উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: শিল্পীর কি কোনও রং হয়? নাকি শিল্পের কাজই হল সময়ের আয়না হয়ে শাসকের চোখে চোখ রেখে অপ্রিয় সত্য উচ্চারণ করা? পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal) বর্তমানে এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে এই প্রশ্নগুলো কেবল তাত্ত্বিক আলোচনার স্তরে সীমাবদ্ধ নেই, বরং অস্তিত্বের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক ‘লগ্নজিতা বিতর্ক’ যখন রাজ্য রাজনীতির অন্দরে বাক-স্বাধীনতার প্রশ্ন তুলে দিয়েছে, ঠিক তখনই প্রখ্যাত লোকসংগীত শিল্পী পল্লব কীর্ত্তনীয়ার একটি ফেসবুক পোস্ট আগ্নেয়গিরির মতো বিস্ফোরিত হল। তাঁর অভিযোগের আঙুল সরাসরি শাসকদলের দিকে—অভিযোগ, ভিন্নমতের কারণে তাঁকে কৌশলে ‘কালো তালিকাভুক্ত’ করে ভাতে মারার চেষ্টা চলছে।
পল্লব কীর্ত্তনীয়া (Pallab Kirtaniya) তাঁর পোস্টে স্পষ্ট জানিয়েছেন, বর্ধমানের ভাতারে একটি বইমেলায় ২৫ ডিসেম্বর তাঁর অনুষ্ঠান করার কথা থাকলেও, শেষ মুহূর্তে ‘শাসকের প্রবল চাপে’ উদ্যোক্তারা তা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছেন। লগ্নজিতা চক্রবর্তীর (Lagnajita Chakraborty) ক্ষেত্রে যে ঘটনাটি ঘটেছে, তার বিরুদ্ধে যখন শিল্পীমহল সরব, তখন পল্লববাবুর প্রশ্নটি অনেক বেশি গভীরে আঘাত করে। তিনি বলছেন, লগ্নজিতার অপমানের বিচার চেয়ে পাশে দাঁড়ানো যেমন জরুরি, ঠিক তেমনই দেখা প্রয়োজন রাজ্যের অঘোষিত ‘ব্ল্যাকলিস্ট’ সংস্কৃতিকে। গত এক দশকে অগণিত বার তাঁকে মঞ্চ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, কারণ তিনি শাসকের সুরে সুর মেলাননি।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল, এই কণ্ঠরোধের প্রক্রিয়াটি এখন আর কেবল সরকারি মঞ্চে সীমাবদ্ধ নেই। পল্লববাবুর অভিযোগ অনুযায়ী, বেসরকারি সংগঠন বা ক্লাব যারা কোনো রাজনৈতিক দলের ছাতার তলায় নেই, তারাও আজ শাসকের অদৃশ্য রক্তচক্ষুর ভয়ে কাঁপছে। একজন শিল্পীকে মঞ্চে ডাকলে যদি স্থানীয় ‘দাদা’দের বিরাগভাজন হতে হয়, তবে উদ্যোক্তারা শিল্পীর স্বাধীনতার চেয়ে নিজের নিরাপত্তা বা অনুদান বাঁচানোকেই শ্রেয় মনে করছেন। এটি গণতন্ত্রের জন্য এক অশনি সংকেত।
বাংলার সংস্কৃতি জগতে আজ দুই ধরনের শিল্পী দৃশ্যমান। একদল, যারা শাসকের ‘সুনজরে’ থেকে নিয়মিত সরকারি মেলা, উৎসব আর পুরস্কারে ভূষিত হচ্ছেন। আর অন্যদল, যারা চুরির সাম্রাজ্য, শিক্ষা ব্যবস্থার ধ্বংস এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে গান বেঁধেছেন বলে ব্রাত্য হয়ে পড়েছেন। পল্লব কীর্ত্তনীয়া নিজে সেই বিচ্ছিন্নতার যন্ত্রণা সহ্য করছেন। রবীন্দ্র সদনের মতো মঞ্চে দাঁড়িয়েও তাঁকে অশ্রাব্য গালিগালাজ শুনতে হয়েছে, শারীরিক নিগ্রহের হুমকি দেওয়া হয়েছে—কেবলমাত্র প্রতিবাদের গান গাওয়ার ‘অপরাধে’।
প্রশ্ন ওঠে, শিল্পী কি তবে কেবল বিনোদনের পুতুল? নাকি তাঁরও দায়বদ্ধতা আছে সমাজের প্রতি? পল্লববাবু ঠিকই ধরেছেন—আজ যারা সুসময়ের ভাগ নিতে ব্যস্ত, তাঁরা কি পারবেন বিবেকের দায়ে অন্তত একটি গান করতে? যেখানে আস্ত একটা প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে, সেখানে শিল্পীর নীরবতা কি অপরাধের সামিল নয়?
লগ্নজিতা ঘটনার পর যারা বাক-স্বাধীনতার ঝাণ্ডা তুলেছেন, তাঁদের কাছে পল্লব কীর্ত্তনীয়ার এই অভিজ্ঞতাকথন এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। শাসনের চাবুক যখন শিল্পের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তখন বুঝতে হবে সমাজ তার শিরদাঁড়া হারাচ্ছে। বাংলার শিল্পীসমাজ আজ এক কঠিন পরীক্ষার মুখে—তাঁরা কি ক্ষমতার অলিন্দে মাথা নত করে সুরক্ষিত থাকবেন, নাকি পল্লবের মতো একাকী লড়াইয়ে নেমে বলবেন, ‘শাসক পালটায়, কিন্তু সত্যের সুর কোনোদিন স্তব্ধ হয় না’?
