস্তি বৃদ্ধি পেয়েছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের প্রধান মোহন ভাগবত জেন জেড বিক্ষোভকারীদের প্রতি সহৃদয় মনোভাব পোষণ করায়।
জেন জেড বিক্ষোভকারীদের প্রতি সরকারকে সংবেদনশীল হতে পরামর্শ দিয়েছেন সংঘপ্রধান। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্ভবত নিজেও বুঝেছেন, তরুণ সমাজের বিক্ষোভকে পেশিশক্তির সাহায্যে দমন করার চেষ্টা উচিত হয়নি। তরুণদের ক্ষোভ প্রশমিত করতে তিনি সমাজমাধ্যমে বারবার আবেদন রেখেছেন তাদের উদ্দেশে। নিজের বার্তা ছাত্র সমাজের কাছে পৌঁছে দিতে বেছে নিয়েছেন অল্পবয়সিদের সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় মাধ্যম ইনস্ট্রাগ্রামকে।
সর্বশেষ দিল্লি আইআইটি-র সমাবর্তনে মোদি প্রকাশ্যে তরুণ সমাজের প্রতি আস্থা রাখার কথা বলে সরাসরি সংলাপ তৈরির চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর তরফে এরকম কোনও উদ্যোগ এখনও দেখা যায়নি। তাঁর এমন অনড় মনোভাবে সংসদ অচল হয়ে পড়ায় শাসক শিবিরের ওপর চাপের মোকাবিলায় শা দৃঢ় থাকতে পারেন কি না, সেটাই দেখার।

