West Bengal Election 2026 | ভোটে ধর্মীয় পরিচিতিতেই প্রতিযোগিতার সর্বনেশে ছবি

West Bengal Election 2026 | ভোটে ধর্মীয় পরিচিতিতেই প্রতিযোগিতার সর্বনেশে ছবি

ভিডিও/VIDEO
Spread the love


গৌতম সরকার

শুধু বিজেপিকে দোষ দিয়ে কী হবে? ধর্ম ছাড়া গীত নেই তো তৃণমূলেরও। তবে দুই পক্ষেরই ভক্তি, ঈশ্বরবন্দনা ছাপিয়ে ধর্মের রাজনীতিকরণে জোর বেশি। এই সেদিন ধর্মতলার ধর্নামঞ্চে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথাটা ভাবুন। তিনি বলেছিলেন, ‘একটি কমিউনিটি যদি জোট বাঁধে, এক সেকেন্ডে বারোটা বাজিয়ে দেবে।’ এত স্পষ্ট ইঙ্গিত যে, সেটার আর ব্যাখ্যা দরকার পড়ে না।

প্রসঙ্গটির উল্লেখ করে মহাগুরু মিঠুন চক্রবর্তীর হুমকিটা ভাবুন- ‘পুলিশ নিরপেক্ষ থাকলে ৩০ মিনিটে তৃণমূলের খেলাটা শেষ করে দেব।’ এই বার্তাতেও ইঙ্গিত স্পষ্ট। বিজেপি সবসময় যুক্তি দেয়, পশ্চিমবঙ্গকে পশ্চিম বাংলাদেশ বানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অসমে আবার হিমন্ত বিশ্বশর্মা সতর্ক করেন, অসমীয়ারা সংখ্যালঘু হয়ে যাচ্ছেন। মুসলিমরা অসমের জনবিন্যাস বদলে দিচ্ছে। বাংলার নতুন রাজ্যপাল রবীন্দ্রনারায়ণ রবিকে একই কথা বলে এসেছেন শুভেন্দু অধিকারী।

তাঁরও অভিযোগ, বাংলার জনবিন্যাস পালটে গিয়েছে। প্রতিকার করতে অসমে হিমন্তর সরকার বুলডোজার দিয়ে একের পর এক মুসলিম বসতি উৎখাত করেছেন। মিয়াঁদের (বাঙালি মুসলিম) কষ্ট দিতে (যেমন রিকশা ভাড়া, মজুরি কম দেওয়া) খোলাখুলি পরামর্শ দিচ্ছেন অসমের মুখ্যমন্ত্রী। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সবসময় বলে থাকেন, বিজেপি বাংলার ক্ষমতায় এলে সব ‘ঘুসপেটিয়া’দের (মূলত বাংলাভাষী মুসলিম) তাড়িয়ে দেবে। ধর্মের জিগিরে হিন্দুদের এককাট্টা করার চেষ্টা বিজেপির খুল্লম খুল্লা অ্যাজেন্ডা।

বাংলার মুখ্যমন্ত্রীও বুঝিয়ে দিলেন, মুসলিম জুজুর ভয় দেখাতে তিনি কম যান না। সতর্কও করলেন ভয় ধরানো ভাষায়, ‘যদি নিজেদের তেরোটা বাজাতে না চান, তাহলে কেউ অপপ্রচারে কান দেবেন না। আমরা আছি বলেই আপনারা ভালো আছেন।’ যেন তৃণমূল সরকার না থাকলে ওই ‘একটি কমিউনিটি’ অন্যদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। ভাবুন কী সর্বনেশে প্রচার!

এসব বলে আদতে সেই ‘কমিউনিটি’েক অপমান করা হল। বোঝানো হল, কমিউনিটিটার চরিত্র এরকমই। যেন তৃণমূল ওই কমিউনিটিকে সামলে-সুমলে রেখেছে। এটা বিজেপি যেভাবে গোটা মুসলিম সমাজকে মৌলবাদী বলে দেগে দেয়, তারই প্রতিধ্বনি যেন। ইসলাম ধর্মকে কেন্দ্র করে দুই পরস্পরবিরোধী এই বক্তব্যে ঈশ্বর বা আল্লা ভক্তি কোথায় বলুন তো! ‘কেউ মালা কেউ তসবি গলে/ তাইতে কি জাত ভিন্ন বলে…’ গানে লালন ফকিরের আঁকা সমাজের আখ্যান আর নেই।

উলটে ভোটব্যাংকের রাজনীতিতে ধর্মকে প্রধান উপাদান করার সমানতালে প্রতিযোগিতায় এখন বিজেপি ও তৃণমূল। ব্রিগেডে নরেন্দ্র মোদির সভামঞ্চকে দক্ষিণেশ্বরের আদলে সাজানোর পিছনেও সেই প্রতিযোগিতা। যা সমাজকে দলগতভাবে নয় ধর্মীয়ভাবে আড়াআড়ি বিভাজন করে দিচ্ছে। সংবিধান অনুযায়ী দেশটা ধর্মনিরপেক্ষ। বাস্তবে জাতপাতকে ছাপিয়ে ধর্মের পরিচয়ে বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে দেশ। বাংলায় কে কোন ধর্মের পক্ষে- সেটাই ভোটপ্রার্থী দলগুলির প্রধান পরিচয় করে তোলা হচ্ছে।

২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে কিঞ্চিৎ ধাক্কা খেয়ে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ‘যে গোরু দুধ দেয়, তার লাথি খাওয়াও ভালো’ বলে সেই পরিচয়টা স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন। বাম আমলে ‘পার্টি সোসাইটি’র অস্তিত্ব ছিল। যে সমাজকে পার্টিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। পার্টির মতাদর্শগত প্রভাব থাকে সেই সমাজে। বাম শাসনের অবসানে পার্টি সোসাইটি ভেঙে পড়ে। তৃণমূল বা বিজেপির দলগত পরিচয়ে কোনও পার্টি সোসাইটি তৈরি হয়নি।

বরং নানা ধর্মীয় পরিচয়ের সোসাইটি তৈরি হয়ে গিয়েছে িনঃশব্দে। তৃণমূল বা বিজেপির দলগত অস্তিত্ব মানে যেন দুই ধর্মের দুই পার্টি। মতাদর্শ নয়, ভোটে সমর্থনের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের মাপকাঠি হয়ে দাঁড়াচ্ছে দলটি কোন ধর্মের পৃষ্ঠপোষক। নতুন রাজ্যপালের সঙ্গে দেখা করে শুভেন্দু বুঝিয়ে এসেছেন, মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে তোষণের রাজনীতির অভিযোগ নতুন করে ফেরি করছেন তিনি।

‘আমরা না থাকলে একটি কমিউনিটি আপনাদের বারোটা বাজিয়ে দেবে’ বলে মমতার সতর্কবার্তা বাস্তবে সেই তোষণের অভিযোগকে খোলাখুলি সিলমোহর দিল। তোষণের বিপরীত চিত্র আবার স্পষ্ট ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (এসআইআর)-তে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় ‘ডিলিটেড’ ও বিচারাধীন তকমাধারীদের উল্লেখযোগ্য অংশ ইসলাম ধর্মাবলম্বী। মিশ্র বা মুসলিম এলাকার ভোটার তালিকায় চোখ বোলালে এই সত্য সহজে বোঝা যায়।

মুখে যা-ই বলা হোক, এসআইআর-এর নিশানায় মুসলিমরা। গোড়া থেকে বিজেপির প্রচারই ছিল, অনুপ্রবেশকারী মুসলিম ও রোহিঙ্গামুক্ত ভোটার তালিকা তৈরি করতে এসআইআর হচ্ছে। বাস্তবে অনুপ্রবেশকারী বা রোহিঙ্গা চিহ্নিত করে কাউকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে প্রমাণ নেই। বাদ পড়া বা বিচারাধীন হওয়ার কারণ নিয়ে বিভ্রান্তির শেষ নেই। এমন ঘটনাও আছে যেখানে, পরিবারের বাকি সবাই তালিকায় আছে, নেই শুধু এক তরুণের নাম।

অথচ সেই তরুণের এদেশে জন্মের প্রমাণ আছে, এদেশে পড়াশোনার প্রমাণপত্র আছে, ২০০২-এর ভোটার তালিকায় বাবা-মায়ের নামও রয়েছে। অর্থাৎ ম্যাপিং, লিংকিং- কিছুতে সমস্যা নেই। তবুও তিনি বিচারাধীন কোনও কারণে- তার ব্যাখ্যা নেই। এই জট থেকে নিষ্পত্তির নিশ্চয়তাও পাচ্ছেন না তিনি। ওই পরিবার ও তাদের প্রতিবেশীদের ক্ষোভকে কাজে লাগাচ্ছে তৃণমূল। শুধু ধর্মের পরিচয়ে ভোটে সমর্থন বা দলে জড়িয়ে পড়ার এই প্রবণতা সমাজে অস্থিরতার জন্ম দিচ্ছে। সহাবস্থানের বরাবরের অভ্যাসকে নষ্ট করছে।

সিপিএমের মতো সাম্যবাদে ‘বিশ্বাসী’ দলগুলিও এই ন্যারেটিভ আটকাতে ব্যর্থ। বরং সুজন চক্রবর্তী, মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়দের মালা পরে মতুয়া মন্দিরে উপস্থিতি পালটা ন্যারেটিভ তৈরির চেষ্টায় ধাক্কা খায়। দলগুলির আগ্রহ নিয়েও সন্দেহ জাগে। ফলে ২০২৬-এর নির্বাচনে যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেনও, সমাজে অস্থিরতা দূর হওয়ার সম্ভাবনা খুব ক্ষীণ।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *