উত্তরে জনজাতি সমাজের বর্তমান রূপরেখা

আন্তর্জাতিক INTERNATIONAL
Spread the love


আর্থসামাজিক বদল এবং জনসংখ্যাগত প্রান্তিকতার মাঝে উত্তরবঙ্গের জনজাতিদের বর্তমান অবস্থার একটি মূল্যায়ন।

কৃষ্ণপ্রিয় ভট্টাচার্য

আরও একটা জনজাতি দিবস পেরিয়ে গেল। উত্তরবঙ্গের ক্ষেত্রে এই জনজাতি দিবসের প্রাসঙ্গিকতা বহুকৌণিক। কারণ বাংলা এবং হিমালয়সানুর এই সবুজ জল-জঙ্গলে ঘেরা ভূখণ্ডটি জনজাতি মানবসম্পদে ভরপুর। ২০১১ সালের জনশুমারির হিসাবেই দেখা যায়, পশ্চিমবঙ্গের জনজাতি জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি (৩৫.৮৫ শতাংশ) উত্তরবঙ্গবাসী। বলা যায়, প্রতি ৯ জন উত্তরবঙ্গবাসীর একজন জনজাতি সম্প্রদায়ের। ফলে বিশ্ব জনজাতি দিবসের আবহে আজ আমরা উত্তরবঙ্গের সাম্প্রতিক জনজাতি পরিস্থিতির দিকে একটু ফিরে তাকাব। দেখব, আর্থসামাজিক দিক থেকে উত্তরবঙ্গের এই গুরুত্বপূর্ণ মানবগোষ্ঠী, উন্নয়ন বা বিকাশের মানদণ্ডে কোথায় অবস্থান করছেন। সাধারণভাবে জনজাতি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এগুলো ভাবার অবকাশ থাকে না, কিন্তু জনজাতি উন্নয়ন নিয়ে যাঁরা ভাবছেন, গবেষণা করেন বা প্রবন্ধ রচনা করেন, তাঁদের এই বিষয়গুলো ভাবতেই হবে।

প্রথমেই উত্তরবঙ্গের জনজাতিদের জনসংখ্যা পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে পারি। ১৯৬১ থেকে ২০১১ সাল, এই পঞ্চাশ বছরের সেন্সাস রিপোর্টেই দেখা যাচ্ছে উত্তরবঙ্গে জনজাতিরা মোট জনসংখ্যার আনুপাতিক দিক থেকে প্রান্তিক হয়ে পড়ছেন। সাড়ে ছয় দশক আগে, ১৯৬১ সালে উত্তরবঙ্গের মোট জনসংখ্যায় জনজাতিদের অনুপাত যেখানে ১২.১২ শতাংশ ছিল, ২০১১ সালে এসে সেই অনুপাত কমে দাঁড়ায় ১১.০৩ শতাংশে। প্রতিটি দশকেই, কী জেলায় কী গোটা উত্তরবঙ্গে এটা কমে আসছে। ১৯৬১ থেকে ২০১১ সাল, এই পাঁচ দশকে যেখানে উত্তরবঙ্গে সাধারণভাবে জনসংখ্যা বেড়েছে ১৩১.৯৯ শতাংশ এবং অ-জনজাতিদের জনসংখ্যা বেড়েছে ১৩৪.৮৮ শতাংশ, সেখানে জনজাতিদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার দেখা গিয়েছে ১১১.০৮ শতাংশ।

সেন্সাসের দৌলতে আমরা দেখেছি জেলা স্তরেও চিত্রটা একইরকম। এর নানা কারণ হতে পারে। উত্তরবঙ্গে অ-জনজাতিদের আগমন বেড়েছে। এও হতে পারে, অ-জনজাতিদের জন্মহার বেড়েছে এবং মৃত্যুহার কমেছে। অন্যদিকে এও হতে পারে, জনজাতিদের ক্ষেত্রে জন্মহার কমেছে, অন্যত্র অভিবাসন বেড়েছে বা মৃত্যুহার বেড়েছে বা দুটোই। গত ৫০ বা ৬০ বছরে তো এ রাজ্যে তেমন কোনও ভয়ংকর দুর্ভিক্ষ বা মহামারিতে ব্যাপক জীবনহানির ইতিহাস নেই। ফলে একটা সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হল- কী জনজাতি, কী সাধারণ অ-জনজাতি, উভয়েরই জন্মহার কমেছে আর উত্তরবঙ্গ সহ গোটা রাজ্যেই অ-জনজাতিদের আগমন বেড়েছে। বিষয়টি জনজাতিদের জীবনযাত্রার মান ও মর্যাদাকে প্রভাবিত করার মতো। ফলে বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং সমাজবিজ্ঞানের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। শুধু তাই নয়, এই জনসংখ্যাগত প্রান্তিকতার যাত্রাটি জনজাতিদের টিকে থাকা বা সাস্টেনেবিলিটি এবং সাংস্কৃতিক পরিচিতির প্রসঙ্গটিকেও প্রভাবিত করার মতো ঘটনা। এ রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয় ও সমাজবিজ্ঞানমনস্ক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়টি নিয়ে ভাবা উচিত।

জনজাতিদের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রসারের দিকটিও খুব একটা সুখকর নয়। বাইরে থেকে দেখলে বা সাধারণভাবে ওপর-ওপর খবর নিলে দেখা যাবে ২০১১ সালের সেন্সাস অনুযায়ী উত্তরবঙ্গে জনজাতিদের মধ্যে সাক্ষরতার হার ৫১.০৯ শতাংশ। কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলে দেখা যাচ্ছে, এই সাক্ষরদের মধ্যে মাত্র ১৪.৯১ শতাংশ ম্যাট্রিকুলেট বা তদূর্ধ্ব। আর সাক্ষরদের মধ্যে স্নাতকের অনুপাত ২.৭৩ শতাংশ। স্কুল-কলেজের সংখ্যা বাড়লেও জনজাতিদের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক বা আধুনিক শিক্ষার যে খুব একটা উন্নতি হয়নি, এই তথ্যসমূহ তার সাক্ষ্য দেবে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করতে হয় যে, ২০১১ সালের সেন্সাস অনুযায়ী সাধারণভাবে পশ্চিমবঙ্গের মোট সাক্ষরদের মধ্যে ম্যাট্রিকুলেট ও তদূর্ধ্বের অনুপাত ছিল ২৫.৭ শতাংশ এবং স্নাতকদের অনুপাত ছিল প্রায় ৮ শতাংশ।

এবার জনজাতিদের পরম্পরাগত কৃষিজীবন থেকে নিষ্ক্রমণের দিকটা একটু দেখা যাক। উত্তরবঙ্গে ১৯৭১ সালেও যেখানে মোট জনজাতীয় কর্মীর ৬২.৬২ শতাংশ কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, চার দশক পরে, ২০১১ সালে এসে দেখা যাচ্ছে বহু মানুষ জীবিকার জন্য অন্য কাজ বেছে নিয়ে কৃষি ছেড়ে চলে গিয়েছেন। ২০১১ সালে জনজাতিদের মোট কর্মীদের মধ্যে মাত্র ৩১.৩৫ শতাংশকে কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত হিসেবে পাওয়া যাচ্ছে। আর অকৃষি ক্ষেত্রে এই ধাবমানতা তাঁদের জীবনে এক নতুন চ্যালেঞ্জ হয়েও দাঁড়িয়ে যাচ্ছে, কারণ এই অকৃষি ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত কুশলী মানুষ প্রচুর এবং জনজাতিদের সেখানে এক অভূতপূর্ব প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়তে হচ্ছে। বলা বাহুল্য যে এই প্রতিযোগিতা উত্তরবঙ্গের জনজাতি জীবনে ছিল না।

এবার আসি নগরায়ণের প্রশ্নে। ১৯৭১ সালে যেখানে উত্তরবঙ্গের জনজাতিদের ১.৯৭ শতাংশ শহরবাসী ছিলেন, সেখানে সার্বিক নগরায়ণ বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও ২০১১ সালে জনজাতিদের মধ্যে নগরায়ণের অনুপাত এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৭.৩২ শতাংশে। অথচ ২০১১ সালের হিসেব অনুযায়ী উত্তরবঙ্গে সার্বিকভাবে শহরবাসী মানুষের অনুপাত ২০.৯৬ শতাংশ। ১৯৭১ সালে এই সার্বিক অনুপাত ছিল ৯.২৫ শতাংশ। মানে ১৯৭১ থেকে ২০১১ সাল, এই চার দশকে সাধারণভাবে জাতিধর্মনির্বিশেষে উত্তরবঙ্গে ১১.৭১ শতাংশ নগরায়ণ বাড়লেও জনজাতিদের মধ্যে এই বৃদ্ধি ঘটেছে অত্যন্ত শ্লথগতিতে। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠবে, জনজাতি মানুষ সেভাবে শহরবাসী হচ্ছেন না কেন? নাকি তথাকথিত জনজাতি গ্রামগুলোর আধাশহর বা মিনিশহর হয়ে ওঠাই এর কারণ? জনজাতিদের নগরায়ণ নিয়ে আরেকটি যথেষ্ট স্পর্শকাতর প্রশ্ন উঠতে পারে, উত্তরের পুর শহরগুলো কি এখানকার জনজাতিদের কাছে বসবাসবান্ধব বা অনুকূল বাস্তুতন্ত্র মনে হচ্ছে না? পুরসভাওয়াড়ি তথ্য দিয়ে আলোচনা দীর্ঘ না করেও বলা যায়, উত্তরবঙ্গে জনজাতিদের নগরায়ণ প্রসঙ্গটি ক্রমশ সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও বেশ কৌতূহলোদ্দীপক মনে হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে।

এই প্রতিবেদনে সীমিত পরিসরে ভাষা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনা না করা গেলেও উত্তরবঙ্গের জনজাতিদের জনসংখ্যাগত প্রান্তিকতা, প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষার প্রসারে শ্লথগতি ও নগরায়ণে অনীহা এবং কৃষিজীবন থেকে নিষ্ক্রমণ, এসবের হাঁড়ির খবর থেকে অন্তত একটা আপ্তবাক্য মনে হতে পারে। সেটা হল, ‘অল দ্যাট গ্লিটার্স ইজ নট গোল্ড’, অর্থাৎ চকচক করলেই সোনা হয় না।

এবার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়ে আসা যাক। তা হল জনজাতিদের ধর্মযুদ্ধ। এটাকে ধর্মযুদ্ধ না বলে ধর্মশৃঙ্খল থেকে মুক্তির মিছিল বলব কি না ভাবতে হবে। এসব বাইরে থেকে একেবারেই বোঝা যায় না। উত্তরবঙ্গের জনজাতি সংসারে ভেতর ভেতর একটা ধর্মীয় টানাপোড়েন চলছে। এতদিনের পরম্পরাগত তথাকথিত হিন্দুধর্মের বাইরে জনজাতিদের অনেকেই অন্যান্য ধর্মীয় পরিচয়ের দিকে সরে যাচ্ছেন। ঘটনাটি কৌশলগত কারণে গণমাধ্যমে আসে না, তাই এসব স্পর্শকাতর বিষয় আমাদের গোচরেও আসে না। এই পরিবর্তিত জীবনচর্যার অপ্রত্যক্ষ প্রভাব উত্তরবঙ্গের জনজাতি সমাজে নতুন আশা-আকাঙ্ক্ষা ও নতুন নতুন অভ্যন্তরীণ শ্রেণিবিন্যাস ঘটাচ্ছে। ধর্মের এই সমাজতত্ত্বটা একাধারে তাৎপর্যপূর্ণ অন্যদিকে কৌতূহলোদ্দীপক। সেন্সাসের তথ্য বলছে ১৯৭১ সালে যেখানে উত্তরবঙ্গের জনজাতিদের মধ্যে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অনুপাত ছিল ৮৩.৮৯ শতাংশ, সেটা ২০১১ সালে এসে দাঁড়িয়েছিল ৭০.৯০ শতাংশে। ১৯৭১ থেকে ২০১১ সাল, এই ৪০ বছরে জনজাতিদের মধ্যে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অনুপাত প্রায় ১৩ শতাংশ কমেছে। এরপর প্রায় ১৫ বছর অতিক্রান্ত। পরিস্থিতি অবধারিতভাবে আরও পালটেছে। জনজাতিদের মধ্যে যে ধর্মীয় পরিচয়গুলির অনুপাত বাড়ছে, সেগুলির মধ্যে প্রায় সমান সমান হচ্ছে খ্রিস্ট ধর্ম ও বৌদ্ধ ধর্ম। আলোচ্য চার দশকে উত্তরবঙ্গের জনজাতিদের মধ্যে খ্রিস্টান ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অনুপাত হয়েছে যথাক্রমে ৭.৫২ শতাংশ থেকে ১৫.২২ শতাংশ, এবং ৪.২৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ১১.২৮ শতাংশে। জনজাতি সংসারের অন্দরমহল থেকে অবশ্য এসব গল্প খুব একটা বাইরে আসে না, তাই আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় সবকিছুই বোধহয় ‘অল ইজ ওয়েল’!

(লেখক সামাজিক-নৃতত্ত্বের গবেষক) 



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *